kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৩০ নভেম্বর ২০২১। ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

কালের কণ্ঠ-সাইটসেভার্স গোলটেবিলে বক্তারা

সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে জনশুমারির আওতায় আনতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ অক্টোবর, ২০২১ ২১:২২ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে জনশুমারির আওতায় আনতে হবে

ছবি : কালের কণ্ঠ

ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২১ এর আওতায় দেশে এবং বিদেশে বসবাসকারীসহ সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে গণনায় আনতে হবে। একজনও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই গণনা থেকে বাদ পড়ছে না- এটা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরা আইন ২০১৩ ও নীতিমালা ২০১৫ এবং প্রতিবন্ধকতা বিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আলোকে পদপে নিতে হবে, যেন দেশে ষষ্ঠ জনশুমারির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাদের প্রতিবন্ধিতার সব ধরনের তথ্য বের হয়ে আসে।

আজ মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় ইস্টওয়েস্ট মিডিয়ার (ইডাব্লিউএমজিএল) সম্মেলন কক্ষে কালের কণ্ঠ ও সাইটসেভার্সের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনায় (২০২১) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা নিরুপণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘সমাজের একটা বড় অংশ নানা কারণে ডিসএবিলিটি বা প্রতিবন্ধীতায় ভুগছে। হয়তো আমরা তা পুরোপুরি নির্মূল করতে পারবো না। আমাদের দায়িত্ব হবে এটাকে কমিয়ে আনা। প্রকল্পের উপপরিচালক আপনাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাগুলো শুনেছেন। তিনি ফিরে গিয়ে সে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বললেন। আর প্রয়োজন হলে আমার সঙ্গে কথা বলবেন, আমি আছি। আমরা সবাই মিলে এই গণনার কাজটাকে আরো কিভাবে শাণিত করা যায় সে বিষয়ে আরো কাজ করবো। এটি একটি জাতীয় কাজ।’

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমি কিছু দিন আগে বলেছিলাম এটিই আমাদের শেষ কাজ- পরবর্তীতে আর যেন এভাবে করতে না হয়। এ কাজে ঢুকে আমার মাথা শেষ হয়েছে, এই যুগে এসে আমরা বাড়ি বাড়ি মাথা গুণছি। এখন সময় ডিজিটাল হয়েছে। আগামীতে যারা আসবেন প্রতি মূহুর্তে তারা তথ্য জানতে পারবে- এই ধরনের প্রযুক্তি আছে; আমাদের শুধু তা প্রয়োগ করতে হবে। তবে এবারের শুমারি আমাদের শেষ করতে হবে- যেহেতু আমরা এই কাজের মধ্যে আছি।’

ইডাব্লিউএমজিএল পরিচালক এবং কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘আমরা চাই পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায় পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে- সেই সুবিধাগুলো যেন আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পান। যদি তাদেরকে জনশুমারি ও গৃহগণনায় সম্পৃক্ত না করা হয় তাহলে তো প্রথমেই প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে এক ধরনের উদাসিনতা অনুভব করি। সুতরাং প্রতিবন্ধীদের জন্য কি কি সুযোগ-সুবিধা আমরা চাই, সেগুলো এই বৈঠকে আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকারের গোচরে আনতে চাই।’

