kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ছন্দ ধরে রাখতে হবে

ইকরামউজ্জমান   

১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০৪:২২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ছন্দ ধরে রাখতে হবে

অল্প সময়ে অনেক বেশি বিনোদন আর উত্তেজনার ঢেউয়ে দোল খাওয়ার ক্রিকেট টি-টোয়েন্টি। যতক্ষণ খেলা ততক্ষণ জেগে থাকা। আনন্দ, বেদনা আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার। টি-টোয়েন্টির আকর্ষণ, রোমাঞ্চ ও মাদকতা অন্য দুটি ক্রিকেট সংস্করণ থেকে একদম আলাদা। খেলার বৈশিষ্ট্য এবং সর্বজনীন আবেদনের বদৌলতে টি-টোয়েন্টি এখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

টি-টোয়েন্টি শুধু ক্রিকেট মাঠের ছবি পাল্টে দেয়নি, রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে। অন্য দুটি সংস্করণের খেলার ক্ষেত্রে গতি বৃদ্ধি, খেলার অ্যাপ্রোচে পরিবর্তন, মান উন্নয়ন এবং খেলাকে চিত্তাকর্ষক করতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে।

এবার মধ্যপ্রাচ্যে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বর্ণাঢ্য খেলা। ২০২১ সপ্তম আসর। এটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে ভারতে। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারির জন্য অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। সেই টুর্নামেন্ট কাল ১৭ অক্টোবর নিরপেক্ষ ভেন্যু মধ্যপ্রাচ্যের ওমানে শুরু হবে। ওমান-পাপুয়া নিউগিনি এবং দ্বিতীয় ম্যাচ বাংলাদেশ-স্কটল্যান্ডের (প্রথম রাউন্ডের খেলা) মধ্য দিয়ে। আইসিসির সহযোগিতায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হবে টুর্নামেন্ট। ২০১৬ সালের মতো এবার দুই ধাপে অনুষ্ঠিত হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ১৬ দলের টুর্নামেন্টে আট দল খেলবে বাছাই পর্বে দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে। বাংলাদেশ আছে ‘বি’ গ্রুপে। কারণ হলো অতীতে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ভালো না থাকায় প্রথম আট দলে স্থান করে নিতে পারেনি, যেটা পেরেছে নবাগত আফগানিস্তান। তারা সরাসরি ‘সুপার টুয়েলভ’ খেলবে। প্রথম রাউন্ড থেকে উভয় গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ উন্নীত হবে ‘সুপার টুয়েলভে’। সেই খেলা মাঠে গড়াবে ২৩ অক্টোবর থেকে। ‘সুপার টুয়েলভ’কে বলা হয় আসল বিশ্বকাপ। জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট। বাংলাদেশ যদি বাছাই পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সুপার টুয়েলভে উঠতে পারে তাহলে খেলবে গ্রুপ ‘বি’তে ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান এবং প্রথম রাউন্ডের ‘এ’ গ্রুপের রানার্স আপের বিপক্ষে।

ক্রিকেটবিশ্ব ক্রমেই বড় হচ্ছে। বর্তমানে ১০৭টি দেশ আইসিসির মানচিত্রে অবস্থান করছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আবেদন অন্য রকম, আর তাই প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ কাল ১৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ক্রিকেট, যেটি শেষ হবে ১৪ নভেম্বর—মাসাধিককাল ধরে এটি উপভোগ করবে টিভির পর্দায়। আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মাধ্যমে আবার স্টেডিয়ামে দর্শক ফিরিয়ে আনার সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি স্টেডিয়ামে দর্শক ধারণক্ষমতার অর্ধেকের চেয়ে কিছু বেশি আসনের জন্য টিকিট নিশ্চিত করার অনুমতি দিয়েছে আইসিসি। প্রথম পর্বের খেলা হবে ওমান, আবুধাবি ও শারজায়। আর ‘সুপার টুয়েলভ’-এর খেলা হবে আবুধাবি, দুবাই ও শারজার স্টেডিয়ামে। এসব স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসা দর্শকদের মধ্যে বেশির ভাগই ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের তিন-চারটি দেশের নাগরিকরাও থাকবে। সংগতভাবে উপমহাদেশের দেশগুলো ‘হোম অ্যাডভান্টেজের’ কমবেশি সুযোগ পাবে গ্যালারি থেকে।

টি-টোয়েন্টির বড় আকর্ষণ হলো, এই ক্রিকেটে ছোট-বড় দল বলে কোনো কিছু নেই। দুই দলে মিলে ৪০ ওভারের খেলায় যে দল মাঠে নির্দিষ্ট দিনে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—এই তিন বিভাগে ‘কমপ্যাক্ট’ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করতে সক্ষম হবে, তারাই জিতবে। এই খেলায় উদ্ভাবনী, মাথা খাটানো, সাহসের সঙ্গে অঙ্ক কষে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করার কোনো বিকল্প নেই। হাতের মুঠো থেকে খেলা ফসকে বেরিয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা সব সময় চ্যালেঞ্জ। এক ওভারে, এমনকি কয়েকটি বলে খেলার রং বদলে যায়। আর তাই রীতিবদ্ধ পরিকল্পনামাফিক হিসাবি ক্রিকেট খেলতে হয়। লড়াই করতে হয় ভয়ডরহীন সিংহের মতো ইতিবাচক মানসিকতা ধরে রেখে। আরেকটি বিষয় হলো, আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি ছন্দ ও ‘মোমেন্টাম’ ধরে রাখা।

