kalerkantho

বুধবার । ১২ মাঘ ১৪২৮। ২৬ জানুয়ারি ২০২২। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

শান্তি থাকলে উন্নয়ন টেকসই হবে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৮:৩১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শান্তি থাকলে উন্নয়ন টেকসই হবে

সমাজে, রাষ্ট্রে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টেকসই শান্তির জন্য সবাইকে নিয়ে পথ চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকরা। কারণ, শান্তি না এলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।

গতকাল শনিবার ঢাকায় দুই দিনব্যাপী বিশ্ব শান্তি সম্মেলনের প্রথম দিন দুটি প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ না হলে শান্তি আসবে না। আর শান্তি না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।

বিজ্ঞাপন

শান্তি সম্মেলনের অংশ হিসেবে ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘শান্তি, ন্যায়বিচার ও অধিকার’ এবং ‘শান্তির মাধ্যমে সামাজিক মঙ্গল ও টেকসই উন্নয়ন’ বিষয়ক দুটি প্যানেল আলোচনায় এসব পরামর্শ উঠে আসে। বক্তাদের অনেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন।

প্যানেল আলোচনার শুরুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, নিপীড়ন থামাতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সহিষ্ণুতার মনোভাব সৃষ্টি ও অন্যকে সম্মান দেখাতে পারলে টেকসই শান্তির বিশ্ব হতে পারে। সরকার একা ওই মনোভাব তৈরি করতে পারে না। মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্যানেল আলোচনায় বেশ কয়েকজন বক্তা বলেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজটি নিজেদের ঘরে, নিজের এলাকায় আগে করতে হবে। ‘শান্তির মাধ্যমে সামাজিক মঙ্গল ও টেকসই উন্নয়ন’ বিষয়ে প্যানেল আলোচনার সারমর্ম তুলে ধরতে গিয়ে আলোচনার সঞ্চালক আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজা বলেন, ‘শান্তি মানে শুধু সংঘাত, সহিংসতামুক্ত থাকা নয়। ঘরে, স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সব পর্যায়েই শান্তি থাকতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘সব দেশেই আদিবাসীসহ সবাইকে নিয়ে চলতে হবে এবং বৈষম্যহীন নীতি অনুসরণ করতে হবে। ’

আর্জেন্টিনার লেমকিন ইনস্টিটিউট অব জেনোসাইড প্রিভেনশনের কো-প্রেসিডেন্ট ও হাই ক্রিমিনাল কোর্ট র‌্যাপোর্টিয়ার ইরিন ভিক্টোরিয়া মাসিমিনো বলেন, মানবাধিকার থেকে শান্তি—এগুলো মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়ে এগোতে হবে। তিনি বলেন, ‘শান্তি অর্জনের জন্য অবশ্যই শান্তিতে বিশ্বাসী হতে হবে। ’

সিডনি ইউনিভার্সিটির সিডনি পিস ফাউন্ডেশনের সভাপতি আর্কি ল প্যানেল আলোচনায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বলেন, ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কিন্তু এ বিষয়টি বিশ্বে প্রতিফলিত হচ্ছে না। তিনি রোহিঙ্গা সংকটে সাড়াদানের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের প্রায় অর্ধেকই না পাওয়ার বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।

আর্কি ল বলেন, শান্তির জন্য সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের ওপর কাঠামোগত সহিংসতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি শান্তির জন্য মৌলিক অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জমায়েত ও দাবিদাওয়া তুলে ধরার স্বাধীনতা থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এসব অধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করারও আহবান জানান তিনি।

ওমানের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাদ আল মুকাদাম বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বে এত সংঘাতের অন্যতম মূল কারণ অন্যকে অধিকার না দেওয়া। অন্যের অধিকারের স্বীকৃতি না দিলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। ন্যায়বিচার না হলে শান্তি আসবে না।

মোহাম্মদ সাদ আল মুকাদাম আরো বলেন, পরস্পরকে স্বীকৃতি ছাড়া শান্তি আসবে না। আমাদের অবশ্যই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। শান্তি ও স্থিতিশীলতার উপায় হলো আলাপ-আলোচনা, পরস্পরকে সম্মান করা। ’

জাপানের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী ও শিশু অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ কমিটির সভাপতি মিকিকো ওটানি বলেন, বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি পরিবার, স্কুল, সম্প্রদায় ও সমাজে শিশুদের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ ও সংকট সমাধানে সহায়ক হয় এমন শিক্ষার ওপর জোর দেন।

নেপাল পিস অ্যান্ড সলিডারিটি কাউন্সিল জুয়ান প্রকাশ শর্মা শান্তির জন্য মানবতা, ন্যায়বিচার, অধিকার, ভালোবাসা, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্বাধীনতার ওপর জোর দেন। তিনি আরো বলেন, এগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কিত।

পাকিস্তানের শান্তিকর্মী পীরজাদা মোহাম্মদ আমিন বলেন, বিচ্ছিন্ন থেকে কেউ শান্তি-সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। শান্তি ও ন্যায়বিচারের অধিকার প্রত্যেকের আছে। সবাইকে একে অপরের প্রতিযোগী নয়, সহযোগী হতে হবে।

নেপাল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্ঞানেন্দ্র বাহাদুর শ্রেষ্ঠ বলেন, শুধু রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার নয়, সাংস্কৃতিকসহ অন্যান্য অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। মহামারির সময় টিকা নিয়ে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অতি মুনাফার স্বপ্ন, সংরক্ষণবাদও জনগণের অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। তিনি জাতিসংঘকে বিশেষ কিছু দেশের প্রভাবমুক্ত হওয়ার ওপর জোর দেন।

নিউ ইয়র্কের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ফর উইম্যান অ্যান্ড পিস বিল্ডার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মারিয়া ভিক্টোরিয়া বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। সবাইকে নিয়ে শান্তি ও টেকসই উন্নয়ন হলে দারিদ্র্য কমে এবং সংঘাত এড়ানো সম্ভব। সরকার, নাগরিক সমাজ, জাতিসংঘ, আঞ্চলিক বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম শান্তি প্রতিষ্ঠা উদ্যোগে সহযোগিতা করলে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

মরিশাসের প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী আলি জুকুন বলেন, শান্তির জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হলো নিজের ঘরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

আরো বক্তব্য দেন শ্রীলঙ্কার জাতীয় ঐক্য ও পুনর্মিলনবিষয়ক দপ্তরের চেয়ারম্যান মহিন্দ কুশান, নেপালের লেখক ও বিশ্লেষক সুমন কুমার শ্রেষ্ঠ এবং জাপান পিস কমিটির সমন্বয়ক তাদাকি কাওয়াতা। ‘শান্তি, ন্যায়বিচার ও অধিকার’ বিষয়ে প্যানেল আলোচনার সঞ্চালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, শান্তির জন্য ড্রোন হামলা বন্ধ করতে হবে। কারণ, শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, পুরো গ্রাম, বাড়িঘর, সাধারণ মানুষ, নিরপরাধ শিশুরাও ওই হামলার শিকার হয়।

ফিলিস্তিনের মানবাধিকারকর্মী আকিল তুজফ ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের বর্বরতার বর্ণনা দেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা ছাড়া ফিলিস্তিনে শান্তি আসবে না বলে তিনি জানান।

ইরাকের মানবাধিকারকর্মী আহমেদ জালাল উদ্দিন মুস্তাফা, সেন্টার অব ভুটান স্টাডিজ অ্যান্ড গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস রিসার্চের প্রেসিডেন্ট দাসো কর্মা উরা, কানাডিয়ান পিস কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট মিগুইল ফিগুইয়া, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে এশিয়া জাস্টিস অ্যান্ড রাইটসের পরিচালক গালু ওয়ান্দিতা বক্তৃতা করেন।



সাতদিনের সেরা