kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দুর্নীতি নির্মূলে চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা

এ কে এম আতিকুর রহমান   

৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৩:৪৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুর্নীতি নির্মূলে চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা

মানব সমাজে কবে থেকে দুর্নীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল তা বলা মুশকিল। হতে পারে এটি এমন একটি সময় শুরু হয়েছিল যখন কেউ অসৎ উপায়ে অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা বা কোনো কিছু অর্জনে লোভী হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা ‘দুর্নীতি’ শব্দের ধারণাটির ব্যাখ্যায় বলেছেন যে এটি ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি দায়িত্ব পালনের নিয়ম ও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত আচরণ বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ। এই ধরনের প্রথা সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং একসময় দুর্নীতি তার নিজস্ব পরিচয়ে প্রকাশ লাভ করে।

বিজ্ঞাপন

তার পর থেকে সততা ও চারিত্রিক শুদ্ধতার মতো নৈতিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দুর্নীতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করে। একসময় সমাজ থেকে সততা বিলুপ্ত হতে থাকে, সমাজ ধীরে ধীরে দুর্নীতিবাজদের খেলার মাঠে পরিণত হয়। এমনকি সমাজের সৎ সদস্যরাও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের, যারা সমাজের হর্তাকর্তা হয়ে দাঁড়ায়, তাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে ভয় পায়। এই অবস্থা এখনো কমবেশি বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে বিরাজমান।

কাল ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন দিবস। ২০০৫ সাল থেকে প্রতিবছর জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো দিবসটি পালন করে আসছে। এই দিবসটি উদযাপনের উদ্দেশ্য হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজের সব স্তরে সুস্থ, স্বাভাবিক অবস্থার এবং শুদ্ধতার উন্নয়ন ঘটানোর জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া। যদিও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদটি ৩১ অক্টোবর ২০০৩ তারিখে গৃহীত হয়েছিল (রেজল্যুশন নং-৫৮/৪), তবে সেটি ২০০৫ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।

ওই কনভেনশনে বলা হয়েছে যে দুর্নীতি সমাজের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে; গণতান্ত্রিক কাঠামো, নৈতিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ন করে এবং টেকসই উন্নয়ন ও আইনের শাসনকে বিপন্ন করে। সুতরাং কনভেনশনকে আরো দক্ষতার সঙ্গে এবং কার্যকরভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও মোকাবেলা করার জন্য পদক্ষেপগুলোর উন্নয়ন এবং শক্তিশালী করার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে, যা দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার উন্নয়ন, সহায়তা ও সমর্থন এবং সততা, জবাবদিহি এবং সরকারি বিষয় ও সম্পত্তির সঠিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাবে। এই দিবসটি সারা বিশ্বের সরকার, বেসরকারি সংস্থা, রাজনীতিবিদ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিকরা পালন করে থাকে। এ উপলক্ষে সমাজে বিদ্যমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের, যেমন জনসমাবেশ, প্রচার-মিছিল, মিটিং ইত্যাদির আয়োজন করা হয়। তবে কভিড-১৯ মহামারির কারণে এ বছরের উদযাপন সীমিত অনুষ্ঠানের মধ্যেই থাকার সম্ভাবনা।

নিঃসন্দেহে দুর্নীতি মানবজাতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর মধ্যে একটি এবং এটি মোকাবেলা করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা খুব ক্ষমতাশালী। দুর্নীতি শুধু সরকারি কর্মকর্তারাই করেন না, সমাজের অন্যান্য সদস্যরা, যেমন রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সময় ও সুযোগমতো দুর্নীতি করে থাকেন। দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক, শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী হয় দেশ ও সাধারণ মানুষ।

দুর্নীতি শুধু একজন ব্যক্তির নৈতিকতাকেই ধ্বংস করে না, এটি সমগ্র সমাজের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রীতিনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, সরকারের কর্মক্ষমতা এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দুর্বল করে। দুর্নীতিগ্রস্ত একটি দেশ সহজে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে না, এমনকি দুর্নীতির বেড়াজালে দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সত্যি বলতে, দুর্নীতি সমাজ থেকে শান্তি ও সুখকে নির্বাসিত করে। দুর্নীতি থেকে উদ্ভূত দমন ও নিপীড়ন ভয়ংকর এবং বহুরূপী। দুর্নীতির কারণে সমাজে অসাম্য ও অবিচার বৃদ্ধি পায়। যাহোক, দুর্নীতি আমাদের সমাজের এতটাই গভীরে প্রথিত যে এটিকে উপড়ে ফেলা খুব একটা সহজ কাজ নয়।

