kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ইউপি নির্বাচনের ফল কী বার্তা দিচ্ছে

ড. নিয়াজ আহম্মেদ   

১৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০৪:০৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইউপি নির্বাচনের ফল কী বার্তা দিচ্ছে

সরকার ২০১৬ সাল থেকে ইউপি নির্বাচনে শুধু চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ সিদ্ধান্ত তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনৈতিক গণতন্ত্রায়নের যাত্রাকে অনেকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। আবার ভিন্নমতও ছিল। কেননা স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন যেহেতু সরকার পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখে না, সে ক্ষেত্রে কেনই বা দলীয় ব্যানারে নির্বাচন।

বিজ্ঞাপন

তবে এ কথা সত্য, রাজনৈতিক জবাবদিহি তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করতে হলে দলীয় ব্যানারে নির্বাচন যুক্তিযুক্ত। একজন সংসদ সদস্যের চেয়ে একজন ইউপি চেয়ারম্যানের সাধারণ জনগণের সঙ্গে কাজের পরিধি ও জবাবদিহি অনেক বেশি। সাধারণ জনগণ চেয়ারম্যানকে সহজে কাছে পায়। যখন দলীয় ব্যানারে নির্বাচন হয় তখন প্রশ্ন, মনোনয়ন এবং কোন দল কতটিতে জয়লাভ করেছে। নির্বাচনের ফলাফলকে সরকারের জনপ্রিয়তার সঙ্গে মিলিয়ে নানা প্রশ্ন করা হয়। ফল দলের পক্ষে গেলে সরকারের জনপ্রিয়তা ভালো বলে মনে হয়।

একটি কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে, নির্বাচন দলীয় ব্যানারে হলেও তা যতটা না দলীয় তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, গোষ্ঠী সম্পর্কসহ আরো অনেক বিষয়। আবার এ কথাও ভুললে চলবে না, রাজনীতি একটি বড় বিষয় যেখানে আমরা অনেক কিছু রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করি। এ পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম ধাপে ৭৩.৪৮ শতাংশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়লাভ করেছিলেন। পঞ্চম ধাপে এসে যা কমে ৪৯.২৭ শতাংশে দাঁড়ায়। এই ধাপে ৬৩২টি ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের ১৮৩ জন বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করেন। বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার সব কটিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। অনেক ইউপিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ছিল না নৌকা। কোনো কোনো সংসদীয় আসন যেখানে মন্ত্রীও রয়েছেন, অথচ নগণ্য সংখ্যক প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থাৎ মনোনয়নের প্রেক্ষাপটে ফলাফল বিশ্লেষণ করলে হতাশার সুর বাজতে পারে। কিন্তু যাঁরা বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন তাঁরাও আওয়ামী লীগের সমর্থক। ওই অর্থে সবাই আওয়ামী লীগের প্রার্থী। বড় ভুল সঠিক প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়া।

ফলাফল বিশ্লেষণে কতগুলো মৌলিক বিষয় আমাদের সামনে প্রতীয়মান হয়। এ নির্বাচনে বড় সংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। এমনও দেখা গেছে, মেম্বার ও মহিলা মেম্বাররাও বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। আমরা অতীতে এত বড় সংখ্যক প্রার্থীদের বিনা ভোটে নির্বাচিত হতে দেখিনি। এর পেছনে পেশিশক্তির প্রভাব ও ভয়ভীতির প্রদর্শন রয়েছে বলে আমাদের মনে হয়। তা না হলে স্থানীয় নির্বাচন যেখানে উৎসবের মতো, সেখানে কেন এত সংখ্যক প্রার্থী বিনা ভোটে নির্বাচিত হবেন। জনগণের কাছে তাঁদের জবাবদিহি একেবারে শূন্যের কাছাকাছি থাকবে বলে আমাদের ধারণা।  

রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের নির্বাচনে প্রচারণার ভঙ্গি ও কথাবার্তা শালীনতাকে ছাড়িয়ে গেছে। স্থানীয় এমপি মহোদয়রাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিলেন না। কারো মধ্যে ভয় কিংবা শঙ্কা কোনোটাই কাজ করেনি। প্রকাশ্যে জনসভায় এমন বক্তব্য আমরা অতীতে খুব কমই লক্ষ করেছি। আমাদের তৃণমূলের রাজনীতির জন্য এ এক অশনিসংকেত। পাঁচ ধাপের নির্বাচনে ১০০-এর বেশি মৃত্যু কোনোভাবেই কম নয়। গড়ে ২০ জনের বেশি মৃত্যু। আরো ধাপ বাকি আছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা যা ছিল অনেকটা প্রতিশোধপরায়ণ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ করার সুযোগ। যাকে নির্বাচনী সহিংসতা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। আমাদের কাছে ১০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি বড় বিষয়। গবেষণার বিষয়, দলীয় ব্যানারে নির্বাচনী সহিংসতা বেশি হয়, না কম। যেখানে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না, সেখানে নিজেদের মধ্যে রেশারেশির জন্য এত বড় হানাহানি।

ফলাফল বিশ্লেষণে মনে হয়, ইউপি নির্বাচন দলীয় প্রতীকের বাইরে থেকেই সাধারণ জনগণ বিবেচনায় নিচ্ছে। তাদের কাছে প্রতীক বড় কোনো বিষয় নয়। যদি তাই হতো, তাহলে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী এবং স্বতন্ত্র নামে বিএনপি প্রার্থীরা এত বেশি পরিমাণে জয়লাভ করতেন না।  

বিষয়টির রাজনৈতিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ, প্রাসঙ্গিক এবং আগামী সংসদসহ অন্যান্য নির্বাচনের জন্য বিশেষ বার্তা বহন করবে। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমপি বনাম এমপি বিপক্ষ বলয় আরো স্পষ্ট এবং কঠিন বিরুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হলো। এমন বিপরীতমুখী বলয় আগেও ছিল, কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তা আরো স্পষ্ট এবং শক্ত হলো। যার প্রভাব প্রতিনিয়ত এবং বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে পড়বে। নির্বাচনে মনোনয়ন প্রক্রিয়া তৃণমূল থেকে কয়েকজনের নাম প্রেরণ যদি সঠিক হতো, তাহলে সমস্যা কম হতো। দ্বিতীয়ত, মনোনয়নে স্থানীয় এমপিদের প্রভাব ছিল বলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আর আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের পক্ষে স্বল্প সময়ে যাচাই-বাছাই করে মনোনয়ন দেওয়া হয়তো কঠিন ছিল।

এ ছাড়া রয়েছে লবিং, তদবিরসহ অন্যান্য অনেক বিষয়। বিপুলসংখ্যক মানুষকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া আসলেই জটিল কাজ। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জানা আছে প্রার্থীদের কার কেমন জনপ্রিয়তা। নিতান্ত নিজের বলয় বা নিজের কাছের লোককে মনোনয়ন দিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচন করার চেষ্টা করা সঠিক নয়, বরং যিনি জনপ্রিয় তিনি যদি আমার বলয়ে নাও থাকেন তাতে সমস্যা নেই। ব্যক্তি কাছের বা নিজের না হলেও দলের তো। দলকে বড় করে দেখলে সমস্যা কোথায়। নির্বাচনের ফলাফলের বড় প্রভাব নিজেদের মধ্যে রেশারেশি আরো বৃদ্ধি পাওয়া এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে তিক্ততার মধ্যে নিয়ে আসা। মোটের ওপর সাংগঠনিক শক্তি আরো দুর্বল হওয়া। কেননা, এমন কোনো সংসদীয় আসন পাওয়া যাবে না যেখানে দুইয়ের অধিক উপদল নেই।

আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে একাধিক বলয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগের জন্য পরিস্থিতি মোকাবেলা করা বড় চ্যালেঞ্জের। যে বড় সংখ্যক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেছেন, তাঁদের বহিষ্কার করাও ভালো কাজ হবে না। কেননা সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁরা জিতেছেন। তাঁরা আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং ভোটের মাঠে জনপ্রিয়। ভুল মনোনয়নের জন্য অর্ধেকেরও কম প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। দলের জন্য আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করা একটি বড় বিষয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠে যে পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে তা দূর করার জন্য দলীয় হস্তক্ষেপ দরকার। পর্যাপ্ত গবেষণা এবং মূল্যায়ন দরকার। নইলে আগামী দিনে রাজনৈতিক হানাহানি, অবিশ্বাস ও মতানৈক্য আরো চরম আকার ধারণ করবে।   

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



সাতদিনের সেরা