kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

সমাজ পরিচালনার ভার রাষ্ট্রের

গোলাম কবির   

৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৩:৪১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সমাজ পরিচালনার ভার রাষ্ট্রের

নিকট অতীতের ফেলে আসা যৌথ পরিবারব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করেছে শতবর্ষেরও আগে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ইত্যাদি কারণে মানুষকে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে। তা ছাড়া বিচ্ছিন্নতাকামী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের প্রাবল্যে মানুষ আত্মজনদের অচেনা জ্ঞান করছে।

সমাজপতিরা একদা তাঁদের এলাকার মানুষের দেখভাল করতেন। এখন কর্মভার পড়েছে রাষ্ট্রের ওপর। ফলে ‘কেউ আসে না কারো বাড়ি সবাই যেন পর।’ বেতনভোগীরা সমাজের উপরিকাঠামো যতটুকু দেখতে পারেন, পারিবারিক যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষকে ততটা সামনে আনতে পারে না। একদা প্রবীণরা যৌথ পরিবারে অনেকটা উদ্বেগহীনভাবে শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করতেন। এখন প্রত্যেক মানুষ যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কেউ কারো খবর রাখার সময় পায় না। যদিও ফেসবুকের সুবাদে গোটা বিশ্ব শয়নকক্ষের নিভৃতে স্থান করে দিয়েছে। তবে এগুলো বেশির ভাগ বিশ্রম্ভালাপের অনুষঙ্গ। ব্যতিক্রম ছাড়া প্রবীণদের দৃশ্যপটে আনা হয় না। অপসৃয়মাণদের মনে রেখে কী লাভ! বা কজন মনে রাখে? আজকাল বেশির ভাগ সন্তান ভাবে উপযুক্ত করে সঠিক ট্র্যাকে তুলে দেওয়াই অভিভাবকদের দায়িত্ব। তাই তারা পেছন ফিরে চায় না। মানুষের মতো মানুষ করা নিয়ে যারা গর্ব করে, তারা তাদের ত্যাগের কথা স্বীকার না করে গাড়ি-বাড়ির গর্বে অনেকটা বেভুল থাকে। লোক দেখানো সম্পর্ক রাখতেও তারা চায় না। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে মুষ্টিমেয়।

আমরা বলছিলাম, সমাজ পরিচালনার ভার এখন রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র বাইরের দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়গুলো সবার কল্যাণে মেরামত করে। ব্যক্তির অন্তর্নিহিত জীবনের সন্ধান রাখা সম্ভব কতটুকু! ভাড়াটে দিয়ে শোকসভা করা যায়, এমনকি কৃত্রিম চোখের জলও ফেলা যায়; কিন্তু প্রকৃত হৃদয়মথিত বেদনা জাগানো কী সহজ।

কোনো প্রাণী কর্মক্ষমতা হারালে অসহায় হয়ে পড়ে স্বাভাবিক নিয়মে। মুক্ত অনাবাসী প্রাণীর বিদায় দৃশ্য আমরা দেখি না, তবে অনুমান করি। কারণ আমরা যূথবদ্ধ সবাক প্রাণী। আবেগ বিলাসী সভ্যতা সেই অনুমান করার শক্তিটুকুও কেড়ে নিয়েছে। ব্যক্তির ওপরে ওঠার অভিলাষ হৃদয়ধর্মকে ভোলাতে যুদ্ধরত।

বিশ্বজোড়া করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, কী নিদারুণ মানবেতর অবহেলায় প্রবীণ-প্রবীণাদের পরিত্যক্ত করা হচ্ছে। অনেক পশু-পাখি তাদের মৃত সদস্যের বিদায় বেলায় নিজেদের ভাষায় হাহাকার করে। আর মানবসন্তান! আক্রান্ত জনক-জননীকে ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গল অথবা নির্জন রাস্তায় ফেলে যায়। এ যেন অপরিহার্য বর্জনীয় বস্তু।

খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের নুন আনতে পান্তা উজাড়, তারা হয়তো যন্ত্রণা গোপন করে উদাসীনতার ভান করে, কিন্তু মধ্যবিত্ত! আগাম সম্পত্তি প্রাপ্তির উন্মাদনায় বাবার মৃত্যু কামনা করে। দুঃখ ভাগ করতে চায় না।

ধর্মে কঠোর নির্দেশ আছে প্রবীণ, বিশেষ করে মা-বাবার প্রতি নমনীয় হওয়ার জন্য। এটা কতজন মান্য করে! তা ছাড়া আইন করে ভালোবাসা উৎপাদন করা যায় না। এটা নিতান্ত মানবিক উপলব্ধির ব্যাপার। আবেগ-অনুভূতি পারিপার্শ্বিকের চাপে ক্ষীণ হয়ে এলে নীতিবাক্যও হাস্যকর হয়ে যায়।

প্রাচীন ভারতে পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষ বাণপ্রস্থে গিয়ে সংসার যন্ত্রণা ভুলে থাকতেন। রমণিকুল সম্পর্কে বলা হয়নি। তাদের সর্বংসহা মনে করে নাকি অবহেলিত ভেবে! অথচ কষ্টের শিকার তারা কম নয়।

ব্যাধি-রোগ-শোক বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভাবও বাড়ছে, মানুষের স্বভাব পরিবর্তন হয় না। আরবিতে যাকে বলা হয়েছে ‘আল খাসলাতু লা ইয়ারুদ্দো ইল্লাল কাজা।’ তাই বলে কি প্রবীণরা মানবেতর জীবের চেয়েও শেষ জীবনের ভয়ংকর দিনগুলোকে নিয়তি নির্দেশিত বিশ্বাস করে নিষ্ক্রিয় থাকবেন? আইনের প্রতাপ বা ধর্মনীতির ভয়ে সহসা সবাই প্রবীণ হিতৈষী সাজবে না। আমরা মনে করি রাষ্ট্রের বিধিব্যবস্থা এমনটি হওয়া দরকার, যাতে নির্ধারিত সময়ে অক্ষম সহায়তাপ্রার্থী মানুষ মোটামুটি কষ্ট না পেয়ে চিরবিদায় নিতে পারে। তবে দেখতে হবে যাদের হাতে বিধিব্যবস্থার দায়িত্ব থাকবে, তারা যেন কঠিনভাবে জবাবদিহির আওতায় আসে। আইন থাকলেও কঠোরতার অভাবে গরিব বেচারাদের টাকা নয়ছয় হয় তার নজির আছে।

প্রবীণদের সমস্যা নির্ণয়ে তরুণ বা মাঝবয়সীদের ভাবা উচিত। কারণ তারা অচিরেই প্রবীণত্বের স্থান দখল করবে। অথচ তরুণরা কম ভাবছে। এটা বোধ করি বয়সের ধর্ম। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, তরুণরা নিজের কিংবা জগতের অন্ত পায় না। তাই প্রবীণত্ব নিয়ে ভাবার অবকাশ তাদের থাকে না। আমরা মনে করি, প্রবীণত্ব প্রাকৃতিক নিয়ম। একে সংশ্লিষ্টদের সহনীয় করে তোলার দায়িত্ব মনুষ্যত্বের কর্মের।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ



সাতদিনের সেরা