kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৩০ নভেম্বর ২০২১। ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

গ্রহণযোগ্য ইস্যু না থাকলে কর্মসূচি ব্যর্থ হবে

ড. সুলতান মাহমুদ রানা   

১৯ অক্টোবর, ২০২১ ০৪:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গ্রহণযোগ্য ইস্যু না থাকলে কর্মসূচি ব্যর্থ হবে

নির্বাচন সামনে রেখে মুখোমুখি অবস্থানে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি বারবার আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে। তাতে রাজনীতির মাঠ কিছুটা উষ্ণ হলেও দীর্ঘদিন বিএনপির কোনো আন্দোলন সফলতার মুখ না দেখায় তাদের এমন হুমকি খুব বেশি আমলে নিচ্ছে না কেউই। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ মাঠ পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে দলীয়প্রধানের নির্দেশে দল গোছানো শুরু করেছে। তবে আওয়ামী লীগ বিএনপির বর্তমান অবস্থাকে হালকাভাবে দেখলেও আগামী জাতীয় নির্বাচনে মোটেও হালকাভাবে দেখছে না। কারণ আগামী নির্বাচনী বৈতরণী পার করে টানা চতুর্থবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে চায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ।  

বারবার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিএনপিকে এখন চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। দলের অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অবস্থা বিচারে বলা যায়, ব্যর্থতার বেড়াজাল বিএনপিকে গ্রাস করেছে। কারণ দীর্ঘদিন থেকে হুংকার-হুমকি-ধমকি দেওয়ার পরও কোনো কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্যভাবে সফলতার মুখ দেখতে পায়নি বিএনপি। তাদের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে যেমন হতাশার সৃষ্টি করেছে, তেমনি সরকারি দলে তৈরি হয়েছে আত্মবিশ্বাসের ক্ষেত্র। অতীতের মতোই বিএনপির রাজনৈতিক পরাজয় আর ‘ব্যাকফুটে’ যাওয়ার ঘটনায় উজ্জীবিত শাসকদলের নেতাকর্মীরা।

বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণে বলা যায়, বিএনপির রাজনীতিতে কোনো অভিনবত্ব নেই। রাজপথের রাজনীতিতে আসার সাহসী উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। আন্দোলনের সাহসী ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় বারবার হোঁচট খাচ্ছে তারা। একটি চলমান আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি এবং কৌশল রাজনীতির অনেক উপাদান নির্ণয় করে থাকে। কিন্তু বিএনপি যে আন্দোলন করতে চায় তার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা ও গ্রহণযোগ্য ইস্যু না থাকায় শুরুতেই হোঁচট খায়। আন্দোলনের গতি ধরে রাখতে নেতারা অনেক উসকানিমূলক, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য-বিবৃতি দিলেও সেগুলোর প্রকৃত কোনো ফল আসেনি। শক্তিশালী কোনো ইস্যু না থাকলে আন্দোলনে জনমত গঠনের সম্ভাবনা থাকে না।

যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে গিয়ে নিজেদের অবস্থানকে মজবুত অবস্থানে নেওয়াই বিএনপির চ্যালেঞ্জ। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ব্যাপক ফল বিপর্যয় হলেও অন্তত সংসদে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ধরেই নিতে হবে ২০১৮ সালের মতো আগামী নির্বাচনেও নির্দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমনকি পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্দলীয় সরকার ফিরে আসার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। আওয়ামী লীগ সরকার কোনোভাবেই তেমন কোনো ফর্মুলায় যাবে না। অন্যদিকে কোনো সময় বিএনপি ক্ষমতায় এলেও নির্দলীয় সরকারের বিধানটি পুনর্বহাল করবে না—এটাও নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ তারা নিজেরাও এর আগে এই পদ্ধতির সমর্থনে ছিল না। বিএনপির অবস্থানও এখন তেমন নেই যে সরকারকে যেকোনো মূল্যে আন্দোলনের মুখে নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হবে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিএনপি যদি নিজেদের অবস্থানে অনড় না থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নামত, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ায় সাধারণ মানুষ নীরব দর্শকে পরিণত হয়। কারণ কার জন্য মাঠে নামবে? বিএনপি তো মাঠেই ছিল না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা প্রশ্ন দেখা দেওয়ার পর বিএনপির হিসাব অনুযায়ী জন-অসন্তোষ দেখা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা না হওয়ায় বিএনপি পিছিয়ে পড়ে তাদের কৌশলে।

বিএনপি আগামী দিনের যেকোনো আন্দোলনের চিন্তাই তাদের জন্য বুমেরাং হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের সামনে অনেক কিছুই এখন পরিষ্কার। বিএনপি অনেকটা দিশাহারা। কী করতে হবে নিজেরাই বুঝতে পারছে না। শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য ইস্যু না থাকলে যেকোনো কর্মসূচিই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। মনে রাখতে হবে, সাংগঠনিক ভিত্তি, দলীয় শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা—সব কিছুই রাজনৈতিকভাবে বিজয়ের মূল হাতিয়ার।

সরকার রাজনৈতিকভাবে চাইতেই পারে বিএনপি টেনশনে থাকুক এবং তাদের হুটহাট ভুল সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক পরাজয় ঘটুক। আর সেই চিন্তাটি আমলে নিয়েই এগোতে হবে। শুধু উত্তেজনা এবং হুটহাট সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই বিজয় আনতে পারে না।

সাধারণ মানুষের মনেও এখন একটাই প্রশ্ন, বিএনপি এখন কী করবে। তবে বিএনপিকে দুর্বল মনে করাও উচিত হবে না সরকারের। কারণ বিএনপির মাঠ পর্যায়ে কিছুটা হলেও জনপ্রিয়তা রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে ক্রমেই জনপ্রিয়তা হারালেও আবার কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতেই পারে, যাতে বিএনপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে। সরকারের ভেতরে যে টেনশন নেই তা নয়। কিছুটা টেনশন থাকাই স্বাভাবিক। কারণ যেকোনো সময়ে যৌক্তিক কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হলে বিএনপি আন্দোলনে গেলে জনগণের সফট কর্নার তৈরি হতে পারে।

তবে সব সময় সবার জন্য ভালো যায় না। আওয়ামী লীগকেও দীর্ঘদিন দুর্দিনের মধ্যে টিকে থাকতে হয়েছে। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। বিএনপির সেই পরিবেশও তৈরি হয়নি। না বললেই নয় যে বিএনপির জন্য বর্তমান সময়টা একটু খারাপ। কারণ তারা ভালো করেই জানে, কর্মসূচি দিলে সরকার সেটা বন্ধ করার জন্য উদ্যোগ নেবে। যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারই বিরোধী দলের কর্মসূচিকে ব্যর্থ করে দিতে চায়। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতেও এর ব্যতিক্রম চিন্তা করা ঠিক হবে না।

সুতরাং বাস্তবতার নিরিখে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নমনীয়তাই উত্তম। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে নিজেদের কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি না করার মাধ্যমে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের যথাযথভাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরবর্তী সময়ে যেন এমন কোনো পরিবেশ সৃষ্টি না হয়, যেখানে সাধারণ মানুষকে মৃত্যুভয়ে শঙ্কিত হতে হয়। এই মুহূর্তে বিএনপিকে আন্দোলনের কথা না ভেবে সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয় করার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করা এবং সরকারকেও সাংগঠনিক শক্তি মজবুত করার পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সচেষ্ট থাকা দরকার।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



সাতদিনের সেরা