kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

জাওয়াদের প্রভাব ১৫ জেলায়

এক লাখ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৮:২৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এক লাখ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা

এক পাশে রামনাবাদ নদ, মাঝখানে বাঁধ, আরেক পাশে ক্ষেতে লাগানো হয়েছিল তরমুজের চারা। ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে বাঁধ ভেঙে পানি ঢোকে তরমুজক্ষেতে। সেই পানি সেচে বাঁধ মেরামত করছেন বরিশালের গলাচিপার এক কৃষক। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে গত তিন দিনে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বিশেষ করে দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে ফসলের মাঠে পানি জমে আমন ধান, গম, তরমুজ, আলু, সবজি ও রবিশস্যের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলাগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ বেশি।

কালের কণ্ঠের ১৫ জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা গেছে, জাওয়াদের প্রভাবে বৃষ্টিতে প্রায় এক লাখ ৬৪৫ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে বরিশাল বিভাগেই ক্ষতি হয়েছে ৬১ হাজার ৭৫২ হেক্টর জমির ফসলের।

তবে গতকাল মঙ্গলবার আবহাওয়া অফিস বলেছে, ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ লঘুচাপে পরিণত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আজ বুধবার থেকে বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোদের দেখা মিলবে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বরিশাল বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. তাওফিকুল আলম বলেন, প্রাথমিক হিসাবে বরিশাল বিভাগে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর আমন ক্ষেত, ২৬ হাজার হেক্টর খেসারি ক্ষেত, সাত হাজার ৫০০ হেক্টর শীতকালীন শাক-সবজি, দুই হাজার ১৫৬ হেক্টর সরিষা, ৫৭৩ হেক্টরের মসুর ডাল ক্ষেত, ২০৩ হেক্টর গমের ক্ষেত, ২৮৮ হেক্টর আলু ক্ষেত ও ৩২ হেক্টর আগাম তরমুজ ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভোলায় জাওয়াদের প্রভাবে বৃষ্টিতে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। কৃষকরা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। সদর উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, সদর উপজেলার ১০০ হেক্টর আলু, এক হাজার হেক্টর খেসারি, ৪০০ হেক্টর সরিষা, ১০০ হেক্টর গম, ৫০০ হেক্টর সবজি, ৫০০ হেক্টর আমন ধানসহ তিন হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে।

ঝালকাঠিতে আট হাজার ৯৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি না কমলে বেশির ভাগ ফসলই নষ্ট হয়ে যাবে। এসব ক্ষেতে আমন, বোরো বীজতলা, খেসারি, সরিষা, লতাকৃষিসহ শীতকালীন সবজি ও  আগাম রবি ফসলের চাষ হয়েছিল।

সদর উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের কৃষক মনোতোষ হালদার বলেন, শীতকালীন সবজি ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগম, মুলা এবং বিভিন্ন শাকের ক্ষেত এখন পানিতে নিমজ্জিত। পানি না কমলে এসব নষ্ট হয়ে যাবে।

বাগেরহাটে বৃষ্টির পানিতে পাকা আমন ধান এবং বোরো ধানের বীজতলাসহ ৭৩৯ হেক্টর জমির ফসল ডুবে গেছে। কোথাও কোথাও জমিতে ধান ও ফসলের ওপর দিয়ে প্রায় এক ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তিন দিন ধরে জমিতে পানি। আরো দু-তিন দিন পানি থাকলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে।

পাকা আমন ধান ও বোরো ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বৃষ্টির কারণে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় দুবলার চরে জেলেদের কয়েক কোটি টাকা মূল্যের শুঁটকি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির সাতটি ইউনিয়নে ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ৫০০ হেক্টর গম, ৬৪০ হেক্টর মুড়িকাটা পেঁয়াজ, ৫৫ হেক্টর পেঁয়াজের বীজতলা এবং ৬৫০ হেক্টর রসুনসহ মোট এক হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে।  

লক্ষ্মীপুরে আমন ধানসহ এক হাজার ৩৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্টের আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি রবি মৌসুমে জেলা সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় ৮১ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে ধান এবং পাঁচ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে শাক-সবজি চাষাবাদ হয়েছে। বৃষ্টিতে এসব উপজেলার এক হাজার ৩৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঝিনাইদহে মাঠে থাকা দুই হাজার ৩৯২ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উঠতি আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি বোরো ধানের বীজতলা, সরিষাসহ রবি ফসল এবং পেঁয়াজের ক্ষতি হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গায় ধান ও বীজতলার পাশাপাশি সরিষা, ভুট্টা, সবজি ও আলুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ১৬৭ হেক্টর জমির বোরো বীজতলা, পাঁচ হেক্টর জমির কেটে রাখা ধান, ৯৫ হেক্টর জমির সরিষা, ২১৫ হেক্টর জমির ভুট্টা, ৫৭৫ হেক্টর জমির শীতকালীন সবজি ও ৮২ হেক্টর জমির আলু বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণে কাজ চলছে।

মাদারীপুরের বেশির ভাগ বীজতলা তলিয়ে গেছে। জেলার পাঁচটি উপজেলায় ১০ হাজার ৪২৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুই দিনের বৃষ্টিতে সদর উপজেলার খোয়াজপুর, খাগদী, ঘটমাঝি, কেন্দুয়া, রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি, বদরপাশা, কবিরাজপুর, কালকিনি উপজেলার রমজানপুর, লক্ষ্মীপুর এবং ডাসার উপজেলার নবগ্রাম, কাজীবাকাই ও শিবচর উপজেলার মাদবরের চর, বহেরাতলা, কাঁঠালবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকার বোরো ধানের বীজতলা, সরিষা, মসুরি, পেঁয়াজ, আলু ও ভুট্টা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কৃষি বিভাগ জানায়, জেলার পাঁচটি উপজেলায় বোরো ধানের বীজতলা ৯৬১ হেক্টর, সরিষা দুই হাজার ৭৫ হেক্টর, মসুরি দুই হাজার ১৫২ হেক্টর, খেসারি এক হাজার ৩০৫ হেক্টর, মাষকলাই ৩৫ হেক্টর, ধনিয়া ৫২০ হেক্টর, পেঁয়াজ এক হাজার ৭৫ হেক্টর, রসুন এক হাজার ২০৫ হেক্টর, কালিজিরা ৫৩০ হেক্টর, আলু ৪০ হেক্টর, ভুট্টা ৫৩ হেক্টর, মিষ্টি আলু ১৫ হেক্টর, গম ৬০২ হেক্টর, মরিচ ৮০ হেক্টর এবং বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজি ৬৯৮ হেক্টর, মুগ ও ছোলা ৬০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গোপালগঞ্জে ৮৯২ হেক্টর জমির বীজতলা ও ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ২০৫ হেক্টর ইরি-বোরো বীজতলা, ১৯৫ হেক্টর সরিষা, ২১০ হেক্টর খেসারি, ৫৫ হেক্টর মসুরডাল, ৪৫ হেক্টর মটরডাল, ৮৫ হেক্টর গম, ১৮ হেক্টর পেঁয়াজ, ১০ হেক্টর রসুন, আট হেক্টর গোল আলু, ৪ হেক্টর মিষ্টি আলু, দুই হেক্টর সূর্যমুখী, দুই হেক্টর মাষকলাই, দুই হেক্টর ভুট্টা, দুই হেক্টর ধনিয়া ও ৪৫ হেক্টর জমির শাক-সবজি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।

পটুয়াখালীতে দুই হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে জেলায় মোট রোপা আমনের আবাদ হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার ৪৮ হেক্টর জমিতে; এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০০ হেক্টর জমির আমন ধান। এ ছাড়া দুই হাজার হেক্টর খেসারি, ৩০০ হেক্টর শাক-সবজি, ১০ হেক্টর সরিষা, ২০ হেক্টর ধনিয়া এবং ২৫ হেক্টর জমির তরমুজের ক্ষতি হয়েছে।

খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, খুলনায় ৯৩ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ ধান পেকেছে। বৃষ্টিতে অনেক মাঠের ধান নুইয়ে পড়েছে। তা ছাড়া নষ্ট হয়েছে বোরো বীজতলা, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, পেঁয়াজ, শিম, শসাসহ শীতকালীন ফসল। প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোয়ারের পানি বৃদ্ধির ফলে মাছের ঘেরও তলিয়ে গেছে।

শাকবাড়িয়া নদীর পানির তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের দুটি গ্রামের মানুষ এখনো পানিবন্দি। গতকাল বাঁধ সংস্কার শুরু হলেও পানি ঢোকা বন্ধ হয়নি। কেউ কেউ স্থানীয় উঁচু বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা)



সাতদিনের সেরা