kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

সেলাই করা খোলা মুখ

পশ্চিম সীমান্তে নরমেধযজ্ঞ

মোফাজ্জল করিম   

২০ নভেম্বর, ২০২১ ০৩:২০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



পশ্চিম সীমান্তে নরমেধযজ্ঞ

বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানি মনে হয় যেন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দিন পর পরই সংবাদপত্রের হেডলাইন হয় এই মর্মান্তিক ঘটনা। সেই সঙ্গে আমাদের কর্তৃপক্ষের তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ, অকুস্থলে বিজিবি (বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ) কর্মকর্তাদের উদ্যোগে ফ্ল্যাগ মিটিং, নিহত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের লাশ উদ্ধার (প্রায়শ প্রতিপক্ষ বিএসএফের (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) কাছ থেকে পচা-গলা মরদেহ ফেরত পেতে পেতে কয়েক দিন লেগে যায়) ইত্যাদি তৎপরতার খবরও জানা যায়। জানা যায় না শুধু কবে এই মানুষ হত্যা বন্ধ হবে, কিংবা আদৌ কোনো দিন বন্ধ হবে কি না। বাংলাদেশের মানুষ বোধ হয় ধরেই নিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে না। কারণ দুই দেশের উচ্চতম থেকে নিম্নতম পর্যায়ে এত মিটিং-মাটিং, এত সিদ্ধান্ত, নির্দেশ ইত্যাদির পরও যখন ট্রিগার-হ্যাপি বিএসএফকে থামানো যাচ্ছে না, তখন মানুষের হতাশায় নিমজ্জিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

এ দেশের—এবং নিশ্চয়ই ওপারেরও—বিবেকবান মানুষের স্মৃতিতে বছরকয়েক আগে ফেলানী নামের একটি ৯-১০ বছরের গ্রাম্যবালার কাঁটাতারের বেড়ায় গুলিবিদ্ধ ঝুলন্ত লাশের ছবি রাস্তার পাশের জ্বলজ্বলে বিলবোর্ডের মতো ভাসছে। ওই অবোধ শিশুটির ছবি নিশ্চয়ই দুই দেশের গভীর বন্ধুত্বের স্মারক নয়। বরং বন্ধুত্বপূর্ণ উষ্ণ হৃদয়ে একটি দগদগে লাল ক্ষত হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন ফেলানীর কাঁটাতারে ঝুলন্ত লাশ। অথচ এই ঘটনার পর দুই দেশের উচ্চ, এমনকি উচ্চতম পর্যায়ে সীমান্ত-হত্যা নিয়ে ম্যালা আলাপ-আলোচনা হয়েছে। স্বভাবতই উভয় পক্ষ সীমান্ত-হত্যা বন্ধে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আশ্বাস দিয়েছে, এমনটি আর হবে না। কিন্তু দিল্লি থেকে এই মর্মে যে আদেশ-নির্দেশ দেওয়া হয় তা দীর্ঘ পথ-পরিক্রমণের পর বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে কোথাও ঘুমিয়ে পড়ে, বাংলাদেশ সীমান্তে কর্মরতদের কাছে পৌঁছায় না! তা না হলে একটি ডিসিপ্লিনড ফোর্স তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ-নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যায় কী করে? আবার অবস্থাদৃষ্টে যেকোনো বিদূষক বলতেই পারে : আদেশ-নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল তো? নাকি দিল্লির কোনো কোল্ড স্টোরেজে স্থান লাভ করেছে ওগুলো।

