kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

ইউপি নির্বাচন

আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, গুলিতে মারা গেছে ২০

মোট মৃত্যু ৪০, দুজনের মৃত্যু পুলিশের গুলিতে

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৩ নভেম্বর, ২০২১ ০৭:২৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, গুলিতে মারা গেছে ২০

চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে ৪০ জন। তাদের মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ২০ জনকে। তাদের দুজন নিহত হয়েছে পুলিশের গুলিতে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে রাজবাড়ীর বাণীবহ ইউনিয়ন পরিষদের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এই নির্বাচনে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেশি হয়েছে নরসিংদী ও কক্সবাজার জেলায়। অন্যান্য এলাকায়ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে বৈধ অস্ত্রের ব্যবহারও হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতায় গুলিতে একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যানের শটগান জব্দ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলি হয়। বোমা-ককটেলেরও ব্যবহার হঠাৎ বেড়েছে।

নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, আগ্নেয়াস্ত্র দ্রুত মৃত্যু ঘটায় বলেই এবার নির্বাচনী সংঘর্ষে প্রাণহানির সংখ্যা বেশি।

এবারের ইউপি নির্বাচনে গতকাল পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় গুলিতে নিহত হয়েছে নরসিংদীতে ৯ জন, কক্সবাজারে পাঁচজন এবং একজন করে নিহত হয়েছে রাঙামাটির কাপ্তাই, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, পাবনার সুজানগর, কুমিল্লার মেঘনা, ভোলার চরফ্যাশন ও রাজবাড়ীতে। তাদের মধ্যে কুমিল্লা ও কক্সবাজারে দুজন পুলিশের গুলিতে মারা যায়।

নির্বাচনে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে গত ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন আয়োজিত এক সভায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান তাঁর বিভাগের অর্ধেকের মতো ইউপি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে নির্বাচনের আগে বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ার প্রস্তাব রেখেছিলেন; কিন্তু সেই প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশনের সাড়া মেলেনি।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী (অব.) গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই সভায়, বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি উল্লেখ করে বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেশি হয়েছে নরসিংদীতে। এটা মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়। শুধু নির্বাচন নয়, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও এটা অশনিসংকেত।

শাহাদৎ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনী সহিংসতায় বৈধ না অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা চিহ্নিত হওয়া দরকার। অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করা হলে বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ায় আরো সমস্যা হতে পারে। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যারা বৈধ অস্ত্র রাখে, তাদের জন্য নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আমার ধারণা, এ নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের মধ্যেই অস্ত্রের মহড়া চলছে।’

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ও বর্তমান সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ বিষয়টি সম্পর্কে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে কিছুটা সহিংসতা হয়, কিন্তু এবার মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। দেশের কিছু এলাকা ঐতিহাসিকভাবে সহিংসতাপূর্ণ। যেমন নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জের কিছু অংশ। এসব এলাকায় বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। এসব এলাকায় গোলমাল বেশি হয়। এগুলোতে আগাম শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি ছিল বলে মনে করি।’

নরসিংদীতে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে : তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে যেকোনো সংঘর্ষে নরসিংদীতে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। গত দুই সপ্তাহে রায়পুরা ও সদর উপজেলায় নির্বাচনী সহিংসতায় ৯ জন নিহত হয়েছে। ৯ জনই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। নরসিংদীবাসী এ জন্য এই নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করছে।

তবে নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাহেব আলী পাঠান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু নির্বাচন নয়, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ। আমরা বিভিন্ন সময় অভিযানে চরাঞ্চল থেকে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল, পাইপগান, ওয়ানগান, টেঁটা উদ্ধার করেছি। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবও অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।’

পুলিশ সুপার আরো বলেন, আগে চরাঞ্চলের সংঘর্ষে টেঁটা কিংবা দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করা হতো। সম্প্রতি আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। আর এই আগ্নেয়াস্ত্রের বেশির ভাগ স্থানীয়ভাবে তৈরি। তারা এলাকার বাইরে থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিজেরাই সেগুলো তৈরি করছে আর সংঘর্ষে ব্যবহার করছে। নরসিংদীতে নির্বাচনী সহিংসতায় যে ৯ জন মারা গেছে, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তে তাদের প্রত্যেকের শরীরে শটগানের গুলি পাওয়া গেছে।

সাহেব আলী পাঠান বলেন, শুধু নির্বাচন নয়, চরাঞ্চলের লোকজন আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সারা বছরই সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এটা তাদের কৃষ্টি-কালচারে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে তাদের বের করে নিয়ে আসতে প্রথমেই দরকার পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা।

কক্সবাজার পরিস্থিতি : কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মামুনুর রশীদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনের সময় কোনো লাইসেন্সধারী অস্ত্র অবৈধভাবে ব্যবহার ও প্রদর্শন করা যাবে না বলে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। এটা নির্বাচনের আগে যথারীতি জনসাধারণকে অবহিতও করা হয়ে থাকে। তিনি আরো বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কাজটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর রুটিন কাজ। তারা করেও থাকে। তবু নির্বাচন চলাকালে অবৈধ অস্ত্রের বিষয়টি জেলা পুলিশ সুপারকে জানানো হবে।

কক্সবাজারে নির্বাচনী সহিংসতায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেখানে দায়িত্ব পালনকারী নির্বাচন কর্মকর্তারও। আগামী ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বিভিন্ন মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি এবং বহিরাগত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানার ওসিকে লিখিতভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।

রেজাউল করিম বলেন, গত দুটি ধাপের নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাবে অস্ত্রবাজির মাধ্যমে খুনের ঘটনা ঘটেছে। চলতি ধাপের নির্বাচনেও এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার যদি হয়ে থাকে সেগুলোর বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র আছে, সেগুলো চিহ্নিত করে উদ্ধার করা দরকার। যেন আগামী দিনে আর এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।’

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।]



সাতদিনের সেরা