kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

শুভবুদ্ধির উদয় হোক

জয়ন্ত ঘোষাল   

২২ নভেম্বর, ২০২১ ০২:৫৭ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



শুভবুদ্ধির উদয় হোক

সীমান্তবর্তী রাজ্যে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) এখতিয়ারের এলাকা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস হলো পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায়। রাজ্য সরকার তথা তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত আসলে পেছনের দরজা দিয়ে রাজ্যে এলাকা দখলের একটা চেষ্টা, যা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি আঘাত হানছে। সরকারি এই প্রস্তাবের পক্ষে ছিল ১২টা ভোট। আর বিপক্ষে ৬৩টা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএসএফের এখতিয়ারের এলাকাটা কিভাবে বাড়িয়েছেন?

তারা বিএসএফের কাজের এলাকা বাড়িয়ে ১৫ কিলোমিটার থেকে ৫০ কিলোমিটার করে দিয়েছে। কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিটা তারা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। ১১ অক্টোবর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএসএফের নজরদারির পরিধি বাড়ানোর কথা উল্লেখ হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ২৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশ্ন হলো, এই বিএসএফের এখতিয়ার বাড়ানো নিয়ে যে বিতর্ক সেই বিতর্ক কতটা প্রাসঙ্গিক? কতটা জরুরি? কেন কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা? বিএসএফের এখতিয়ার বাড়ানো নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

এখন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু প্রশ্ন তোলা যাক। প্রথমত, বিএসএফকে সমর্থন করেন বিজেপি নেতারা এবং কেন্দ্রীয় সরকার বলছে যে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে গরু পাচার হচ্ছে এবং তার জন্য নিরন্তর নানা রকম ঘটনা ঘটছে। এর জন্য এই বিএসএফের এখতিয়ার বাড়ানো দরকার। এমনকি শুভেন্দু অধিকারী, পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা হিসেবে তিনি বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গে বিএসএফের এখতিয়ার তো ৮০ কিলোমিটার করা উচিত। এখন সাম্প্রতিক সময়ে যে সংঘর্ষ সীমান্তে হয়েছে গরুপাচারকে কেন্দ্র করে তাতে দুজন বাংলাদেশের নাগরিক এবং একজন ভারতীয় নাগরিক বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আমি কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন করছি। প্রথম প্রশ্ন, বিএসএফের গুলিতে দুজন বাংলাদেশের নাগরিক এবং একজন ভারতীয় নাগরিক মারা গেলেন। কিন্তু যে অভিযোগে (গরুপাচার কেন্দ্র করে) তাদের ওপর গুলি চালানো হলো, তাহলে গরুগুলো কোথায় গেল? সেই গরুগুলো পাচার হয়ে যাওয়ার পরে কি গুলি চলল? সেই গরুগুলোকে কি পাওয়া গেল না? নাকি গরু ছাড়াই গরু পাচার হয়ে গেল? এই ব্যাপারে বিএসএফ এখনো পর্যন্ত কোনো সদর্থক ব্যাখ্যা দেয়নি। দ্বিতীয় প্রশ্ন, এর আগে তো ১৫ কিলোমিটার ছিল না! আরো কম এখতিয়ারে বিএসএফ কাজ করেছে। কিন্তু যখন পাঁচ কিলোমিটার এখতিয়ারে বিএসএফ কাজ করেছিল, তখন বাড়িয়ে ১৫ কিলোমিটার করা হয়েছিল। তাতে কিন্তু বিএসএফের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের যোগ্যতা প্রমাণ হয়নি। কেননা বিএসএফের এলাকাবাসী ১১টা জেলা রাজ্যের শতকরা ৩৭ ভাগ এলাকা এবং উত্তরবঙ্গের বেশির ভাগ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। যে বিএসএফ ১৫ কিলোমিটার থাকার দায়িত্ব ঠেকাতে পারেনি তারা ৫০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে সেই কাজ ঠেকাতে পারবে কোন যুক্তিতে? এ প্রশ্নটা কিন্তু তৃণমূলের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে ।

এর পরের প্রশ্ন যে কিছুদিন আগে বিএসএফ গরু পাচার চক্র এবং নানা ধরনের দুর্নীতি এবং বাংলাদেশ থেকে কিছু লোককে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢোকানোর ব্যাপারে বিএসএফের কিছু অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তাঁরা দুর্নীতিপরায়ণ, উেকাচ নিয়ে তাঁরা এই কাজটা করে থাকেন।

