kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

কালের কণ্ঠ ও এভারকেয়ার গোলটেবিল বৈঠক

প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে স্তন ক্যান্সার থেকে মুক্তি সহজ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ অক্টোবর, ২০২১ ২০:১১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে স্তন ক্যান্সার থেকে মুক্তি সহজ

অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, অতিরিক্ত ওজন, কায়িকপরিশ্রম ও ব্যয়াম না করাসহ আরো কিছু কারণে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে এসব ক্ষেত্রে অভ্যাসগত পরিবর্তন ও সচেতনা জরুরী। অন্যদিকে ৩০ বছরের পর থেকে নিয়মিত নিজে নিজে ঘরে বসেই স্তন পরীক্ষার মাধ্যমে স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা সহজ হয় এবং অল্প সময়েই ক্যান্সার থেকে মুক্তি মেলে। কারণ স্তন ক্যান্সারের বিশ্বমানের সব ধরনের উন্নত চিকিৎসাই এখন দেশে রয়েছে।

বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠ ও এভারকেয়ার ঢাকা হাসপাতালের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত 'স্তন ক্যান্সার: সচেতনতায় সুরক্ষা' শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ আলোচনকরা এ অভিমত তুলে ধরেন। এছাড়া স্তন ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সরকারের পক্ষ থেকে একটি জাতীয় গাইডলাইন ও জেলায় জেলায় চিকিত্সা সুবিধা বাড়ানোর তাগিদ দেন বিশেষজ্ঞরা।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ইস্টওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেডের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এ গোলটেবিল বৈঠকে সঞ্চালনা করেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।

এই বৈঠক থেকে বেশ কিছু সুপারিশ উঠে আসে। সুপারিশগুলো হলো- জাতীয়ভাবে বিশ্ব স্তন ক্যান্সার দিবস পালনের উদ্যোগ নিতে হবে; মায়েরা যখন স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে যায় তখন অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের সচেতনতার বিষয়টি জড়িয়ে দিতে হবে; দেশের মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত সেটার সঠিক কোনো তথ্য ভান্ডার তৈরি করতে হবে। কেন না, ক্যান্সার নির্মুলের প্রথম কাজটাই হচ্ছে আক্রান্তদের শনাক্ত করা; জাতীয় নিবন্ধনের মাধ্যমে আক্রান্তদের চিহ্নিত করে তাঁদের কীভাবে চিকিৎসা দেয়া যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে; স্তন ক্যান্সার দ্রুত চিহ্নিত করতে করতে পরিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে; শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন কাঠামো তৈরি করতে হবে যেন, ছাত্র ছাত্রীরা স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে জানতে পারে; স্ক্রিনিং প্রোগ্রামকে সফল করতে হলে বা স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে নির্নয় করতে সারাদেশে আল্ট্রাসনোগাইডেড কোর বায়োপসী ও হিস্টোপ্যাথলজী পরীক্ষা সহজলভ্য করতে হবে এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

বৈঠকের স্বাগত বক্তব্যে এভারকেয়ার হাসপাতালের পরিচালক (হাসপাতাল সেবা) ডা. আরিফ মাহমুদ বলেন, নারীদের স্ক্রিনিংয়ের আওয়তায় আনা অত্যন্ত জরুরী। অনেক মেয়েরা কষ্টের মাধ্যমে ক্যান্সার অতিক্রম করেছে। আধুনিক চিকিত্সা এখন দেশেই করা হচ্ছে। তারপরেও দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু চিকিত্সক মাত্র ১৫০ জন। ফলে আমি বলতে চাই চিকিৎসক তৈরি করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, যদি সঠিক তথ্য উপাত্ত না থাকে তাহলে আমরা কি করে বুঝবো অবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে। আজকের দিনে আমি বলবো, সরকারের পক্ষ থেকে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের পক্ষ থেকে এবং ক্যান্সার নিয়ে কাজ করে এমন বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসা উচিৎ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ক্যান্সার সারা বিশ্বেই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের জীবনাচারে একটা পরিবর্তন দরকার। এটা পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানে সকল ক্ষেত্রেই দরকার।

অনকোলজি ক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবদুল হাই বলেন, নানা রকমের সমস্যার মধ্যে গেলেও মা বোনরা কাউকে কিছু বলতে চায় না। এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এছাড়া খাদ্যভাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন অনেক জায়গাতেই ক্যান্সার নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। ফলে মা বোনরা এ বিষয়ে জানতে পারে।

এভারকেয়ার হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর (জেনারেল সার্জারি) অধ্যাপক ডা. পংকজ কুমার সাহা, সিনিয়র কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. শেখ মো. আবু জাফর, সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মোহাম্মদ ফরিদ হোসেন বৈঠকের আলোচনায় সচেতনতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁরা স্তন ক্যান্সারের মতো বিষয়টি গোল টেবিলের আলোচলায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান।

সিনিয়র কনসালটেন্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর মেডিক্যাল অনকোলজি ডা. ফেরদৌস শাহরিয়ার সাঈদ, একই বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট মেজর অব: অধ্যাপক শিবাশিস ভট্টাচার্য, সিনিয়র কনসালটেন্ট (রেডিয়েশন অনকোলজি) অধ্যাপক ডা. নরেন্দ্র কুমার, সিনিয়র কনসালটেন্ট  অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর (হিস্টোপ্যাথলজি ) ডা. এস এম মাহবুবুল আলম, কনসালটেন্ট (ক্লিনিক্যাল অনকোলজি) ডা. আরমান রেজা চৌধুরীর আলোচলায় উঠে আসে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার কথা। বৈঠকে তাঁরা বলছেন, কারো যদি স্তন ক্যান্সার হয়ে যায় তাহলে তাঁর কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে এই ধরনের সচেতনতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই স্তন ক্যান্সার হলেও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নেয়। কিন্তু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা খুব একটা কাজে আসে না। আবার বেশিরভাগ ক্যান্সার রোগীরা এমন একটা পর্যায়ে ডাক্তারের কাছে আসে যখন আর ডাক্তারের তেমন কিছু করার থাকে না।

আলোচনায় অতিরিক্ত কর কমিশনার ও দি ব্লু স্ক্যাই চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশনের প্রধান উপদেষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা আয়েশা সিদ্দিকা শেলী, এলআরএস'র কনসালটেন্ট (এইচআর অ্যান্ড ফিন্যান্স) নিলুফার রহমান, নাবিহা রাঈদা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী সদস্য ডা. রেজিনা খাতুন গুরুত্ব দেন প্রান্তিক পর্যায়ে ক্যান্সারের সচেতনতা তৈরিতে। এমনকি নবম দশম শ্রেণীর পাঠ্যসূচিতেও স্তন ক্যান্সারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে আহ্বান জানানো হয়।

এছাড়া নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করে গিয়ে ইশরাত জাহান ফেরদৌস ও তাহমিনা গাফফার বলেন, ভুল চিকিৎসার কারণে অনেক দেশে অনেক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। তাই সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা খুব দরকার। যাদের স্তন ক্যান্সার হয়েছে তাঁরা বোঝে জীবনে এটা কত কষ্টের সময়। এই সময় পরিবারের সবার নিজের পাশে দাঁড়ানো উচিৎ। আর নিজেও নিজের সাহস দিতে হবে।



সাতদিনের সেরা