শুভেচ্ছা বক্তব্যে কালের কণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী কালের কণ্ঠের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত হওয়ায় পরিকল্পনামন্ত্রীসহ সকল অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সঠিক তথ্য না থাকলে অনেক সময় পরিকল্পনা ঠিক হয় না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের সংখ্যাটি জানা, সে অনুযায়ী চাহিদা নিরুপণ করা এবং পরিকল্পনা তৈরি করে সেটা বাস্তবায়ন করা- এটিই কাজের মূল জায়গা।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২১ প্রকল্পের উপ-পরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, ‘আলোচনা থেকে আমি যতটুকু বুঝলাম গণণা থেকে কোনোভাবে যেন প্রতিবন্ধীরা বাদ না যায়। এ জন্য তাদের যে ১২টা ক্যাটাগ্যরি আছে সে অনুযায়ী তাদের লীপিবদ্ধ করতে হবে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। আমরা এবার পুরো জনশুমারিটি ডিজিটালি ট্যাবের মাধ্যমে করব। এতে একদিকে যেমন ডাটা এনালাইসিস করা সহজ হবে অন্যদিকে তথ্য হারানোর সুযোগ নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ১২টি ক্যাটাগরিতেই প্রতিবন্ধতীদের তথ্য সংগ্রহ করব। আমরা যে প্রশ্নপত্রটি তৈরি করেছি সেখানে প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা শুধু নয়, তাদের কতজন চাকরিজীবী, তাদের বয়স কত এবং তাদের কতজন ইন্টারনেট ব্যবহার করে- সবই জানা যাবে। এই সব তথ্য থেকে চাইলে প্রতিবন্ধীদের আলাদা ডাটাবেজও করা সম্ভব।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কর্মসূচির পরিচালক অদ্বৈত কুমার রায় বলেন, ‘আমরা ২০১১ সালে একটি জরিপ করি। তার আলোকে একটা নীতিমালা আমরা একমাস আগে করতে পেরেছি। এই জরিপ অনুযায়ী আজকের দিন পর্যন্ত আমরা বারোটা ক্যাটগিরিতে ২৩ লাখ ৮৩ হাজার জন প্রতিবন্ধীকে নিবন্ধিত করা আছে। চাইলে যে কেউ তথ্য নিতে পারবে- তবে তা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুয়ায়ী। আমরা কাজ করছি। আমাদের সার্ভারে সর্বশেষ ২০-২১ অর্থবছরে ৪ লাখের উপর ডাটা এন্টি হয়েছে। আমাদের ৫৭৬টি কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ ডাটা এন্ট্রি হয়।’

ইন্টারন্যাশনাল ডিসএবিলিটি অ্যালায়েন্সের ওপিডি এনগেজমেন্ট অফিসার ও আইনজীবী রেজাউল করিম সিদ্দিকি বলেন, ‘আমাদের জনশুমারিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফল আসে। কখনও দেড় শতাংশ আসে তো কখনও ৯ শতাংশ আসে। এখানে ১৭ কোটি মানুষের দেশে এক শতাংশের ব্যবধান মানে কয়েক লাখ মানুষের ব্যাপার। অর্থাৎ যখন ৮ শতাংশ পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে সরকারেরই দুইটা বিভাগের মধ্যে- তখন ব্যবধানের অঙ্কটা কোটির কাছাকাছি চলে যায়। এত বড় একটা সংখ্যক মানুষ সচেতন না, এটা বলার সুযোগ নাই। এই বড় ব্যবধানের মূল কারণ গণনার পদ্ধতির ধরণ। আমরা কীভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করছি, সেই জায়গা থেকেই ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। যদিও সরকারের পক্ষে প্রতিটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাছে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। এ ছাড়া আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ; প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য যা কিছু করা হচ্ছে, তা সবই তাদের সঙ্গে আলোচনা করে করতে হবে। এ জন্য সারাদেশব্যাপী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যেসব সংগঠন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তাদের কাজে লাগাতে হবে।’

অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আলবার্ট মোল্লা বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহ খুব কঠিন ব্যাপার। যারা তথ্য সংগ্রহে মাঠ পর্যায়ে কাজ করবে তাদের কাছেও পূর্ণ পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে যদি নির্ভুল তথ্য তুলে আনা না যায় তাহলে সঠিক সংখ্যা আমরা পাবো না।’

সিএসআইডির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর খন্দকার জহিরুল আলম বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় বড় বড় বাড়িতে ঢুকাই যায় না। ফলে সেসব বাড়ির যেগেুলোতে প্রতিবন্ধী মানুষ আছে তাদের কোনো সংখ্যাই জানা যায় না। বাড়িতে ঢোকার সময় দারোয়ানরাই আটকে দেয়। এ নিয়ে মানুষের আরো সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের গণমাধ্যমেরও বড় ভূমিকা দরকার।’