সুতরাং সরষের মধ্যেই যে ভূত আছে সেটা কিন্তু সিবিআই স্বীকার করেছে। সিবিআই বিএসএফের এক বড় কর্তা, যার নাম জিবু ডি ম্যাথিউ, দক্ষিণ বাংলায় কর্মরত ছিলেন। তাঁকে হাতেনাতে সিবিআই ধরে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সীমান্ত দিয়ে তিনি বিভিন্ন লোককে ধোঁকা দিয়ে সাহায্য করেন এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে সাহায্য করেন। আর সেই অভিযোগে তাঁকে যখন ধরা হয় তিনি স্বীকার করেন যে এভাবে দিনের পর দিন এপার-ওপার করেছেন। তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিএসএফের মধ্যেই যখন এই সরষের ভূত আছে, বিএসএফকে আরো কী করে মজবুত করা যায়? কী করে তাকে আধুনিকীকরণের পথে নিয়ে যাওয়া যায়? কিভাবে সেখানে দুর্নীতিমুক্ত করা যায়? এমনকি বিএসএফের বড় কর্তার বিবৃতি আছে যে বিএসএফে যেভাবে নিয়োগ হোক না কেন, বিএসএফের মধ্যে দুর্নীতি থেকে যাচ্ছে। বিএসএফকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না ।

পরবর্তী প্রশ্ন হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ এবং ভারতের সীমানা, বিশেষ করে যেটা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে একটা দীর্ঘ সীমানা রয়েছে। সেখানে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেছেন। আজ ২০২১ হয়ে গেল। যদি সীমান্ত নিয়ে এত সংবেদনশীলতা থাকে, তাহলে এখনো কেন এই সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া যেভাবে পাঞ্জাব সীমান্তে লাগানো হয়েছে সেই কাজটা কেন করা হয়নি? কেন এখনো এই সীমান্তকে ‘পোরাস বর্ডার’ বলা হয়। সবাই আমরা জানি, কত অনায়াসে সেটা ইরাবতী নদীর তীর থেকেই হোক বা পেট্রাপোল দিয়েই হোক—যেভাবেই হোক এমনকি উত্তরবঙ্গ দিয়েই হোক আগরতলা দিয়েই বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসার এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে যাওয়ার এটা অত্যন্ত সহজ একটা দস্তুর। এটা হয়েই থাকে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন কড়া ব্যবস্থা নেয়নি? শুধু বিএসএফের কিলোমিটার বাড়ালে কি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়?

এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। সেটা হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক। বিএসএফকে নিয়ে কেন্দ্রের ভূমিকা কী হবে? কিভাবে সেটার মোকাবেলা করা হবে? তার সঙ্গে কিন্তু বাংলাদেশের সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে। এটা সবটাই কিন্তু আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপার নয়। এর মধ্যে আর্থ-সামাজিক বিষয়ে জড়িয়ে রয়েছে। এটার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিষয় রয়েছে। এটার মধ্যে কূটনৈতিক বিষয় রয়েছে। কেননা বাংলাদেশ আয়তনে ছোট রাষ্ট্র হলেও তার জিওস্ট্র্যাটেজিক অবস্থান ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। যেটা নিয়ে আমি প্রতি সপ্তাহে লিখে চলেছি। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার গঠনের পর ভারত যখন পুতিনকে দিল্লিতে ডেকে এনে বৈঠক করছে। মস্কোতে গিয়ে ভারতের রাষ্ট্রদূত তালেবানের সঙ্গে বৈঠক করছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার দিকে এগোনোর কথা ভাবছে ভারত। তার কারণ হলো সরাসরি আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাক ওয়ান না হলেও দেখা যাচ্ছে যে শিখ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গুরু নানকের জন্মতিথিকে স্মরণ রেখে পাঞ্জাব ভোটের আগে আবার শিখ ধর্ম স্থানে ভারতের পাঞ্জাবের পুণ্যার্থীরা যেতে পারে তার ব্যবস্থা কিন্তু গ্রহণ করার কথা খোদ অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে যখন আমেরিকা চীনের সঙ্গে বৈঠক করছে যখন রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অর্থাৎ পুতিনের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির ফোনে কথাবার্তা হচ্ছে। যখন একটা জিগজাগ কূটনীতি অর্থাৎ সবার সঙ্গে সবার কথাবার্তা চলছে তখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই ভয়াবহতা, ক্লাইমেট নামের একটা ভয়াবহ মৃত্যুদূতের সঙ্গে যখন লড়াই করতে হচ্ছে, করোনার সঙ্গে যখন লড়াই করতে হচ্ছে, আর্থিক দুরবস্থা যখন চরমে, তখন কি বিএসএফের এই কিলোমিটার বাড়ানোটা অগ্রাধিকার হতে পারে? নাকি এ রকম একটা সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তার আগে যে রাজ্যে সেটা করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দেওয়া দরকার। কারণ এর আগে পাঞ্জাবের বিধানসভাও কিন্তু এই বিষয়ে একটা প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। তাহলে একতরফা বিজ্ঞপ্তি জারি করার মধ্যে একটা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা রয়েছে। আর সেটার ফলে তার একটা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের ওপরে তার কি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে সেটাও ভেবে দেখতে হবে। কারণ একজন বাংলাদেশের নাগরিক নিহত হলে তখন প্রশ্ন ওঠে, যে গুলিটা বিএসএফ চালিয়েছিল সেটা পায়ে না লেগে কেন বুকে এসে লাগে? কেন সেই গুলি মাথায় এসে লাগে? গুলি চালানোর কিন্তু একটা প্রশিক্ষণ, শিষ্টাচার থাকে।

