kalerkantho

বুধবার ।  ১৮ মে ২০২২ । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩  

ইসি গঠনে আইনের পথে পা রাখল সরকার

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০৩:৫১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইসি গঠনে আইনের পথে পা রাখল সরকার

বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে গতকাল সংলাপে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতারা। এক পর্যায়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের সুপারিশ রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

অবশেষে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন প্রণয়নের পথেই পা রাখল সরকার। গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের শেষ দিনে আইনের একটি খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংলাপে অংশ নেওয়া দলগুলো প্রায় সবাই আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রেখেছিল।  

তবে এবারই আইন পাস করে তার মাধ্যমে, নাকি আগের দুইবারের মতো রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

 

সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব মো. জয়নাল আবেদীনকে উদ্ধৃত করে জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সংলাপে অংশ নিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে জানিয়েছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব প্রক্রিয়া শেষ করে আইনটি কার্যকর করা হবে।

রাষ্ট্রপ্রতিও যত দ্রুত সম্ভব এ আইন জাতীয় সংসদে পাস হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এই আইনেই জনমতের প্রতিফলন ঘটবে। ’

প্রসঙ্গত, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। তার আগেই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে।

মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আইনটি চূড়ান্ত করতে আমরা আশা করছি খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়, ছোট আইন। ’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আইন পাসের বিষয়ে ম্যাজিক তাস নেই। যে প্রক্রিয়ায় আইন প্রণয়ন হয়, সেভাবেই হবে। ’ অল্প সময়ে আইন প্রণয়ন করা সম্ভব কি না, জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোনো কিছুই অসম্ভব নয়, অপেক্ষা করুন। ’

গত ১৮ নভেম্বর নাগরিক সংগঠন ‘সুজন’-এর নেতারা আইনমন্ত্রীর কাছে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ আইনের একটি খসড়া জমা দিলে আইনমন্ত্রী তাঁদের জানান, তাঁর মন্ত্রণালয় থেকেও একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে এবার সময়ের সংকটের কারণে এ আইন প্রণয়ন সম্ভব হবে না। আগেরবারের মতো রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমেই এবার নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হবে।

গতকাল এ আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের বিষয়ে ‘সুজন’ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবার এই আইন প্রণয়ন সম্ভব নয় জানিয়েও হঠাৎ এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের বিষয়টি আমাদের কাছে বিস্ময়ের। খসড়া আইনটি সম্পর্কে যতটা জেনেছি, তাতে আগের নির্বাচন কমিশনগুলোকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অথচ বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাব ছিল, যাঁদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হবে তাঁদের নাম-পরিচয়ের প্রাথমিক তালিকা আগে প্রকাশ করতে হবে। এতে তাঁরা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার যোগ্য কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হবে। কিন্তু মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া খসড়া আইনে এ বিষয়ে কিছুই বলা নেই। ’

আইনের খসড়ায় যা বলা হয়েছে : আইনটি সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হবে। ছয় সদস্যের এই অনুসন্ধান কমিটির প্রধান থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। সদস্য থাকবেন হাইকোর্টের একজন বিচারপতি, মহাহিসাবনিরীক্ষক, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কমিটি যোগ্য ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করবে। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন।

মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনার হতে হলে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। বয়স সর্বনিম্ন ৫০ বছর হতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বা বিচার বিভাগীয় পদে কমপক্ষে ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

কারা অযোগ্য হবেন, সে বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে খসড়া আইনে। অযোগ্যতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে : আদালতের মাধ্যমে কেউ অপ্রকৃতিস্থ হিসেবে ঘোষিত হন, দেউলিয়া ঘোষণার পর দেউলিয়া অবস্থা থেকে মুক্ত না হন, অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, নৈতিক স্খলন এবং সে ক্ষেত্রে যদি ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডিত হন। আর রাষ্ট্রীয় পদে থাকলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার হতে পারবেন না।

আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন কি এ আইনের অধীনে হবে, জানতে চাইলে খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, যদি এর মধ্যে আইন পাস হয়ে যায় তাহলে হবে। আজ অনুমোদন দেওয়া হলো, হয়তো কাল-পরশু দুই দিন লাগবে আইন মন্ত্রণালয়ের। তারপর যদি ওনারা সংসদে পাঠান, সংসদেও তো কয়েক দিন লাগবে। স্ট্যান্ডিং কমিটিতে যাবে, ওনারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। যদি হয় তো হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, ‘আইনটি চূড়ান্ত করতে আমরা আশা করছি খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়, ছোট আইন। ’

মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, এর আগে যেসব নির্বাচন কমিশন হয়েছে, সেগুলোকে ‘হেফাজত’ দেওয়া হয়েছে এ আইনে। যেহেতু এর আগে আইন ছিল না, রাষ্ট্রপতি যেসব নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন, তা এ আইনের অধীনে করেছেন বলে ধরে সেগুলোকে হেফাজত করা হয়েছে।  

আইন ভাঙলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের অপসারণ কিভাবে হবে, জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘আমার যত দূর মনে পড়ে, যেভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা অপসারণ হন, একই পদ্ধতি প্রযোজ্য হবে। বাকিগুলো হয়তো বিধিতে উল্লেখ করে দেওয়া হবে। ’

আগে যা হয়েছে : এর আগে আইন না করেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি করে দেন। ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই সার্চ কমিটির প্রস্তাব অনুসারেই বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়।

তার আগে ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের উদ্যোগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে কমিশনারদের নিয়োগের জন্য চার সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়।  



সাতদিনের সেরা