kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর খাবার পায় না ৪৩% মানুষ

তৌফিক মারুফ   

১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০৪:০৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর খাবার পায় না ৪৩% মানুষ

পরিমাণ ও পুষ্টিগুণ বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত ‘স্বাস্থ্যকর’ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে পায় না দেশের ৪৩ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ শক্তিবর্ধক, পুষ্টিকর ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে পারছে না তারা। অঞ্চল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি খুলনা বিভাগে, আর কম চট্টগ্রামে। শহরের তুলনায় গ্রামে ঘাটতি বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।

গবেষণা বলছে, পুষ্টিকর ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার তুলনামূলক কম খাচ্ছে গড়ে সব বয়সের মানুষ মিলে ৪০-৫০ শতাংশ। অর্থাৎ তারা শক্তিবর্ধক ভাত, চিনি ও চর্বিজাতীয় খাবার পর্যাপ্ত খাচ্ছে। সেদিক থেকে ভাত ও চর্বিজাতীয় খাবার গ্রহণের হার কমেনি। অবশ্য খাদ্যে বৈচিত্র্য বেড়েছে।

এ অবস্থায় বর্তমানে করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে ‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ—ভালো উৎপাদনে ভালো পুষ্টি, আর ভালো পরিবেশেই উন্নত জীবন’—এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ শনিবার বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর এই গবেষণার প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও), ইউরোপীয় কমিশন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) ও বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় এই গবেষণায় সহায়তা করে।

কালের কণ্ঠের হাতে আসা গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বাজারে থাকা পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাদ্যগুলো দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালে নেই। সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার। আবার কম খরচে কিভাবে দরিদ্র মানুষ খাবার পেতে পারে সেটাও দেখতে হবে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, খাদ্যে বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য গ্রহণের হার বেড়েছে। শস্য হিসেবে ভাত এখনো সব কিছুর ওপরে আধিপত্য বজায় রেখেছে। সেই তুলনায় ডাল, বাদামসহ বীজজাতীয় খাদ্য এবং ফল গ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ চাল, ডাল, গমসহ শস্যজাতীয় এবং ডিম, মাংস, দুধের মতো খাদ্যের ঘাটতি কমেছে। কিন্তু অনুপুষ্টি বা ভিটামিনজাতীয় খাদ্যের ঘাটতি বেশিই রয়ে গেছে। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, রিবোফ্লাভিন, ভিটামিন-বি১২ ও ভিটামিন-এ-এর ঘাটতি বয়স ও লিঙ্গভেদে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।

গবেষণায় দেখা গেছে, এক টাকা খরচে ফল, শাকসবজি, দুধ ও ডিম থেকে যে পরিমাণ পুষ্টিগুণ পাওয়া যায়, সেই তুলনায় চিনি, চর্বি, তেল, মাংস, হাঁস-মুরগি ও মাছ থেকে অনেক কম পুষ্টিগুণ মেলে। কলমিশাক, পুঁইশাক, লালশাক, পাটের পাতা, করল্লা পাতা, পালংশাকসহ সবুজ শাক এবং নানা ধরনের মৌসুমি ফলে পুষ্টিগুণ অনেক বেশি।

গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন কালের কণ্ঠকে বলেন, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে বাংলাদেশ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে এর উল্টোপিঠে অপুষ্টির প্রসার, অনুপুষ্টির ঘাটতি এখনো আছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অপুষ্টি দূর এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন করা জরুরি। এর জন্য স্থিতিস্থাপক খাদ্যব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। তিনি বলেন, “২০১৭-১৮ সালের ‘নিউট্রিশন সার্ভে অব বাংলাদেশ’ এবং ২০১৫ সালের ‘বাংলাদেশ ইন্টিগ্রেটেড হাউসহোল্ড সার্ভ’-এর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছি। সেটার সঙ্গে মিলিয়ে আমরা চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে বাজারমূল্য সংগ্রহ করে এই গবেষণা করেছি।’

ড. নাজমা শাহীন বলেন, ‘সরকারের উচিত খাদ্যের পুষ্টির ঘনত্ব বিবেচনা করা এবং খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য নীতি ধরে কাজ করা।’ তিনি বলেন, শুধু পুষ্টিকর খাদ্যের সহজলভ্যতাই নয়, সহজলভ্য শাকসবজি ও দেশীয় মৌসুমি ফল খাওয়ার ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করতে হবে। যেমন—একজন মানুষের দৈনিক শাকসবজি খাওয়ার প্রয়োজন ৪০০ গ্রাম। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই খাচ্ছে ২০০ গ্রাম।  

গবেষণায় পাওয়া চিত্র বলছে, স্বাস্থ্যকর খাবার পরিমাণ মতো খেতে পায় না সবচেয়ে বেশি খুলনা বিভাগের মানুষ। এই হার ৬৫ শতাংশ। সবচেয়ে কম ঘাটতি চট্টগ্রামে ২৫.৫ শতাংশ। এ ছাড়া ঢাকায় ঘাটতি ৩০.৪ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৪৭.৩ শতাংশ, সিলেটে ৪১.২  শতাংশ, রংপুরে ৪৭.৫ শতাংশ, রাজশাহীতে ৪৫.৬ শতাংশ এবং বরিশালে ৩৫.৬ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে ঘাটতি ৪২.৫ শতাংশ এবং শহরে ঘাটতি ৩৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পুষ্টিসেবা কার্যক্রমের পরিচালক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, যেকোনো সংক্রমণ প্রতিরোধে পুষ্টিকর খাবার সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রয়োজনীয় মাত্রায় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করলে একদিকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, অন্যদিকে শারীরিক সক্ষমতাও বাড়ে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে একজন মানুষের দৈনিক প্রয়োজন ২১০০ ক্যালরি। এর ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ হচ্ছে। এ বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে সরকার করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় পুষ্টি ব্যবস্থাপনার আলাদা নিদের্শিকা তৈরি করেছে।



সাতদিনের সেরা