শেষ করব একটা ঘটনা দিয়ে। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বিএসএফের গুলিতে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছিল। বাংলাদেশের সেই মেয়েটিকে বিএসএফ নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। সেখানেই সেটা শেষ নয়। তারপর তাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঝুলন্ত মৃতদেহের ছবি তোলা হয়েছিল। আর সেই ছবি প্রচার করেছিল বিএসএফ। যাতে ভবিষ্যতে এ রকম যাতায়াত বন্ধ হয়। অর্থাৎ একটা ভয়ংকর হার্ডলাইনের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নাকি এটা করা হয়েছিল। তার ফলে কিন্তু বাংলাদেশের জনমানসে একটা ভয়ংকর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা বারবার হলে শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষেও বিরোধী দলকে সামলানো একটা মস্ত বড় কাজ হয়ে যায়। এই মুহূর্তে যখন সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ এর পরও শেখ হাসিনা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষতার পথে হাঁটছেন। এই দুই দেশের সম্পর্কটা যাতে নষ্ট না হয়ে যায় তার জন্য কিন্তু একটা জরুরি মনোভাব ভারতকে দেখাতে হবে। যদি সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করতে হয় তার জন্য শুধু বিএসএফের এখতিয়ার বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত নয়। শুধু বিএসএফের গুলি চালিয়ে এক দিনের ঘটনা ঘটানো নয়। চোরাচালান এত দিন ধরে যদি হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য বিএসএফ কী কী ব্যবস্থা এত দিনে নিয়েছে সেটাও জানা দরকার। সীমান্তে যখন গরু পাচার হয় তখন গোটা শহর থেকে যখন নিয়ে আসা হয়, সেখানে বিএসএফ গিয়ে কী করবে? কেননা গরু কেনাবেচা কিন্তু বেআইনি নয়। মানুষ তো গরু বিক্রি করতেই পারে তার আর্থিক প্রয়োজনে। তো মানুষ গরু বিক্রি করে সেই গরুটা যদি কেউ কিনে নিয়ে আসে তারপর যদি সীমান্তে বসবাস করে সেই গরুটিকে নিয়ে তাতেও কিন্তু কারোর কিছু বলার নেই। কিন্তু গরুটা যখন পাচার হয় সেটা কিন্তু বিএসএফের ভূমিকা থাকে। সেটা সীমান্ত দিয়ে সেই চক্র শহরের ঢুকলেই সমস্যাটার সমস্যা হচ্ছে না। রাজ্য পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কি বিএসএফ কোনো কাজ করতে পারে? সুতরাং এখানে কিন্তু বিএসএফের এই প্রস্তাবে একদিকে যে রকম রাজ্য সরকারের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আঘাত করা হয়েছে। আবার অন্যদিকে বাংলাদেশ নামের একটা পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানুষের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। এই মুহূর্তে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতা মাথায় রেখে তা আরো মজবুত করার পথে এগোতে হবে। সেখানে বিএসএফের এই প্রস্তাব এই পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে দিচ্ছে। সুতরাং শুভবুদ্ধির উদয় হোক, এ কথা বলা ছাড়া আর অন্য কিছুই বলার অবকাশ নেই।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি 



সাতদিনের সেরা