kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

ইউপি নির্বাচন

বিভেদ এড়াতে দলীয় প্রতীকে প্রার্থিতা চান না অনেক এমপি

তৈমুর ফারুক তুষার   

৩০ অক্টোবর, ২০২১ ০৯:১২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিভেদ এড়াতে দলীয় প্রতীকে প্রার্থিতা চান না অনেক এমপি

দলে অসন্তোষ, বিভেদ ও সংঘাত এড়াতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ চায় না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের একাংশ। এরই মধ্যে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ অন্তত পাঁচ জেলার ১২ থেকে ১৫ জন সংসদ সদস্য দলের প্রধান ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করেছেন। তাঁদের যুক্তি, এসব জেলায় ইউপি নির্বাচনে যে-ই প্রার্থী হোক না কেন আওয়ামী লীগই জিতবে।

এ ছাড়া আবেদন না করলেও আওয়ামী লীগের আরো অন্তত দুই ডজন সংসদ সদস্য তাঁদের এলাকায় চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীক চান না। এ ব্যাপারে তাঁরা দলের মনোনয়ন বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

দলীয় প্রতীক বরাদ্দ না দিতে যে আবেদনগুলো এসেছে, সেগুলোর মধ্যে তিন জেলার সংসদ সদস্যদের আবেদন যৌক্তিক মনে করেছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড। গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে ইউপি চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী থাকছেন না। অন্য জেলাগুলোতে দলীয় প্রতীকেই নির্বাচন হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপে সহিংসতায় মারা গেছে আটজন। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন হবে আগামী ১১ নভেম্বর। এ পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় মারা গেছে ১০ জন। এসব সহিংসতার প্রায় সবই আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যে হয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলটির একাধিক সূত্র জানায়, ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ দিতে গিয়ে দলের তৃণমূলে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। মনোনয়নবঞ্চিতরা অনেকেই দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিদ্রোহী) হিসেবে নির্বাচন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে দলে সক্রিয় আছেন এমন অনেক নেতাও নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। অনেক জায়গায় প্রাণঘাতী সংঘর্ষও হচ্ছে। এসব সামাল দিতে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা হিমশিম খাচ্ছেন। মনোনয়নবঞ্চিতরা সংসদ সদস্যদের প্রতি ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। এ বিরোধ আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। ফলে অনেক সংসদ সদস্যই চাচ্ছেন না ইউপি নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হোক।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জে প্রার্থী উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এটা করা হয়েছে। এমপিরা বলেছেন, তাঁদের এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীর জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই, যাদের সম্ভাবনা তারা সবাই আওয়ামী লীগ করে। এখন দল যদি একজনকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে এমপিরা অসুবিধায় পড়বেন। এই বিবেচনায়ই ওই তিন জেলায় নৌকার প্রার্থী দেওয়া হয়নি।’

দেশের অন্য কোনো সংসদীয় এলাকায় প্রার্থী উন্মুক্ত রাখা হবে কি না জানতে চাইলে কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘অন্য কোথাও প্রার্থী উন্মুক্ত থাকছে না।’

মনোনয়ন বোর্ডের আরেক সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছু সংসদ সদস্যের এলাকায় মনোনয়ন নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। এটা বাস্তবতা। আমরা চেষ্টা করছি দলের মধ্যে বিরোধকে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে। কেন্দ্রীয় নেতারাও বিভিন্ন এলাকায় বিরোধ নিরসনে কাজ করছেন।’

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনয়ন না দিতে যে সংসদ সদস্যরা আবেদন করেছেন তাঁরা হলেন গোপালগঞ্জ-২ আসনের শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাদারীপুর-১ আসনের নূর-ই-আলম চৌধুরী, মাদারীপুর-২ আসনের শাজাহান খান, মাদারীপুর-৩ আসনের ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, শরীয়তপুর-১ আসনের ইকবাল হোসেন অপু, শরীয়তপুর-২ আসনের এ কে এম এনামুল হক শামীম ও শরীয়তপুর-৩ আসনের নাহিম রাজ্জাক।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, শরীয়তপুরের তিন সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদার ও সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে স্বাক্ষরিত একটি আবেদন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে দেওয়া হয়েছে।

তাঁদের আবেদনপত্রে বলা হয়, শরীয়তপুরের ছয়টি উপজেলার ৬৪ ইউনিয়নের প্রতিটিতে গড়ে সাত-১০ জন বা তারও বেশি নেতা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে চান। তাঁদের বেশির ভাগই ত্যাগী, যোগ্য ও দলের জন্য নিবেদিত। এখানে জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত সংগঠনের কমিটি রয়েছে। কমিটিগুলো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতিশীল ভূমিকা রেখে আসছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও দলের সমর্থন সুদৃঢ়। এ জেলাটি আওয়ামী লীগের এবং শেখ হাসিনার দুর্গ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে এ জেলায় বিএনপির কোনো সংগঠন এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নেই। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে সংসদ পর্যন্ত তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। শরীয়তপুরে অতীতের সব নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।

ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী না দিতে অনুরোধ জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, ‘স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলের মনোনীত একক প্রার্থীকে নৌকা প্রতীক দিলে দলের শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান পদে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কাউকে নৌকা প্রতীক না দিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখলে ভালো হয়।’

আওয়ামী লীগের একটি সূত্রের মতে, কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারাও মনে করেন যে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলায় আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থন রয়েছে। এখানে ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলের নেতাদের বাইরে অন্যদের জয়ের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। যাঁরা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান তাঁদের বেশির ভাগেরই বহু কর্মী-সমর্থক রয়েছে। ফলে একজনকে মনোনয়ন দিলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এ কারণে প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।



সাতদিনের সেরা