kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

সম্প্রীতি রক্ষায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি

হায়দার মোহাম্মদ জিতু   

১৮ অক্টোবর, ২০২১ ০৪:৩৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সম্প্রীতি রক্ষায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে অর্থাৎ ২৫ মার্চের সময়ে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও আক্রোশের টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সময়কার দর্শন বিভাগের শিক্ষক নিঃসন্তান জি সি দেবের পালিত সন্তান ছিলেন একজন মুসলিম। সাম্প্রদায়িক, উগ্রবাদী পাকিস্তানিরা গণহত্যার রুটিনে জি সি দেব এবং তাঁর সন্তানের আত্মজকেও গুলি করে। এই দুই রক্তের ধারা একীভূত হওয়ার হৃদয়স্পর্শী বিবরণসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন গণহত্যা নিয়ে উপন্যাস লেখেন ঔপন্যাসিক আনোয়ার পাশা। যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রদায়িক শক্তির আঘাতে শহীদ দুই রক্তের কোনটি মুসলিম আর কোনটি হিন্দু—সেটা বোঝা যায় না। অর্থাৎ ধর্মের দোহাইয়ে বিভাজন যে শুধু জীবিতের প্রয়োজনে এবং স্বার্থবাদের খপ্পর, সেটা স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন।

অথচ তখন থেকে এখনো যদি কোনো উগ্রবাদীর রক্ত কিংবা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের প্রয়োজন পড়ে তাহলে সে কিন্তু উল্লেখ করে না কোন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর হলে সেটা চলবে না। অর্থাৎ প্রয়োজনটাই মুখ্য।

বৃহৎ অর্থে পৃথিবীর যাপন এবং আয়োজন সবটাই প্রয়োজনের ওপর। সেই ধারাবাহিকতায় এখানকার সময়ে রাজনীতির মাঠে ফিরতে কারো কারো সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং অস্থিরতার প্রয়োজন! তা ছাড়া এখানে একটা অংশ সব সময়ই ঘাপটি মেরে থাকে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা সরকারকে চাপে ফেলে বা কায়দা করে সুবিধা হাসিলের জন্য। আরো খোলাসা করে বললে, নৈরাজ্য, অস্থিরতার সময়টায়ই এখানকার কারো কারো পুঁজি বা ব্যবসা এবং বাকি বছরের খোরাক।

সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় সাধনা এবং উৎসবকে কেন্দ্র করে এমন অস্থিরতার কৌশল দেখা গেছে, যা হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। যদিও এও সত্য এটি একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা এবং ঐক্যবদ্ধ বাঙালি বোঝে বিভাজন কিংবা বিদ্বেষ নয়; বরং তাদের প্রয়োজন উন্নয়ন ও আত্মমর্যাদা, যা তারা বাঙালির শান্ত সাহস শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বগুণে অর্জন করে চলেছে।

বাঙালি সংস্কৃতি পূর্বাপরই বহুত্ববাদকে আলিঙ্গন করে। কাজেই এই সম্প্রীতিকে যারা চ্যালেঞ্জ করতে চাইছে তাদের সমূলে উৎপাটন জরুরি। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবী, মানবাধিকারকর্মীসহ সবার প্রতিশ্রুতিশীল আচরণের সুযোগ আছে। অর্থাৎ অর্থ ও ত্রাণবিষয়ক কর্মসূচির বাইরেও নিজ নিজ এলাকায় সবার শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্টার কিংবা বিজ্ঞাপনকে বন্ধ রেখে উন্নয়ন ও সম্প্রীতি যে একে অন্যের পরিপূরক তা জানান দেওয়া জরুরি।

মহানবী (সা.) তাঁর বিদায়ি হজের ভাষণে সমগ্র মুসলিম জাহানের জন্য শেষতক কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। যার মাঝে সংখ্যালঘুদের জানমাল হেফাজতের বিষয়টি যে সংখ্যাগুরুর সেটিও উল্লেখ আছে। আর তা ছাড়া প্রত্যেককে নিজেদের ধর্ম স্বাধীনভাবে চর্চার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। কাজেই বাঙালি ও মুসলমান দুই হিসেবেই সংখ্যালঘুদের হেফাজত করা এই মাটির নৈতিক দায়।

তবে এই সব উগ্রবাদী আচরণ পর্যবেক্ষণে কিছু কেস স্টাডিও আবশ্যক। কারণ এই আচরণগুলো নির্দিষ্ট কিছু সময় এবং এলাকায় ঘটে আসছে। অর্থাৎ এই উগ্রবাদী চরিত্র সমগ্র বাংলাদেশের নয়। তবে একে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহারের ভেতর দিয়ে সরল মনের মানুষদের বিদ্বেষী আচরণ করতে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করে হচ্ছে। যদিও এও সত্য, একে রুখতে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে চলেছে। যার দলিল, প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, সম্প্রীতি নষ্টকারী সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে।

এ দেশের সংস্কৃতিতে যেমন আনন্দিত হওয়ার ক্ষেত্র আছে, তেমনি উসকানি দেওয়ারও নজির ও রেওয়াজ আছে। তা ছাড়া বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টিও এখানে বহু পুরনো। সে হিসেবে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসবের নেপথ্যে যে বিএনপি-জামায়াত নেই—সেটাও বোধ করি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ সংখ্যালঘুদের ওপর তাদের নির্যাতনের ইতিহাস ও কৌশল তাই বলে। তবে একবিংশ শতকের এই সময়ে ক্ষমতা আরোহণের কৌশল হিসেবে আগের মতো এমন আচরণ না করে তাদের জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উন্নয়ন ও ম্যান্ডেট বাস্তবায়নকেন্দ্রিক জিজ্ঞাসাচর্চাই যৌক্তিক।

এ দেশ জলা-জঙ্গলার, আবেগ অনুভূতিকে আগলে সবাইকে এগিয়ে নেওয়ার। কাজেই সবাইকে তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই এসব প্রতিরোধ করতে হবে, বিদ্বেষ হটিয়ে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বাংলাদেশকে আগলে রাখতে হবে।

লেখক : প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ
[email protected]



সাতদিনের সেরা