kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৩০ নভেম্বর ২০২১। ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

নতুন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে নতুন প্রত্যাশা

ইকরামউজ্জমান

অনলাইন ডেস্ক   

১৯ নভেম্বর, ২০২১ ০৩:৪৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নতুন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে নতুন প্রত্যাশা

আবার নতুন দিনে, নতুন প্রত্যাশা উদ্দীপনা, চ্যালেঞ্জ, আত্মবিশ্বাস, ভয় না পাওয়ার মন্ত্রে সাহসের সঙ্গে ইতিবাচক মন নিয়ে নিজ সামর্থ্য ও বিশ্বাসকে তুলে ধরার হাতছানি পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ (তিন ম্যাচের) ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে আজ। সংযুক্ত আরব আমিরাতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সুপার টুয়েলভে খেলতে নেমে খালি হাতে দেশে ফিরে এসেছে জাতীয় দল। মাঠে খেলেন খেলোয়াড়রা। তাঁরাই নিজেদের কবর খুঁড়েছেন। বাংলাদেশ একমাত্র টেস্ট খেলুড়ে দেশ, খেলোয়াড়দের সামর্থ্য, মানসিক শক্তি, সাহস, সবাই মিলে খেলার চেষ্টায় চরম ঘাটতি থাকায় যারা কোনো টেস্ট প্লেইং কান্ট্রির বিপক্ষে জয়ের মুখ দেখতে পারেনি। এ বিষয়ে প্রচুর কথাবার্তা, আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, যা দেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে কখনো হয়নি। কেন দলের এত করুণ বিপর্যয়। কেন দলটি এলোমেলো হয়ে গেল? টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ধারাভাষ্য দিয়েছেন ডেল স্টেইন। একসময়ের বিশ্বের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলারদের একজন। বাংলাদেশ দল সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন হলো—‘বাংলাদেশ যেমনটা খেলেছে তারা এর চেয়ে ভালো দল। ম্যানেজমেন্টের কোনো ত্রুটি নেই। দায় খেলোয়াড়দেরই নিতে হবে। হয় খেলতে চাইবেন, অথবা নয়। তাঁরা কেউই খেলতে চাননি।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিশ্ব টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল ভিন্ন ভিন্ন দল। এবারের দ্বিপক্ষীয় সিরিজে প্রতিপক্ষ শুধু পাকিস্তান। এ ক্ষেত্রে সুবিধা হলো, ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ আছে। তবে টুর্নামেন্টের খেলার মতো দ্বিপক্ষীয় সিরিজে মনঃসংযোগ, গেম পরিকল্পনা, প্রতিপক্ষকে পড়তে পারা এবং আবেগ নিয়ে খেলার গভীরতায় ঢুকে খেলার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। মাঠের পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্ল্যান একের পরিবর্তে প্ল্যান দুইকে ত্বরিত বাস্তবায়ন করতে হয়। এক ওভারে তো নয়—দুই-তিন বলে, এমনকি এক বলেও খেলার রং পাল্টে যায়। বলা হয়, এটাই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য উপভোগ অবশ্য উভয় দলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয় না।

অনিশ্চয়তায় ভরপুর ক্রিকেট। টি-টোয়েন্টি সংস্করণে আরো বেশি অনিশ্চয়তা। এই সংস্করণে কিছু মৌলিক বিজয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। সংস্করণটি খেলে খেলে পক্ব এবং অভ্যস্ত হওয়ার বিষয়! বাংলাদেশ এই সংস্করণে ভালো ক্রিকেট খেলার মতো দল হয়নি। তাই আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রায়ই এলোমেলো হয়ে রণভঙ্গ! এই ক্রিকেটে কাজ করার সুযোগ আছে, কাজ করতে হবে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য! পরিকল্পনার মাধ্যমে সংস্কার সাধন ছাড়া উপায় নেই। সময় লাগবে কিছুটা। এই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ‘ক্যাজুয়ালটি’ মেনে নেওয়ার মানসিকতা নিয়েই কাজ শুরু করতে হবে। একটি দল নতুন করে পুনর্গঠন সহজ কথা নয়—বেশ কিছু চাহিদা এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজ করতে হয়।

ক্রিকেটে অনিশ্চয়তা আছে সত্যি। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখি। এর পরও কিন্তু বেশির ভাগ সময়ে শক্তিশালী দলই শেষ পর্যন্ত বিজয়ের বন্দরে নোঙর করে। ক্রিকেটের পরিসংখ্যান বই সেটাই তুলে ধরে রেখেছে তার বুকে। জয়ের সম্ভাবনা জাগানো মূল্যহীন, জয়কে আলিঙ্গন না করতে পারলে। বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টিতে শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যে অনুশোচনা, এর তো কোনো মূল্য নেই। লক্ষ্মী তো বীরের গলায় মালা দেয়!

পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০১৫ সালের পর হোম সিরিজ। ২০১৫ যেই তিন সংস্করণের সিরিজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছে, ছয় বছর পর আবার সেই পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনটি টি-টোয়েন্টি এবং দুটি টেস্ট ম্যাচের সিরিজ। এবারের দুটি টেস্ট ম্যাচ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পয়েন্ট অর্জনের বিষয়টি। ছয় বছর পর দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ক্রিকেট উৎসব একদম ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। অনেক প্রশ্ন, আশঙ্কা, উদ্বেগ আর কৌতূহল নিয়ে মাঠের দিকে তাকাতে হচ্ছে। ক্রিকেটে নিরাশার স্থান নেই। দেশের ক্রিকেট এখন একটা অস্বাভাবিক সময়ের মধ্যে আছে। মাঠ ও মাঠের বাইরে বিরাজ করছে হতাশা। কালো মেঘ ঢেকে ফেলেছে সাময়িকভাবে ক্রিকেটের রোদেলা আকাশ! অসহিষ্ণুতা, অপসংস্কৃতি আর নোংরা অক্রিকেটোচিত মানসিকতা এবং তার জঘন্য বহিঃপ্রকাশ ক্রিকেটকে জখম করেছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, ব্যক্তিগত অভিলাষ, হিংসা, উচ্চাভিলাষ, ব্যক্তি ও সমষ্টির স্বার্থের লড়াই স্থান পেয়েছে দেশের স্বার্থের ওপর। অনেকেই ভুলে গেছেন, ক্রিকেট তো শুধু বাংলাদেশের জন্য একটি খেলা নয়, এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু। বিশ্বাস করি, ক্রিকেটে শুভ জীবনবোধের জয় হবে। মেঘের আড়াল থেকে সূর্য বেরিয়ে আসবে।

পাকিস্তানের সঙ্গে ছয় বছর আগে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাহসের সঙ্গে করতে পেরেছে আমাদের দল, এখন রূঢ় বাস্তবতায় সেটা ভাবা যায় না! ক্রিকেট-জীবনে ছয় বছরে আমরা এগোতে পারিনি। উদ্যোগের অভাব, ভেজাল চিন্তা-ভাবনা, হঠাৎ হঠাৎ পাওয়া সাফল্য নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগা, ভেজাল খেলায় মিডিয়ার সৃষ্টি তারকা খেলোয়াড়দের অভিমান; আয়নায় মুখ দেখার নির্দেশ হচ্ছে বলে দেশের হয়ে খেলা, না হলে না খেলা; আমার বিকল্প নেই মনোভাব—খেলাকে এরই মধ্যে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। দেশের ক্রিকেটের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।

মনে রাখতে হবে, সম্মিলিত সঠিক প্রচেষ্টায় যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা সম্ভব। ক্রিকেটের সংকট মোকাবেলায় বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ছাড়া উপায় নেই। চাই প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি কিছু। পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৬ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা দেখে মনে হচ্ছে বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট মহল নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। তাড়াহুড়া করে কিছুই সম্ভব নয়, টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ এরই মধ্যে বলেছেন, ‘সময় লাগবে। অনেক কাজ করতে হবে।’

