kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

জলবায়ু গোপনীয়তা ও রাজনীতিবিদদের অনিচ্ছা

অনলাইন ডেস্ক   

২৭ অক্টোবর, ২০২১ ০৪:১৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্ত সরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) প্রকাশিতব্য প্রতিবেদনের কয়েকটি দফা নিজেদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর মনে হওয়ায় এর বিরুদ্ধে প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ কঠোরভাবে লবিং করছে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া নথিতে এই তথ্য জানাজানি হওয়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। অনিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ বা সংক্ষেপে কপ নামে পরিচিত জাতিসংঘের উদ্যোগ যখন থেকে শুরু হয়, তখন থেকেই ওই সব দেশ নিজেদের শিল্প, অর্থনীতি ও জনগণকে রক্ষা করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে। বিশেষ করে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে পুঁজিবাদী উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তারা।

২০১৯ সালে মাদ্রিদে যখন শেষবার বিশ্বের সরকারগুলো সম্মেলনে বসেছিল, তখন চূড়ায় বসে থাকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিরোধের দেয়ালের কারণে এর অগ্রগতি ভেস্তে গিয়েছিল। এরপর আশা করা হয়েছিল, ট্রাম্প চলে গেলে এমন একটি মার্কিন প্রশাসন আসবে, যে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে, যাতে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে ওঠা যায়। আসন্ন গ্লাসগো সম্মেলনের উদ্বোধনকে সামনে রেখে এখনো সেই লক্ষ্যই রয়ে গেছে। জলবায়ুর বৈশ্বিক হুমকি সম্পর্কে অকুণ্ঠ ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের সতর্কবাণীর কারণে বিশ্ব জলবায়ু শাসন অব্যাহত রাখা ছাড়া আর কোনো যুক্তিসংগত বিকল্প নেই। কপ এই জিনিসটাই বলতে চায়। যেমন—ব্রিটিশ ট্রেজারি এই সপ্তাহে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে, সক্রিয় থাকার চেয়ে নিষ্ক্রিয়তার মূল্যই বেশি হবে।

তবে চ্যালেঞ্জের মাত্রা অস্বীকার করার উপায় নেই, যা বিশাল ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাঁস হওয়া নথি থেকে দেখা যাচ্ছে যে সৌদি আরব, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া অব্যাহতভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করার বিষয়ে আইপিসিসির সুপারিশের বিরোধিতা করে যাচ্ছে। পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক বিষয়গুলো শিথিল করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। এই অবস্থানে সংস্থাটির সদস্য ইরাক ও নাইজেরিয়াও রয়েছে। এর মধ্যে মাংস খাওয়া হ্রাস করে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ সেলসিয়াস বা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার যে সুযোগ—এই প্রমাণের বিরুদ্ধে জোরালো যুক্তি দেখিয়েছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। এমনকি আর্জেন্টিনার পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হয়েছে যে মাংসকেন্দ্রিক খাদ্যাভ্যাস গ্রিনহাউস নির্গমন হ্রাস করতে অবদান রাখতে পারে।

আইপিসিসির প্রক্রিয়াটি শক্তিশালী এবং বিজ্ঞানভিত্তিক। ফাঁস হওয়ার কারণে যে গুরুতর উদ্বেগগুলো দেখা দিয়েছে তা শুধু এই কারণে নয় যে প্যানেলের পরবর্তী প্রতিবেদনটি যথেষ্ট পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা এমনটা মনে করছেন। বরং এর চেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সরকারগুলো অবস্থান নিয়েছে, যেমন—কয়লাচালিত বিদ্যুেকন্দ্র বন্ধ করতে অস্ট্রেলিয়ার আপত্তি, তাতে রাজনীতিবিদদের অনিচ্ছাই মারাত্মক উদ্বেগজনক।

এই অনীহা যুক্তরাজ্যেও রয়েছে। ব্রিটিশ সরকারকে পরামর্শ প্রদান করা তার জলবায়ু পরিবর্তন কমিটি এসংক্রান্ত কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, মন্ত্রীরা শুধু কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতেই অস্বীকার করেননি বরং সরকারি ওয়েবসাইট থেকে এসংক্রান্ত একটি নথিও সরিয়ে দিয়েছেন। মাংস খাওয়া ও বিমান চলাচল বিষয়ে পরামর্শগুলো উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। অথচ জানা গেল ভোক্তাদের আচরণ পরিবর্তনের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই ব্রিটিশ সরকারের।

কপ-২৬-এর প্রাক্কালে এই ধরনের অবস্থান দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সর্বোচ্চ মাত্রা তুলে ধরছে। দরিদ্র দেশগুলো থেকে ধনী দেশগুলোকে পৃথক করে রেখেছে মারাত্মক অসাম্য। জলবায়ু সংকটের কারণে এটা আরো নিষ্ঠুরভাবে বেড়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীদের সতর্ক করা হয়েছে যে বৈদেশিক সহায়তা বাজেট কাটছাঁটের কারণে দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে যে আস্থা হ্রাস পেয়েছে তা এবারের সম্মেলনের অগ্রগতিকে বিপদে ফেলেছে। অন্যান্য দেশের মতো যুক্তরাজ্যের বেশির ভাগ সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছে যে সম্পদবিনাশী পশ্চিমা জীবনযাত্রা অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। যুক্তরাজ্য এবং সারা বিশ্বের মন্ত্রীদের অবশ্যই অসুবিধাজনক সত্যটিকে কবর দেওয়ার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। কার্বনসমৃদ্ধ কর্মকাণ্ড, সেটা শিল্প-কারখানা বা ব্যক্তি—যার দ্বারাই ঘটুক, বিনা বাধায় চলে আসা ভানভণিতাগুলো গ্লাসগোতে চিরতরে সমাধিস্থ করতে হবে।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য)।

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা