kalerkantho

বুধবার । ১২ মাঘ ১৪২৮। ২৬ জানুয়ারি ২০২২। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

‘দ্যাশের জন্য যুদ্ধে গেছিলাম ভাবিয়া সুখ পাই’

৫০ বছর পার করেছে বাংলাদেশ। বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের বড় অংশ এখন জীবনসায়াহ্নে। তাঁদের মধ্য থেকে ৮০ বছর পেরিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লিখছেন কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিরা

দেবদাস মজুমদার, আঞ্চলিক প্রতিনিধি (পিরোজপুর)    

৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ১১:১৯ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



‘দ্যাশের জন্য যুদ্ধে গেছিলাম ভাবিয়া সুখ পাই’

আব্দুল সাত্তার

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী আব্দুল সাত্তারের বয়স এখন ৮৯ বছর। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার তেলিখালী গ্রামের এক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা তিনি। যে দেশটিকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন, জীবনসায়াহ্নে এসে সে দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী দেখতে পেরে তিনি আবেগাপ্লুত।  

‘আমাগো স্বাধীন দ্যাশ ৫০ বছর পার করছে, এর চাইয়া আনন্দের আর কী আছে! এই দ্যাশের জন্যই মুই যুদ্ধে গেছিলাম, এইটা ভাবিয়া সুখ পাই,’ কালের কণ্ঠের প্রতিনিধির কাছে এভাবেই বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীতে নিজের মনোভাব জানালেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল সাত্তার।

বিজ্ঞাপন

শৈশবেই পিতৃহীন, দরিদ্র কৃষিশ্রমিক সাত্তার একাত্তরে  দেশকে শত্রুমুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধে। সেদিনের অকুতোভয় টগবগে যুবক আজ বয়সের ভারে ক্লান্ত।

অশীতিপর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল সাত্তার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ‘গ্রামের আলী আকবর কমান্ডার মাঝে মাঝে কইতো, পাকিস্তানি জুলুমের বিরুদ্ধে একদিন যুদ্ধ অইবে। ঠিকই একদিন সন্ধ্যায় আলী আকবর ডাক দিয়া কয়, সাত্তার যুদ্ধের ডাক দিছে শেখ সাহেব। আমরা দ্যাশ স্বাধীনের জন্য

এ যুদ্ধে অংশ নিব। তুমিও থাকবা মিয়া। ’

তেলিখালী গ্রামের স্কুল মাঠে আলী আকবর কমান্ডারের কাছে ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে যোগ দিলেন সাত্তার। এদিকে রাজাকাররা পেছনে লাগল। চৌকিদারের কাছে এ কথা শুনে গর্ভবতী স্ত্রী আছিয়া বেগমকে মায়ের কাছে রেখে ঘর ছাড়েন তিনি। পকেটে মাত্র এক টাকা সাত আনা পয়সা!

কমান্ডার আলী আকবর, সেলিম তালুকদার ও রুস্তুম মাস্টারের সঙ্গে সুন্দরবনের শরণখোলা বগী এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গিয়ে ওঠেন। পরে সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনের নির্দেশে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে যান। ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প হয়ে রামপালের গিলাতলা ক্যাম্পে যান।

সেখানে বাঁশতলী গ্রামের যুদ্ধে অংশ নেন আব্দুল সাত্তার। সেই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর হাতে চারজন রাজাকার নিহত হয়। সাত্তারের বাঁ হাতে গুলি লাগে। চিকিৎসার জন্য শরণখোলা ক্যাম্পে যান। এর কিছুদিন পর দেশ স্বাধীন হয়। বাড়ি ফিরে দেখেন সন্তানের বাবা হয়েছেন।

স্বাধীনতা এলেও অবশ্য দরিদ্র সাত্তারের অভাব যায়নি। দুবেলা অন্নের জন্য আবার পরের জমিতে কাজ করতে হয়। এক পর্যায়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান। তখন ৩০০ টাকা করে ভাতা পেতেন। এখন তা ২০ হাজার। সম্মানের পাশাপাশি এই অর্থ বাঁচিয়ে দিয়েছে অক্ষরজ্ঞানহীন, কৃষি কাজ ছাড়া আর কিছু না জানা মানুষটিকে। ‘এ সরকার সম্মান না দিলে মোর ভিক্ষা করণ লাগত’, কৃতজ্ঞচিত্তে বলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল সাত্তার।

অশীতিপর আব্দুল সাত্তারের চার ছেলেমেয়ে। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে এইচএসসি পাস করে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ছোট ছেলে এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী।

আব্দুল সাত্তারের জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই। শুধু শেষ দিনগুলো একটি পাকা বাড়িতে কাটাতে চান। আর প্রত্যাশা তাঁর দুই ছেলে যেন যোগ্যতা মতো চাকরি পায়।



সাতদিনের সেরা