পৃথিবীতে কোনো কিছুই অনিবার্য নয়। অনেক খেলোয়াড় খেলতে চাইবেন না, থাকবেন না, কারো বয়স হয়ে যাবে, কেউ কেউ দেশের ক্রিকেটের আবেগ ব্যবহার করতে চাইবেন নিজস্ব স্বার্থে—কোনো সমস্যা নেই, ক্রিকেট থাকবে। নতুন খেলোয়াড়রা আসবেন, তাঁরা দেশের হয়ে হাল ধরবেন। শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালে দেখা যাবে, তারা কিভাবে দল পুনর্গঠন করে এখন ফল পেতে শুরু করেছে। ক্রিকেট নিয়ে ‘অ্যাডভেঞ্চারিজম’-এর সুযোগ নেই। ক্রিকেটকে দেখতে হবে বাস্তবতার আলোকে—পরিকল্পনায় তার প্রতিচ্ছবি থাকতে হবে।

তারকা খেলোয়াড় বাবর আজমের নেতৃত্বে পাকিস্তান দলটি অত্যন্ত শক্তিশালী। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই দলটি অসাধারণ পারফরম করেছে। সেমিফাইনালের আগে পর্যন্ত গ্রুপ ম্যাচে পাকিস্তান ছিল একমাত্র অপরাজিত দল। তারা সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের কাছে পরাজিত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে। এর পরপর মধ্যপ্রাচ্য থেকে চলে এসেছে বাংলাদেশে। ইতিবাচক দিক হলো, দলের অধিনায়ক বলেছেন, তাঁরা এই টুর্নামেন্ট থেকে অনেক কিছু শিখেছেন, যা তাঁদের ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্বপ্নপূরণে কাজে লাগবে। ২০২২-এর দিকে তাকিয়ে ঢাকা থেকেই তাঁর দল কাজ শুরু করবে। পাকিস্তান দলে আছেন কয়েকজন অলরাউন্ডার, এটি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অনেক বড় শক্তি। এই দলটি পুরোপুরি ভারসাম্যময়। দলের স্পিন এবং গেম অ্যাটাক দুটোই শক্তিশালী। খেলোয়াড়রা আগ্রাসী।

ঢাকার উইকেট কেমন হবে—এই আলোচনা চলছে। ক্রিকেট যাঁরা বোঝেন, যাঁরা অনুসরণ করেন, তাঁরা চাইছেন স্পোর্টিং উইকেট তৈরি হোক। বাংলাদেশ নতুন করে শুরু করুক। বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও হতে পারে, এর পরও শুরু হোক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তো বাইরে অনেক বেশি খেলতে হবে। ২০২২ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে। আগামী এক বছরে খুব বেশি খেলার সুযোগ পাবে না বিদেশি দলের বিপক্ষে। সুযোগ এখন থেকে কাজে লাগাতে হবে। মাহমুদ উল্লাহর নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করা হয়েছে। এই স্কোয়াডে তামিম, সাকিব, মুশফিক, সাইফুদ্দিন, লিটন, সৌম্য, রুবেল অনেকেই নেই। কেউ খেলতে চাননি, কেউ কেউ ইনজুরিতে পড়েছেন, কাউকে কাউকে বাজে পারফরম্যান্সের কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে। কাউকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। দলে একদম নতুন মুখ আকবর আলী। আকবর অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক ছিলেন। টি-টোয়েন্টি অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা সাইফ হাসান, ইয়াসির আলী, শহিদুল ইসলাম স্কোয়াডে আছেন। নাজমুল হোসেন ও আমিনুল ইসলামকে আবার স্কোয়াডে ঢোকানো হয়েছে। আজ থেকে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকব।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



সাতদিনের সেরা