kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

লোক-দেখানো সবুজ কর্মসূচি নয়, সত্য বলতে হবে

এড মিলিব্যান্ড   

৪ নভেম্বর, ২০২১ ০৩:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লোক-দেখানো সবুজ কর্মসূচি নয়, সত্য বলতে হবে

গ্লাসগোতে এই সপ্তাহে কপ-২৬-এ অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের জলবায়ু জরুরি অবস্থা সম্পর্কে ধামাচাপা দেওয়া বাস্তবতা অথবা সততা প্রদর্শন—যেকোনো একটি বেছে নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিও শুনতে হচ্ছে। এখন বিপর্যয় প্রতিরোধের কোনো সুযোগ যদি থাকে, তাহলে আমাদের সত্য ও অকপটতার পথই বেছে নিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো পরিসংখ্যান। এই শীর্ষ সম্মেলন সম্পর্কে লাখ লাখ শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে; কিন্তু এর মূল কাজ ব্যাখ্যা করার জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। অনেক নেতাই বলেছেন, আমাদের বিশ্বের উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে; কিন্তু এটা কী অর্থ বহন করে তা জোরের সঙ্গে বলার লোক খুবই কম।

আমরা জাতিসংঘের পরিসংখ্যান থেকে জানি, ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির পর ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব ৫৩ বিলিয়ন টন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে নির্গমন ২৫ বিলিয়ন কমাতে হবে এবং বাকি যে ২৮ বিলিয়ন টন ব্যবধান থাকবে তা ওই নির্ণায়ক দশকে কমাতে হবে। যাঁরা আমাদের গ্রহের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন, তাঁদের প্রত্যেকের মনেই এই সংখ্যাগুলো থাকা উচিত।

দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, কপ-২৬-এর আগে যে অঙ্গীকারগুলো করা হয়েছিল তা মাত্র ৪ বিলিয়ন টন নির্গমন হ্রাসের সমান। এটি একটি বেদনাদায়ক ব্যবধান, যা আমাদের জলবায়ু বিপর্যয় ও ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো একটি বিধ্বংসী পথে নিয়ে যায়। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকারের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জি-২০-ভুক্ত কোনো দেশই যথেষ্ট কাজ করছে না।

যেহেতু আমরা বিজ্ঞানের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারি না, তাই আমাদের অবশ্যই নেতাদের বাধ্য করতে হবে—বিশেষ করে যাঁরা গ্লাসগোতে শুধু পুরনো প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে বাজার গরম করতে এসেছেন। তাই এই শীর্ষ সম্মেলন প্রাক-প্যাকেজ ঘোষণার একটি পক্ষকালব্যাপী উৎসব হতে পারে না। আমাদের অবশ্যই প্রয়োজনীয় অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।

এর অংশ হিসেবে নেতাদের অবশ্যই জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী অথচ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি ন্যায়বিচার করতে হবে। ২০০৯ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ প্রদানের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং গত জুন মাসে জি-৭ সম্মেলনে কভিড মোকাবেলায় বিশ্বকে টিকা সরবরাহের জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যে অঙ্গীকার করছিলেন, সেগুলো পূরণ করার সময় এসেছে। জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে অনেক দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশের যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে তা স্বীকার করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। চীনসহ বিশ্বের বৃহত্তম নির্গমনকারীদের ওপর সর্বোচ্চ চাপ তৈরির জন্য প্যারিসে আমরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ ও উচ্চাভিলাষী উন্নত দেশগুলোর মধ্যে একটি জোট গড়ে উঠতে দেখেছিলাম। সেটাকে ফের একত্র করার এটাই উপায়।

কোনো দেশকেই এটা ভাবতে দেওয়া যায় না যে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার কারণটি তাদের স্বল্প মেয়াদে কাজ না করার অজুহাত তৈরি করবে। যেমন—অস্ট্রেলিয়া ২০৫০ সালের মধ্যে নেট জিরো লক্ষ্য অর্জনের কথা বলে ২০৩০ সালের যে লক্ষ্য দিয়েছে তা বিশ্বকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের দিকে নিয়ে যায়। সৌদি আরব ২০৬০ সালের লক্ষ্য দিয়েছে, আবার এই দশকে তেল উৎপাদনও বাড়াতে চায়। সুতরাং এবারের সম্মেলনে আমাদের অথবা অন্য যেকোনো দেশ থেকে আসা এজাতীয় বৈশ্বিক গ্রিনওয়াশ (লোক-দেখানো সবুজ কর্মসূচি) আমরা মেনে নিতে পারি না।

বড় ধরনের কোনো চুক্তি ছাড়াই ২০০৯ সালে ব্যর্থ হওয়া কোপেনহেগেন কপ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ ছায়া নেমে এসেছিল। এখন গ্লাসগোতে ফলাফল যা-ই হোক না কেন, আমরা একই হ্যাংওভার বহন করার সামর্থ্য রাখি না। অপরিহার্য সত্য হচ্ছে, জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে জয় পাওয়া আসলে কোনো জয় নয়। ধীরে ধীরে জেতা মানে কোটি কোটি মানুষকে চরম দাবদাহের মুখোমুখি করা, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুতির দিকে ঠেলে দেওয়া এবং আমাদের প্রবালপ্রাচীরের মতো প্রাকৃতিক বিস্ময়গুলোকে ধ্বংস হতে দেওয়া। এর আরো অর্থ হলো জলবায়ু উদ্যোগের যে বাড়তি সুযোগ—যথাযথ ও সবুজ কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা, সেটা নস্যাৎ করা। সুতরাং গ্লাসগোতে লক্ষ্য অর্জনের পথ তৈরি করতে হলে আমাদের অতি দ্রুত প্রতিশ্রুতিতে ফেরত আসতে হবে।

আমরা এখন এই ১৫ দিনের সাফল্যের জন্য মরিয়া। গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলনে এগিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে আমরা যারা সরকারে নেই বলে ক্ষমতাও নেই, তাদের এই নির্ণায়ক দশকে আমাদের অগ্রগতি সম্পর্কে সত্য বলাটার ক্ষমতা অন্তত রয়েছে, তা যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন। সঠিক ফলাফল পেতে এই গুরুত্বপূর্ণ দুটি সপ্তাহে আমাদের দ্বিধাহীনভাবে এই শক্তি ব্যবহার করতে হবে।

লেখক : ব্রিটেনের বাণিজ্য, জ্বালানি ও শিল্প বিষয়ক ছায়ামন্ত্রী
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)
ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা