kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই আরসাবিরোধীদের খুন

এস এম আজাদ, ঢাকা ও জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ   

২৩ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:১৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই আরসাবিরোধীদের খুন

প্রতীকী ছবি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা আল-ইসলামিয়াহ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতাসহ শিক্ষকরা ‘ইসলামিক মাহাজ’ নামের একটি রোহিঙ্গা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিছুদিন আগে খুন হওয়া রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহর সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) মতো এ সংগঠনও রোহিঙ্গাদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করে।

এদিকে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও তাদের সমর্থিত আল ইয়াকিন ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে ক্যাম্পে ‘উলামা কাউন্সিল’ গঠন করেছে। এ নামে তারা ক্যাম্পের প্রতিটি মসজিদ ও মাদরাসার নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। তাদের বিরোধিতা করে ‘ইসলামিক মাহাজ’ চালানোর কারণে কয়েকটি মাদরাসার শিক্ষক ও আলেমদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে আরসার অনুসারীরা। সম্প্রতি ইসলামিক মাহাজ ছেড়ে উলামা কাউন্সিলে যোগ দিতে শিক্ষকদের হুমকিও দেওয়া হয়।

এদিকে মহিব উল্লাহ খুনের পর আরসার অনুসারী হিসেবে সন্দেহভাজন অর্ধশত আটক হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে। তাদের চিহ্নিত করতে ১৮ নম্বর ক্যাম্পের কিছু রোহিঙ্গা ও মাদরাসার শিক্ষকরা সহায়তা করেছেন। এ কারণে আরসার অনুসারীরা প্রতিশোধ নেওয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ছয়জনকে হত্যা করেছে বলে মনে করছেন প্রশাসনের একাধিক সূত্র, মাদরাসাটির শিক্ষক, স্থানীয় রোহিঙ্গা ও বিশ্লেষক। তাঁরা বলছেন, মহিব উল্লাহ খুনের সঙ্গে গতকালের ছয় খুনের যোগসূত্র আছে। একই সন্ত্রাসী গ্রুপ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

আরসার অনুসারী গ্রুপের সঙ্গে এক ডজন সন্ত্রাসী বাহিনীও মিলিত হয়ে কাজ করছে। তাদের অপতৎপরতায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প। গত চার বছরে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দলবদ্ধ হামলা, সংঘর্ষ ও অতর্কিত হামলায় ২৩২ জন রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছেন।

বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এইচ ব্লকের বাসিন্দা হামিদ হোছন বলেন, ‘যে মাদরাসাটিতে হামলা হয়েছিল ওই মাদরাসাটি পরিচালনা করতেন ইসলামিক মাহাজ নামের একটি রোহিঙ্গা সংগঠন। এ সংগঠনটি রোহিঙ্গা অধিকার আদায়সহ, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফেরতে উদ্বুদ্ধকরণে কাজ করছে বলে জানায় সাধারণ রোহিঙ্গারা। এ ছাড়া সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের কল্যাণে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে থাকে। কিন্তু আরসা মতাদর্শী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংগঠন রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে কাজ সহজে মেনে নিতে পারেনি। তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় না। তাই মাহাজ সংগঠনকে নিবিয়ে দিতে তারা সংগঠনটির মূল কেন্দ্র মাদরাসায় হামলা চালিয়েছে বলে আমরা মনে করি।’

মাদরাসাটির দাওরা (উচ্চতর শ্রেণি) ছাত্র রহিমুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা দীন মোহাম্মদকে মাদরাসা ছেড়ে দিতে শাসিয়ে আসছিল অনেক আগে থেকেই। দীন মোহাম্মদ ইসলামী মাহাজের সঙ্গে জড়িত। আরসার প্রস্তাব ছিল মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্রদের আরসার শাখা সংগঠন উলামা কাউন্সিলের সঙ্গে কাজ করার। কিন্তু শিক্ষকরা এবং মাদরাসার পরিচালকরা তাদের প্রস্তাবে সায় না দেওয়ায় তারা পরিকল্পিতভাবে আজকের তাণ্ডব চালিয়েছে। আমরা এখন আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’