বিএসএফের একমাত্র সাফাই বক্তব্য হচ্ছে তারা গুলি চালায় চোরাকারবারিদের ওপর, সাধারণ মানুষকে হত্যা করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তার মানে কি, আপনাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চোরাকারবারিদের পাকড়াও না করে গুলি করে মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন? আর গুলিও একেবারে ‘শুট টু কিল,’ আতুর-ন্যাংড়া করা নয়। (আহা! বড়ই দয়ার শরীর তেনাদের!) যাদের গুলি করে মারা হয় তাদের সবাই নাকি গরুচোর। সম্ভবত তাই। বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত প্রচুর গরু (শারীরিক পালোয়ানি গঠন-গাঠন ও অস্বাভাবিক উচ্চতার জন্য আগে একসময় বাংলাদেশে এগুলোকে বলা হতো ‘দোতলা গরু’) চোরাচালান হয়ে আসে। একমাত্র দুগ্ধপান, হাল-চাষ ও গাড়িয়াল ভাইয়ের গাড়ি টানার জন্য ভারতে এগুলো কাজে লাগে, বাংলাদেশ বা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো গোমাংস ভক্ষণকারী নেই বললেই চলে সোয়া শ কোটি মানুষের দেশ ভারতে। শতকরা ৯০ জন সনাতনধর্মী মানুষের কাছে গরু হচ্ছে দেবতাতুল্য। ‘গো দেওতা কা দেশ’ ভারতের এক শ্রেণির মানুষ তাই বাংলাদেশে (এবং বোধ হয় তাদের আরেক প্রতিবেশী পাকিস্তানেও) চোরাপথে গরু পাচারের রমরমা ব্যবসা করে আসছে আদ্যিকাল থেকে। ওদের দমন করতে ব্যর্থ হয়ে ঝালটা ঝাড়ে বিএসএফ জীবন বাজি রেখে সীমান্তরেখা পার করার দায়িত্বে নিয়োজিত হতদরিদ্র মানুষগুলোর ওপরে। গুলি খায় ওই ফ্রন্টলাইনের গরিব-গুরবোগুলো। অথচ এই বিশাল পাচার-বাণিজ্য যারা দুই দেশের সীমান্তরেখার বহুদূর থেকে, অর্থাৎ নিরাপদ দূরত্ব থেকে চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের কেউ আজ পর্যন্ত ধরা পড়েছে, অথবা তাদের ধরতে দুই দেশের কর্তৃপক্ষ যে আদৌ আগ্রহী, এমনটি দৃশ্যমান নয়। তখনই বিদূষক আবার টিপ্পনী কাটবে : ধরবে কেন? রাঘব বোয়াল ধরলে তো তেল-মসলার খরচ অনেক। তার চেয়ে ওই সব চুনোপুঁটি ক্যারিয়ারগুলোই ভালো। ওতে ভিটামিন বেশি। কোলেস্টেরল বাড়ার ভয়ও নেই। চোরাকারবারি, মজুদদারি, সিন্ডিকেটিং, মানি লন্ডারিং সবখানেই ওই একই সিস্টেম, বোধ হয় দুই দেশেই : মশা মারো, হাতি ছাড়ো।

তবে এই যে দুই দিন পর পর প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের গুলি করে মারা হয় এবং তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খবরও হয়, তাতে কি ইন্ডিয়ার মতো এত বড় একটি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় না? নিশ্চয়ই হয়। সবাই নিশ্চয়ই প্রশ্ন তোলে : এই মিয়ারা, চোরাচালান হয় না কোথায়? বরং ইউরোপ-আমেরিকায় আরো বেশি হয়। এটা ঠেকাতে মানুষ হত্যাই যদি একমাত্র উপায় হয়, তাহলে তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী অনেক দেশের জনসংখ্যা এত দিনে শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যাওয়ার কথা। আর সেসব চোরাই মাল তোমাদের একতলা-দোতলা গো-দেওতা নয়, শত কোটি ডলারের মাদক, অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, সোনাদানা, মানবপাচার ইত্যাদি। কই, তারা তো ‘দেখিবামাত্র গুলি’ করার নির্দেশ দেয় না। হ্যাঁ, পাকড়াও করো, বিচার করো, জেল-জরিমানা-ফাঁসি দাও। তবে সবই হতে হবে আইনানুযায়ী।

২.

সম্প্রতি একটা খবর শুনে ভালো লাগল। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিবেকবান কিছু মানুষ এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এটাই আশার আলো। সব দেশে অন্তত কিছু মানুষ সব কালেই থাকেন, যাঁরা ভারতীয় নন, বাংলাদেশি নন, পাকিস্তানি বা ইংরেজ, আমেরিকান নন, তাঁদের প্রথম পরিচয় তাঁরা মানুষ। তাঁরা বিশ্বমানবতার পূজারি। তাঁদের কাছে ফেলানী একটি বিদেশি বালিকা নয়, ফেলানী একটি মানবসন্তান। সে এমন নিষ্ঠুরভাবে নিহত হলে তাঁদের মন কাঁদে। তাঁরা প্রতিবাদমুখর হন। এ ধরনের মানুষ, যাঁরা বিশ্বমানবতা, বিশ্বভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী, তাঁরা যে যেখানে আছেন, এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সবাই এক মায়ের সন্তান। তাঁদের প্রথম ও প্রধান পরিচয় তাঁরা মানুষ। শাসকগোষ্ঠীর প্রাণ না কাঁদলেও তাঁদের প্রাণ কাঁদে। আফসোস, বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে তাঁরা উচ্চকণ্ঠ হতে পারেন না। তাঁরা বাধাগ্রস্ত হন নিজ বাসভূমে। বিশেষ করে, প্রতিক্রিয়াশীল দুষ্কর্মাদের দ্বারা। তবে হ্যাঁ, যদি পৃথিবীর নির্যাতিত, লাঞ্ছিত মজলুম জনগণ একসঙ্গে ধ্বনি তোলে অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে, তা হলে কায়েমি স্বার্থান্বেষীদের ক্ষমতার ভিত একদিন না একদিন ধসে পড়বেই।

আমি বিশ্বাস করি, ভারত-বাংলাদেশের সচেতন, সংবেদনশীল মানুষ যদি এই অন্যায় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সমবেত কণ্ঠে সোচ্চার হন, তাহলে দিল্লির নির্দেশ কলকাতা-নদীয়া-মুর্শিদাবাদ-জলপাইগুড়ি পৌঁছার আগেই পথ হারিয়ে ফেলবে না বা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে না কোথাও। আমি আরো বিশ্বাস করি, সব দেশে সাধারণ মানুষের মন-মানসিকতা, চিন্তাধারা একই রকম স্বচ্ছ, সুন্দর ও কল্যাণমুখী। মুশকিল হলো, শাসককুল সেগুলোর মূল্যায়ন না করে সব সময় ‘কাঞ্চন ফেলে কাচে গেরো’ দেন, গড়ে তোলেন অশুভ দেওয়া-নেওয়ার আঁতাত টাকার কুমির বদ লোকদের সঙ্গে। তাঁদের হিসাব-নিকাশের খাতায় দুয়ে দুয়ে চার নয়, কী করে পাঁচ মেলানো যায় সেটাই মুখ্য। সেখান থেকে তাঁদের ফেরাতে হলে ‘দুনিয়ার মজলুম ভাইসব, তোরা এক মিছিলে দাঁড়া/নয়া জামানার ডাক এসেছে এক সাথে দে সাড়া...’(পুরনো গণসংগীত, পঞ্চাশের দশকে আমাদের মুখে মুখে ফিরত) এই গণঐক্যের আবাহনী সংগীত গেয়ে সারা দুনিয়ার সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

সীমান্ত-হত্যার ব্যাপারে আমাদের সুযোগ্য কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন কেবলমাত্র ফ্ল্যাগ মিটিং, প্রতিবাদলিপি প্রেরণ ও শীর্ষ-আধাশীর্ষ পর্যায়ে বৈঠকের মাধ্যমে। তাঁরা কি তাঁদের ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের উভয় পার্শ্বে ব্যাপক সফর করে জনমত তৈরি করতে পারেন না চোরাচালানের বিরুদ্ধে? সেখানকার দরিদ্র শ্রেণির মানুষের জন্য বিশেষ প্রণোদনামূলক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে প্রাণসংহারক গরুচালানি কারবার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন না তাদের? অন্তত ওই সব এলাকার জনপ্রতিনিধিরা তো এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন।

আরেকটি কথা। বিএসএফের দ্বারা সংঘটিত প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক। আমার ধারণা তা হয়ও বটে। তবে এর ফলে সঠিকভাবে দায় নিরূপণ হয় কি না, কোনো ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত হলে তাকে কী শাস্তি দেওয়া হয়, তদন্তের ফলাফল বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় কি না ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় মতলববাজ, উষ্ণমস্তিষ্ক, ট্রিগার-হ্যাপি ব্যক্তিরা তাদের নরমেধযজ্ঞ চালিয়ে যেতেই থাকবে। এদের অনেকেই ‘—না শোনে ধর্মের কাহিনী’ মার্কা লোক। এদের কাছে মানুষের প্রতি, প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা, সৌহার্দ, সম্প্রীতির কোনো মূল্য নেই। হিংসা-বিদ্বেষ-প্রতিহিংসাপরায়ণতা, পরশ্রীকাতরতার বিষবাষ্পে এদের হৃদয় আচ্ছন্ন। এরা শুধু চায় দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগে থাকুক। তাহলে ঘোলা পানিতে আজীবন মাছ শিকার করতে তাদের খুব সুবিধা। অথচ দুই দেশের সাধারণ মানুষ চায় বন্ধুত্ব। তারা কোনো অবস্থাতেই দুই দেশের কষ্টার্জিত সুসম্পর্ক বিনষ্ট হতে দিতে চায় না। সেটা তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্তে নরহত্যা, মসজিদ-মন্দিরে আক্রমণ ইত্যাদি যেকোনো বিষয়েই হোক না কেন। এই সুসম্পর্ক দুই দেশের অগ্রগতি ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।

৩.

উপসংহারে সমষ্টি ছেড়ে ব্যষ্টিতে আসি। আমরা যতই হা-পিত্যেশ করি না কেন, বর্ষণ করি না কেন লিটার লিটার কুম্ভীরাশ্রু, যে মায়ের কোল খালি করে চলে গেল তথাকথিত চোরাকারবারি জোয়ান মর্দ, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছেলেটি, কিংবা চলে গেল কয়টি অবুঝ ছাওয়ালের একমাত্র আদরের অবলম্বন বাপজান, তাদের কান্না কি থামবে কোনো দিন? এদের ঘরে আজ কি চুলায় আগুন জ্বলবে? নাকি যে নিকষ কালো অন্ধকার হঠাৎ করে তাদের সূর্য-প্রদীপটা নিভিয়ে দিল, ওটাই চিরকালের জন্য হয়ে গেল তাদের ভবিতব্য?

আর কতকাল চলবে এই অন্যায় মৃত্যু?

লেখক : সাবেক সচিব, কবি
 [email protected]



সাতদিনের সেরা