kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক

সন্ধ্যা রানী সাহা   

১ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৩:০৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক

Annual Sector Performance Report ২০১৯ অনুযায়ী ২০১০ সালে শিক্ষা সমাপ্তির (প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত) হার ছিল ৬০.২ শতাংশ। পুনরাবৃত্তি (Repetition) ছাড়া এই হার ৬৭.৩ শতাংশ। ২০১৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ৮১.৪ শতাংশে উন্নীত হয় এবং পুনরাবৃত্তি ছাড়া ৮৩.৫ শতাংশ। প্রকৃত ভর্তির হার (ছয় থেকে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার উপযুক্ত, তাদের ভর্তির হারকে প্রকৃত ভর্তির হার ধরা হয়) ২০১০ সালে ছিল ৯৪.৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭.৮৫ শতাংশে। সুতরাং প্রথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় অগ্রগতি হয়েছে বলতেই হয়। শিক্ষকসংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের আগমন-প্রস্থান এবং কার্যাবলি কঠোরভাবে পরীক্ষণের ফলে এই অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায়। আবার শিক্ষার মানের বিচার করতে গেলে আরো অনেক দূর যাওয়ার দরকার আছে বলে মনে করি। এই অগ্রসর হওয়ার প্রথম ধাপটি হলো প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কের অগ্রগতিসাধন। বিদ্যালয় পর্যায়ে আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক বলতে আমরা শুধু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্পর্ক বুঝে থাকি। এ ধরনের সীমিত সম্পর্ক মানসম্মত শিক্ষা অর্জনে খুব একটা সহায়ক নয়। সম্প্রতি পরিদর্শন করা একটি বিদ্যালয়ের রিপোর্ট থেকে উল্লেখ করছি। ২১ নভেম্বর ২০২১ তারিখে একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ৭২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৯ জন উপস্থিত। তাদের মধ্যে ১২ জন পড়তে পারে না। পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, ‘বাংলা রিডিং পড়া নিশ্চিত করতে ঝুষষধনষব-ভিত্তিক (চার্টসহ) পড়ানোর ব্যবস্থা করুন।’ শিক্ষার্থীরা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। অর্থাৎ শিশু শ্রেণি থেকে পড়তে পড়তে তারা চার বছর ধরে শিক্ষকের সঙ্গে আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কে যুক্ত আছে। এর মধ্য থেকে করোনা মহামারির কারণে ১৭ মাস বাদ দিলে এই পড়তে না পারা ১২ জন শিক্ষার্থী শিক্ষকের কাছে পড়েছে মোট ৩০-৩১ মাস বা ৯৩০ দিন। করোনাকালেও ওই বিদ্যালয়ের জনৈক ওঈঞ শিক্ষক নিয়মিত ঙহষরহব-এ ক্লাস নিয়ে তা ফেসবুকে আপলোড করেছেন। করোনাকালে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়িয়েছেন, তার প্রমাণ আছে। বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকসংখ্যা আট। দুই শিফটে পরিচালিত স্কুলে প্রথম শিফটে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়েছে। উপস্থিত ৩৯ জনকে দুজন শিক্ষক মিলে পড়ালেও ছয়জন শিক্ষক অলস সময় কাটিয়েছেন (অবস্থাদৃষ্টেই বলতে হচ্ছে)। তাঁরা অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনেও খোঁজখবর নেননি। কথা হলো, যে ১২ জন শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে না, তারা কি ইংরেজি পড়তে পারবে! এসব ব্যাপারে শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তাঁদের সবাই পিটিআই, ইউআরসি এবং সাবক্লাস্টার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বিদ্যালয়টি প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত। প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক এখানে সীমিত, তা আগেই বলেছি। সেই ফলাফলই পরিদর্শন রিপোর্টে ফুটে প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্র সম্পর্কে একটু আলোকপাত করছি। এই সম্পর্ক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, ম্যানেজমেন্ট কমিটি, পরিদর্শক, গ্রামবাসী থেকে শুরু করে দাতাগোষ্ঠী পর্যন্ত ব্যাপৃত। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। শিক্ষকরা অনেক সময় না বুঝিয়ে পরীক্ষায় পাসের বিষয়টি লাইন বাই লাইন মুখস্থ লিখতে বাধ্য করেন। এভাবে পঞ্চম শ্রেণি অতিক্রমের পর উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে তাদের যেতে হয় প্রাইভেট টিউটরদের কাছে। তাঁরাও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী যে পড়তেই জানে না তা ঙাবত্ষড়ড়শ করে নিজের মতো পড়িয়ে যান। ফল যা দাঁড়ায়—প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেকেই ঝরে পড়ে। ৭ আগস্ট ২০২০ ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন মোতাবেক দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার ৩৬ শতাংশ। করোনার কারণে তা বেড়ে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। জনগণ ও বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থে পরিচালিত প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত অবস্থা সবারই, বিশেষ করে অভিভাবকদের জানা দরকার। অথচ এমন কোনো ব্যবস্থা প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় নেই বললেই চলে। কারণ ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে যে চারজন অভিভাবক প্রতিনিধি আছেন, তাঁরা সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকেন। নিয়মিত সভা আহ্বান করা হয় না বা আহ্বান করা হলেও সভায় অনেকেই হাজির থাকেন না। এইতো অবস্থা। সভার এজেন্ডা এবং সিদ্ধান্তগুলো গতানুগতিক। যেসব শিশু পড়তে পারে, তাদের ওপর পড়ানোর ভার দিয়ে শিক্ষক নিজে নিষ্ক্রিয় থাকেন অনেক সময়। যারা পড়তে পারে না, তাদের ওপর সবাই অবিচার করে থাকে। অথচ তাদের প্রতিই বেশি নজর দেওয়া উচিত। আজকের কিশোর গ্যাং, কিশোর অপরাধ, সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, অদক্ষ মানবসম্পদ ইত্যাদি দেখে এ দেশের প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে অন্যান্য দেশ কী ভাবে কে জানে! এ জন্য অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। বিদ্যালয়ে যেসব সন্তানকে পড়তে পাঠিয়েছেন, তাদের প্রতি শিক্ষকরা সঠিক আচরণ করছেন কি না দেখা দরকার। প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না, সেটিও নজরদারির দরকার আছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইনস্ট্রাক্টররা কি শুধু প্রশিক্ষণ দিয়েই বসে থাকবেন? প্রশিক্ষণ বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব কার? বাংলাদেশে ১০ ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। সবখানে সরকারের নজরদারি সমানভাবে সম্ভব কি? সুতরাং প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কের আওতা বা পরিধি ব্যাপক। বিদ্যালয়কে যেমন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, গ্রামবাসী সবার মধ্যে আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাজের অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত থাকতে হবে। তা ছাড়া দেশের ঐতিহ্য, সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনধারা সম্পর্কে জ্ঞান, নৈতিকতা, পরমতসহিষ্ণুতা, দেশপ্রেম, উন্নত জীবনের স্বপ্ন লালন, অসাম্প্রদায়িকতা, বৈশ্বিক, ভৌগোলিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে হবে। তাহলেই একজন শিক্ষার্থী যথাযথ নাগরিক হিসেবে কিংবা ভবিষ্যতের কর্ণধার হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে। অতএব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সেভাবেই প্রস্তুত হতে হবে।

আমরা জানি বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে ‘সকলের জন্য শিক্ষা’ ঘোষণায় স্বাক্ষর করে। সে মোতাবেক ১৯৯৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। যেমন  Primary Education Development Programme-1 (PEDP-1) ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এবং PEDP-2 ২০০৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এবং  PEDP-3  ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কাজ করে। অতঃপর ২০১৮ সালের ২২ মে  Primary Education Development Programme প্রকল্প (PEDP-4) অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সাল পর্যন্ত। এ সময় প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪৪ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বিশ্ব গণিত অলিম্পিকের আয়োজন, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিদেশভ্রমণ, পাঠ্যসূচি সংশোধন, সব স্কুলে যোগ্যতাভিত্তিক টিচিং-লার্নিং উপকরণ সরবরাহ ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এ প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পটির সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা, ইইউ, ডিএফআইডি, এইড, সিডা ও ইউনিসেফ।

 PEDP-2-এর লক্ষ্য ছিল শতাব্দীর উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে দরিদ্রতা দূর করে বাংলাদেশের প্রচলিত সমাজকাঠামোয় স্থায়ী আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমতা আনয়ন করা। দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিগ্রস্ত শিশুদের শিক্ষা সম্প্রসারণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ঝুঁকিগ্রস্ত শিশু বলতে তাদেরই বোঝায়, যারা প্রতিকূল পরিবেশে বাস করে। যেমন—পথশিশু, চরম দরিদ্র ঘরের শিশু, কাজের ছেলেমেয়ে (শিশু শ্রমিক), শিশু যৌনকর্মী, যৌনকর্মীর সন্তান, দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী শিশু, নদীর চর ও হাওর এলাকার শিশু, সমুদ্র উপকূলবর্তী শিশু, শহরের বস্তি এলাকার শিশু, হরিজন-বেদে পরিবারের শিশু, চা শ্রমিকদের সন্তান, কারান্তরিন শিশু। তাদের পরিবারগুলো চরম দরিদ্রতা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, জাতিভেদপ্রসূত সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অবহেলার শিকার। অতএব যারা পারে তাদের পড়তে দিয়ে এবং তাদের দিয়ে অন্যদের পড়াতে দিয়ে অর্থাৎ দায়সারা রকমের শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনাকে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিহত করতে হবে। শিক্ষা সব শিশুর জন্য শুধু একটি সুযোগ নয়, এটি তাদের জন্মগত অধিকার। এ অধিকার সবার আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশের জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ঝুঁকিগ্রস্ত-নির্বিশেষে সব শিশুকে অর্জন করানো বাধ্যতামূলক হোক, এটিই আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।

লেখক : উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ



সাতদিনের সেরা