এবারের টুর্নামেন্টে আইসিসি আইন-কানুনে কিছু পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে আছে ডিআরএস (ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম)। প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ী প্রতি ইনিংসে প্রতিটি দল দুটি করে রিভিউ নিতে পারবে। এতে করে নজর এড়ানো এবং অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকে রক্ষা পাবে দল।

বিশ্বকাপে প্রাইজ মানি বেড়েছে, আর এটাই স্বাভাবিক। চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ দল পাবে যথাক্রমে ১৬ ও আট লাখ ইউএস ডলার, যা আমাদের টাকায় ১৩ কোটি ৬৮ লাখ এবং ছয় কোটি ৮৪ লাখ। এ ছাড়া সেমিফাইনালে পরাজিত, দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বাদ পড়া দল এবং প্রতি ম্যাচে জয়ী দল প্রাইজ মানি পাবে।

জিম্বাবুয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দাপটের সঙ্গে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতে বুকভরা আত্মবিশ্বাস ও সাহস নিয়ে বাংলাদেশ দল মধ্যপ্রাচ্যে গেছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মিশনে। এবারের লক্ষ্য স্পষ্ট, আর তা হলো অনেক দূরে যাওয়া। স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের সেই সামর্থ্য আছে। শুধু প্রয়োজন যথাসময়ে জ্বলে ওঠা একত্রিতভাবে। দায়িত্বশীল ক্রিকেট খেলা।

অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্কোয়াড বেশ আগেই ওমান গেছে। সেখানে তিন দিন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর ওমান ‘এ’ দলের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে। এ ধরনের ম্যাচে জয়-পরাজয় গুরুত্ব বহন না করলেও অপরিচিত কন্ডিশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং উইকেটের চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্ব বহন করে। দেশের বাইরে ঝালিয়ে নেওয়া এবং জড়তা ভঙ্গের এটি একটি সুযোগ। এরপর আবুধাবিতে গিয়ে বাংলাদেশ দল আইসিসির কর্মসূচি অনুযায়ী শ্রীলঙ্কা ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে। এতে আবুধাবির উইকেট ও কন্ডিশনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। সুযোগ হয়েছে খেলায় চিহ্নিত ভুলগুলো সংশোধনের। অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, ওমান ও আবুধাবির আবহাওয়ায় কি খুব বেশি পার্থক্য আছে? রাতের উইকেটে শিশিরের প্রভাব থাকবে। শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচগুলো থেকে বাংলাদেশ দল প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হয়েছে।

বাংলাদেশ স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে অভিজ্ঞ এবং তারুণ্যের সংমিশ্রণে। স্কোয়াড গঠনের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্কোয়াডে আছেন সাকিব আল হাসানসহ সাত-আটজন অলরাউন্ডার। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অলরাউন্ডারদের গুরুত্ব বেশি। বলা হয়, অলরাউন্ডাররা মূল শক্তি। তবে মনে রাখতে হবে, মাঠের খেলাই আসল—সেখানে কতটুকু অবদান রাখা সম্ভব হবে, এর ওপর নির্ভর করবে ম্যাচের ফলাফল। বাংলাদেশ স্কোয়াড ভারসাম্যপূর্ণ। এখানে যেটিকে গুরুত্ব দিতে চাচ্ছি, সেটি হলো আত্মবিশ্বাস এবং নিজের ওপর আস্থা। বুকে বিশ্বাস পোষণ—ভালো খেলতে পারলে অসাধ্য সাধন সম্ভব। টুর্নামেন্ট যেহেতু লম্বা সময় ধরে চলবে, সব দলকেই এ ক্ষেত্রে মাঠে ছন্দ ও মনঃসংযোগ ধরে রাখতে হবে। এটি এই ধরনের টুর্নামেন্টে সব সময় চ্যালেঞ্জ। এবার চ্যালেঞ্জ আবার একটু অন্য রকম—কভিড-১৯-এর বিধি-নিষেধ তো এখনো মেনে চলতে হচ্ছে!

এবারের বাংলাদেশ স্কোয়াড একটু ভিন্নধর্মী। অভিজ্ঞতা, ফর্ম ও সম্ভাবনা নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হয়েছে। কারণ হলো, বিশ্বকাপে ভালো করার ক্ষুধা। ১৭ অক্টোবর রাতে ওমানে বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে খেলতে নামবে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। আশা করি, দেখব বাংলাদেশ দলে ৯ জন ব্যাটসম্যান। এ ধরনের সুস্থ অবস্থা আগে কখনো কি লক্ষণীয় হয়েছে? পেস ও স্পিন বোলিংয়ে নেতৃত্ব দেবেন যথাক্রমে মুস্তাফিজুর রহমান ও সাকিব আল হাসান। যাঁরা শুধু ভালো পারফরমারই নন, এই দুজনের আছে সদ্যঃসমাপ্ত আইপিএলে খেলার অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশ দল ‘বি’ গ্রুপ থেকে (প্রথম রাউন্ডে) চ্যাম্পিয়ন হয়ে ‘সুপার টুয়েলভে’ প্রত্যাশা অনুযায়ী ম্যাচ বাই ম্যাচ ভালো খেলে দূরে পৌঁছানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করবে—এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



সাতদিনের সেরা