রোহিঙ্গা শিবিরের মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন,  আরসার মতাদর্শীরা তাদের পথে বাধা এলেই হামলা করছে, হত্যা করছে। তারা আর কোনো সংগঠনকে সেখানে দেখতে চায় না। মহিব উল্লাহ থেকে ছয় খুন—একই কারণে। তিনি আরো বলেন, ‘প্রশাসনের নজরদারি ও অভিযানের পাশাপাশি সাধারণ রোহিঙ্গাদের তাদের দাবির ব্যাপারে উজ্জীবিত করে তুলতে হবে। তারা যেন নিজেরাই এদের মোকাবেলা করে। যেন দলে না যোগ দেয়।’ 

সরেজমিনে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন রোহিঙ্গা বলেন, সন্ত্রাসী সংগঠন আরসা পুরো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার করছে। তাদের আলেমদের নিয়ে গঠিত সংগঠন উলামা কাউন্সিল ক্যাম্পের প্রতিটি মসজিদ ও মাদরাসার নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল। এরই মধ্যে ক্যাম্পের শতাধিক মাদরাসার নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে। যেসব মাদরাসা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেখান থেকে তারা তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। তারা মিয়ানমারে ফেরত না যাওয়ার পক্ষে মতামত তৈরির কাজ করছে। তারা একাধিকবার দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা ইসলামিয়াহ মাদরাসাটিও তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেষ্টা করেছিল। 

সূত্র মতে, মহিব উল্লাহর মৃত্যুর পর আরসার আল ইয়াকিন ও উলামা কাউন্সিলের বিরুদ্ধে কথা বলা সংগঠন হয়ে ওঠে ইসলামিক মাহাজ। মহিব উল্লাহ খুনের পর পুলিশ বেশ কিছু সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে। এই কারণে এইচ ব্লকের সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপরও ক্ষুব্ধ ছিল আরসার হামলাকারীরা। তারা গতকাল ভোরের হামলা শেষে যাওয়ার সময় অন্তত আটটি দোকান কুপিয়ে ভেঙে ফেলে। গুলি করে স্থানীয় লোকজনকে ভয় দেখায়। এই হামলার সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন আরসা সমর্থক জড়িত বলে দাবি করছে সূত্র।

বালুখালী ১৮ নম্বর ক্যাম্পের এইচ ব্লকের মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) ইউসুফ বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারে রাখাইনদের হাতে মার খেয়ে আশ্রয়ের জন্য এ দেশে পালিয়ে এসেছিলাম। এখন এখানে এসেও মার খেতে হচ্ছে। সন্ধ্যার পর ক্যাম্পে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আজ সন্ধ্যার পর কী ঘটবে তাও আমাদের কাছে অজানা। আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এখানে বিশেষ করে রাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করা দরকার।’

সূত্র জানায়, পাহাড় থেকে এসে আরসা অনুসারীদের সঙ্গে মিলে অপরাধ করে অন্তত এক ডজন ডাকাতদল। এদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্র আছে। এদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পে মাস্টার মুন্না গ্রুপ, মৌলভী ইউসুফ বাহিনী, রকি বাহিনী, শুক্কুর বাহিনী, আব্দুল হাকিম বাহিনী, সাদ্দাম বাহিনী, জাকির বাহিনী, নবী হোসেন বাহিনী, পুতিয়া বাহিনী, সালমান শাহ বাহিনী, গিয়াস বাহিনী ও শাহ আজম গ্রুপের সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে আতঙ্ক আছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে এক হাজার ২৯৮টি মামলায় আসামি হয়েছে দুই হাজার ৮৫০ জন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭১টি খুনের মামলা হয়েছে। এ সময় ৭৬২টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৮৭টি অস্ত্র, ৬৫টি ধর্ষণ, ৩৪টি অপহরণ ও ১০টি ডাকাতির মামলা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২২৬ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো ৩৫৪ জন। গতকাল  ছয়জন নিহত ও আহত ১০ জন।



সাতদিনের সেরা