kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

মঙ্গলালোকে

মেড ইন বাংলাদেশ

মিরাজুল ইসলাম   

২৩ নভেম্বর, ২০২১ ০৩:১২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেড ইন বাংলাদেশ

মনে করুন আপনি বিদেশে কোনো দামি ব্র্যান্ডের দোকানে কেনাকাটা করতে গেলেন। শার্টের কলারে দেখলেন লেখা আছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। মনটা তখন মুহূর্তের জন্য হলেও আর্দ্র হয়ে উঠতে পারে। আবার না-ও পারে। তখন ইচ্ছা করলে নিজ দেশের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে বানানো শার্ট বাদ দিয়ে আপনি পছন্দ অনুযায়ী  ‘মেড ইন ইংল্যান্ড’ লেখা কোনো শার্ট কিনতে পারেন।

কেউ আপনাকে দেশদ্রোহী বলবে না। 

আবার একইভাবে আপনি হয়তো আব্বাসউদ্দীনের ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি গানের চেয়ে বেশি পছন্দ করেন মেহেদী হাসানের গজল কিংবা অনুপ জলাটার ভজন।

কেউ আপনার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন করবে না।

কিন্তু খেলাধুলায় নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশকে সমর্থন জানালে বিষয়টি ‘দেশপ্রেমের আলোকে’ ব্যাখ্যা করা হয়। কারণ প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ অব্দি খেলাধুলার ইতিহাসে গোত্র তথা জাতিতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতামূলক ব্যাপারটা জড়িয়ে আছে।

পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখব, আজ থেকে প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে ফ্রান্সের লাসো গুহাচিত্রে দৌড় এবং কুস্তি প্রতিযোগিতার দেয়ালচিত্র পাওয়া গেছে। পরবর্তী সময়ে সভ্যতার প্রতিটি ধাপে বিভিন্ন ইভেন্টের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা রোম থেকে মিসর পর্যন্ত প্রতিটি রাজ্য তথা রাষ্ট্রীয় শক্তিমত্তার রূপক অনুষঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে।

খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর প্রাচীন উপকথায় সুমেরীয় রাজা গিলগামেশের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় খেলাধুলায় পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় সম্মান ও গৌরবের অংশ হিসেবে। ক্ষেত্র বিশেষে এই দৈহিক শক্তিমত্তা শৈল্পিকভাবে প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কৌলীন্য প্রকাশ পায়।

আন্তঃরাষ্ট্র প্রতিযোগিতায় অলিম্পিক এই ধারণার সর্বোচ্চ উদহারণ। জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশে খেলাধুলা কখনো হয়ে উঠে অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধজয়ের বিকল্প। যেমন—১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের মাঠের লড়াইটা উত্তাপ ছড়িয়েছিল সেই সময়ে দুই দেশের মধ্যে সংঘটিত ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।

আমরা আরো দেখেছি, ১৯৯৫ সালে রাগবি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা নেলসন ম্যান্ডেলার অনুপ্রেরণায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো। তিনি তখন এই খেলাটির মাধ্যমে বর্ণবৈষম্যবিধ্বস্ত দেশটিকে একীভূত করার চেষ্টা করেছিলেন। ক্রীড়ার বিশেষ ভূমিকা ম্যান্ডেলা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

একইভাবে ভারত উপমহাদেশে খেলাধুলা ঘিরে উন্মাদনার ইতিহাসটি মূলত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে সৃষ্ট। দেশ বিভাগের পর ভারত-পাকিস্তান ক্রীড়া দ্বৈরথ ছিল মূলত অ্যাথলেটিকস, হকি এবং ক্রিকেটকেন্দ্রিক।

ভারতের মিলখা সিং, ধ্যানচাঁদ কিংবা গাভাস্কার-কপিল দেব প্রমুখের সুনামের মূলে রয়েছে প্রতিবেশী প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে সফল হওয়ার ইতিহাসে। একইভাবে ক্রিকেটার ইমরান খান, জাভেদ মিয়াঁদাদদের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি বড় হয় ভারতের বিপক্ষে সাফল্যে।

পরবর্তী সময়ে মাঠের বাইরের সমর্থকদের উন্মাদনা, বিশেষ করে ক্রিকেট ঘিরে বৃদ্ধি পেতে থাকে বাজার অর্থনীতির হাত ধরে। গত চার দশকের এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না।