দুর্নীতিবাজরা দেশের ধন-সম্পদ চুরি করে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত করে তোলে। সংগত কারণেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। গত বছর থেকে গোটা বিশ্ব কভিড-১৯ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে যে লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া এই মহামারির মধ্যেও আমাদের দুর্নীতির খবর শুনতে হয়। এই বাস্তবতায় ২০২১ সালের আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন দিবসে বিদ্যমান ভয়াবহ দুর্নীতি মোকাবেলায় সরকার, সরকারি কর্মচারী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, একাডেমিয়া এবং জনগণ, বৃদ্ধ ও তরুণ—প্রত্যেকের অধিকার ও কর্তব্যকে তুলে ধরা হবে। দুর্নীতি একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষকে সম্মিলিতভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিতে সব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে বেরিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা এতটাই প্রকট যে শহর বা গ্রামের যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন বিষয়টি প্রত্যেক নাগরিকের কাছেই পরিচিত। আমরা জানি যে আমাদের দুর্নীতিগ্র্রস্ত মানুষের জন্যই বিগত কয়েক বছর বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নামটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কারণে অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকার প্রশংসার দাবি রাখে।

এটা সত্য যে দুর্নীতি এরই মধ্যে আমাদের চিন্তা-চেতনায় অত্যন্ত জোরালোভাবেই সংক্রমিত হয়েছে এবং তা আমাদের জনগণের স্বাভাবিক আচার-আচরণে পরিণত হয়েছে। এটি ক্যান্সারের মতো শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। নিরাময় করার জন্য আমাদের প্রতিকার ও সঠিক ওষুধের পাশাপাশি প্রয়োগের পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে। তীব্রতা বিবেচনা করে, আমাদের অবশ্যই এমন ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে, যা আমাদের স্থায়ীভাবে উপশম করবে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সরকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত এবং দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূলের জন্য তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা ও পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু সরকারকে স্বীকার করতেই হবে যে দুর্নীতি নির্মূলে অর্জিত অগ্রগতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। এতে সরকারের শূন্য সহনশীলতা নীতির কৌশল বাস্তবায়নে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আন্তরিকতা, সদিচ্ছা, অঙ্গীকার ও সততার অভাব থাকতে পারে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ক্ষমতার অভাবও হতে পারে। অবশ্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা বাংলাদেশের মাটি থেকে এই মারাত্মক ব্যাধিকে নির্মূল করতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে জনগণকেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত এবং এ লড়াইয়ে সরকারের পাশে দাঁড়ানো উচিত। একই সঙ্গে দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা বাংলাদেশকে আর দুর্নীতির প্রজননক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চাই না।

দুর্নীতিকে শূন্যের কোঠায় বা অন্তত সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হলে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের যে পর্যায়ে রয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি উন্নতি করতে পারত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। একজন অর্থনীতিবিদই হিসাব করে বলতে পারেন যে আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত লোকেরা দেশের কোষাগার থেকে তাদের পকেটে কী পরিমাণ অর্থ এবং সম্পদ ঢুকিয়েছে। দুর্নীতি শুধু দেশের সার্বিক উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করে না, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। আমরা কি সরকারকে আশ্বস্ত করতে পারি না যে আমরা দুর্নীতিকে উচ্চৈঃস্বরে ‘না’ বলব? সরকার কার্যকর সচেতনতা ও অনুপ্রেরণামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা ছাড়াও যেসব ক্ষেত্রে দুর্নীতিপরায়ণ লোকগুলোর বিচরণ সেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক মনিটরিং কৌশল ব্যবহার করার কথা বিবেচনা করতে পারে। আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশনকেও যেমন কোনোরূপ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া কাজ করার ক্ষমতা দিতে হবে, তেমনি তাদের আধুনিক জ্ঞান এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতেও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা একদিন শুধু বাংলাদেশকেই নয়, সারা বিশ্বকে দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হব।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব



সাতদিনের সেরা