সাইটসেভার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রোজিনা রোজারিও বলেন, একটি দেশের সামাজিক ও সুষ্ঠু জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নে সঠিক জনশুমারির ভূমিকা কতটুকু প্রয়োজনীয় তা বলার অপক্ষো রাখে না। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য জনসংখ্যার ধরন প্রকৃতি বয়স লিঙ্গ শিক্ষাগত যোগ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এবং একটি দেশের যে সেবার প্রদানের বিষয়টি তার পরিকল্পনার ভিত্তিমূল হলো সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ জনশুমারি। দেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রয়েছে যে তিনি তার শারীরিক গঠনের কারণে জনগণনা থেকে বাদ পড়বেন না। বরং জনগণনরার কাজটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করেই বাস্তবায়িত হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। আমরা আনন্দিত যে মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী মহোদয়ের দূরদৃষ্টির ফলে এবারেই প্রথম দেশের বাইরের নাগরিকরা জনগণনার আওতায় আসবে, যা একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এখন পর্যন্ত আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ ডাটা পাওয়া মুশকিল বা দুষ্কর। সে কারণে জাতীয় তথ্যভাণ্ডারে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান লক্ষণীয়। ২০১০ সালের হাউজ হোল্ড এস্কপেন্ডটেচার সার্ভে (household expenditure) অনুযায়ী প্রতিবন্ধী জনগণের সংখ্যা ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ আবার ২০১৬ সালের হাউজ হোল্ড এস্কপেন্ডটেচার সার্ভে অনুযায়ী ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তাই জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের অসামঞ্জস্যতা দূর করার জন্য আসন্ন জনগণনা আমাদের একটি সোনালি সুযোগ। তাই মান্ত্রী মহোদয়ের কাছে নিবেদন, তাঁদের যেন অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেস করা হয়।

তিনি আরো বলেন, ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধীদের জন্য যে আইন রয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে জাতীয় প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রতিবন্ধীদের জনগণনার কথা বলা হয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এখানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, যারা তথ্য সংগ্রহ করবে তারা সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ পাবে। যেন তারা সঠিকভাবে কর্মসম্পাদন করতে পারে। এবং প্রতিবন্ধীদের কিভাবে গণনা করতে হবে তা তাদের মডিউলে থাকবে।

আলোচনাসভায় কি-নোট প্রেজেন্টেশনে সাইটসেভার্স বাংলাদেশের অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর অয়ন দেবনাথ বলেন, পৃথিবীতে প্রায় এক শ কোটি মানুষ প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বাস করছে। জনশুমারি আমাদের জন্য একটি বিশাল সুযোগ। এর মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যার গণনার সাথে সাথে দেশের অর্ননীতি, ডেমোগ্রামি কনডিশন তুলে ধরা যায়। সে অনুযায়ী দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়। জনশুমারিতে সব তথ্য থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে। ষাটোর্ধ্ব বা তার থেকে বেশি বয়সের মানুষের ৪৬ শতাংশ কোনো না-কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বাস করে। প্রতি দশটি শিশুর একটি প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বাস করে। 

তিনি আরো বলেন, একটি সমাজ একধরনে্র মানুষ নিয়ে নয়, বিভিন্ন ধরনের মানুষ নিয়ে গঠিত হয়। আর সোই সমাজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের একটি অংশ; তারা সেখানে থাকবেন। আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি করতে চাই তাহলে সংখ্যা জানতে হবে। বিশেষ করে যারা প্রতিবন্ধী তাদের যদি আমরা উন্নয়ন কাজে অংশগ্রহণ করাতে চাই তাহলে তাদের সংখ্যাটা জানা জরুরি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সব তথ্য সংগহ করা চ্যালেঞ্জিং। সে ক্ষেত্রে আমাদের ডাটার কোয়ালিটি ইনশিউর করতে হবে। তবে আমরা এটা আশা করছি না যে এক জনশুমারিতে সব ডাটা এক সাথে চলে আসবে। তবে আমাদের জনশুমারিতে প্রতিবন্ধীদের অবশ্যই অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কোনোভাবে বাদ দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে তাদের গণনার জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও নিয়োগ করা যেতে পারে।

এ সময় আরো বক্তব্য রাখেন ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের পপুলেশন প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চের প্রধান মাহবুব-ই-আলম, লিওনার্ড চ্যাশায়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ জহির বিন সিদ্দিক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সামাজিক নিরাপত্তা ও নীতি বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আমিনুল আরিফিন, ইনকুশন ওয়ার্কস প্রোগ্রাম অফিসার উৎপল মল্লিক, এসডিএসএলের ট্রেজারার হাসিবা হাসান জয়া প্রমুখ।



সাতদিনের সেরা