১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার আগে বাংলাদেশের সমর্থকরা বিভক্ত ছিলেন ভারত, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবা অস্ট্রেলিয়া দলের সমর্থনে। তখন এই দেশের মাটিতে ভিন দেশের পতাকা উড়ত। যেমন এখনো ওড়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুমে।

কিন্তু ১৯৯৯ সালের পর থেকে স্বাভাবিকভাবে ক্রিকেটে অন্য দেশকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি এ দেশের মানুষের চিন্তায়ও আর আসেনি। কারণ লাল-সবুজ পতাকা তখন থেকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিন্ন দেশের সিরিজ ম্যাচগুলোতে খেলা এবং দেশপ্রেম হয়ে ওঠে সমার্থক শব্দ।

কিন্তু সম্প্রতি ব্যতিক্রম লক্ষ করা গেছে পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেট প্রতিযোগিতাসূত্রে।

কিছু বাংলাদেশির আচরণ ক্রিকেটসূত্রে একাধারে রহস্যময় রাজনৈতিক ধাঁধা এবং সরাসরি বিব্রতকর। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচে বাংলাদেশিদের তাদের পক্ষে সমর্থন দেওয়াটা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। কারণ সেই দেশটির সঙ্গে রয়েছে আমাদের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস!

অনেকে পাকিস্তানের জার্সি পরিধান করাকে ব্যক্তিস্বাধীনতার স্মারক হিসেবে দেখছেন। আরো বলতে চাইছেন শুধু পাকিস্তান নয়, নিজ দেশের বিপক্ষে যেকোনো দেশের জার্সি পরার অধিকার যেকোনো বাংলাদেশির আছে।  শুধু ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেশপ্রেম ব্যবচ্ছেদ করা নাকি ঠিক নয়!

আমি তাঁদের ডিয়াগো ম্যারাডোনার ৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের উত্তাপের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই।

এখনো কোনো আর্জেন্টাইন নাগরিক ব্রিটিশ পতাকা ওড়ানোর কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। নিজ দেশের প্রতি সমর্থনে অবিচল থাকার বিষয়টি আদতে সরল অনুভূতির ব্যাপার।

বোঝা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের প্রতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাজনিত অসহায়ত্ব এবং দীর্ঘ আওয়ামী শাসনের একচ্ছত্র আধিপত্যের কার্যকরণে যাঁদের মনে গভীর ক্ষোভ জন্মেছে মূলত তাঁরাই বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের জার্সি পরে চাঁদ-তারা পতাকা ওড়ানোকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে গুলিয়ে ফেলছেন। কিন্তু তাঁরা নিজেরাও জানেন রাজনীতির জটিল সমাধান খেলার মাঠে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং প্রতিপক্ষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায়। এই জাতীয় ধারণায় বিকৃত হতে পারে ‘জাতীয়তাবাদী’ দর্শনের মূল সংজ্ঞা। এই অপরাজনৈতিক বোধ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ম্যানিফেস্টো হতে পারে না।

প্রতীয়মান হয় বাংলাদেশে একটি প্রজন্মের মননে পাকিস্তান ইস্যুটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। যেহেতু বিষয়টি নিষ্পত্তির পথটি যত না আদর্শিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। একই সঙ্গে গত দুই দশকে প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় অনুষঙ্গ।

সুতরাং দেশের মাটিতে বসে প্রকাশ্যে নিজ দেশের বিপক্ষে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টির উৎস খুঁজতে প্রাথমিক দায়িত্বটি রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। শুধু একপেশে রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক তৎপরতা ও সমালোচনা-পর্যালোচনার মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখলে গ্যালারিতে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পাব। আশঙ্কা হয়, অদূরভবিষ্যতে কোনো একদিন লাল-সবুজ পতাকা শার্টের কলারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা পণ্যের সমতুল্য হয়ে উঠতে পারে।

নতুন প্রজন্মের কাছে পতাকার অন্তর্নিহিত প্রতীক এবং দেশপ্রেম শব্দটি তখন আরো জটিল হলে এ জন্য দায়ী কে?

লেখক : তথ্যচিত্র নির্মাতা, চিকিৎসক



সাতদিনের সেরা