kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বিদেশে বিএসইসির রোড শো এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুবিধা

নিরঞ্জন রায়   

১২ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:২৫ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বিদেশে বিএসইসির রোড শো এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুবিধা

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে রোড শো পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রথমে আমেরিকায় এবং পরে ইউরোপের সুইডেনে এ রকম রোড শো অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং খুব সহসাই লন্ডনেও এ ধরনের একটি রোড শো অনুষ্ঠিত হবে বলে জেনেছি। নিঃসন্দেহে বিএসইসির এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে এসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য বিদেশের যেখানেই যান সেখানেই তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বিএসইসির বিদেশের মাটিতে রোড শো আয়োজন প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের সঙ্গে মিলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহ ও আশার সঞ্চার করেছে। সেসব রোড শোতে বিএসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রবাসীদের জন্য দেশের বিনিয়োগ সুবিধা এবং বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়ার ব্যাপারে অনেক আশার কথাও শুনিয়েছেন। একজন প্রবাসী বিনিয়োগকারী আমাকে জানিয়েছেন যে বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান শিবলি রুবাইয়াত স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন যে প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগের সমুদয় অর্থ লাভসহ বিদেশে নিরাপদে এবং বৈধভাবে ফিরিয়ে আনতে পারবেন। 

দীর্ঘদিন ধরেই অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। এর অনেক কারণের মধ্যে একটি অন্যতম কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারাবাহিক দৃশ্যমান উন্নতি। তা ছাড়া উন্নত বিশ্বে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে। সত্যি বলতে কী, এখানে প্রকৃত সুদের হার ঋণাত্মক হয়ে আছে। কেননা ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে যে যৎসামান্য বৃদ্ধি পায় তার চেয়ে অনেক বেশি বিবিধ ফি বাবদ ব্যাংক কেটে নেয়। ফলে ব্যাংকে যে পরিমাণ টাকা জমা রাখা হয় দিন শেষে উত্তোলন করতে গেলে পাওয়া যায় তার থেকে কম। পক্ষান্তরে দেশে এখনো ব্যাংকে বা অন্যান্য ঝুঁকিমুক্ত খাতে বিনিয়োগ করে যথেষ্টই আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই বিনিয়োগ সুবিধা গ্রহণের জন্য অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি সব সময়ই দেশে বিনিয়োগ করতে চান। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বান এবং সেই সঙ্গে বিএসইসির রোড শোতে সুস্পষ্ট বিনিয়োগ সুবিধার ঘোষণা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নতুন করে দেশে বিনিয়োগের আশার সঞ্চার করেছে। আমি যেহেতু পেশায় ব্যাংকার এবং এসব বিষয়ে লেখালেখি করে থাকি, তাই আমেরিকা ও কানাডা থেকে অনেকেই আমার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছেন যে দেশে কোথায় কিভাবে তাঁরা বিনিয়োগ করবেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে আগ্রহী প্রবাসী বিনিয়োগকারীর এমন প্রশ্নের সদুত্তর আমার জানা নেই এবং আমার বিশ্বাস দেশের মুদ্রা ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। আর এখানেই নিহিত আছে দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাপক হারে বিনিয়োগ করতে না পারার কারণ।

দেশে কোথায় এবং কিভাবে প্রবাসী বাংলাদেশিরা খুব সহজে বিনিয়োগ করতে পারবেন তা যদি সুস্পষ্ট না করা যায় এবং সেই সঙ্গে বিনিয়োগের অর্থ লাভসহ নির্বিঘ্নে ফিরিয়ে আনার নিশ্চয়তা যদি না দেওয়া যায়, তাহলে কোনো প্রবাসী দেশে বিনিয়োগ করবেন না। এ কথা সত্য যে প্রবাসীদের কিছু সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ সুবিধা আছে, যেমন-ওয়েজ আর্নারস ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার বন্ড, দেশের আইপিও শেয়ারের প্রবাসী কোটায় আবেদন করে শেয়ার সংগ্রহ এবং ব্যাংকের এফডিআর ক্রয়। কিন্তু চাইলেই খুব সহজে এসব খাতে বিনিয়োগ করা যায় না। তা ছাড়া এগুলো সীমিত আকারে কিছু ফিক্সড ইনকাম স্কিমে অর্থ রাখার সুযোগ মাত্র। প্রকৃত বিনিয়োগ বলতে যা বুঝায় এগুলো মোটেই তা নয় এবং এ ধরনের বিনিয়োগের জন্য বিএসইসি নিশ্চয়ই বিদেশে রোড শোর আয়োজন করেনি। সত্যিকার বিনিয়োগ হয় দুভাবে। একটি সরাসরি বিনিয়োগ অর্থাৎ ব্যবসা শুরু করা এবং দ্বিতীয়টি পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট, অর্থাৎ দেশের পুঁজিবাজারে শেয়ার বা ডিবেঞ্চার ক্রয় করে বিনিয়োগ করা। সরাসরি বিনিয়োগ অত সহজ নয় এবং এটি একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট। এই বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন ছাড়াও আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত, যা এখানে আলোচনার সুযোগ নেই।

পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সুবিধাই সবচেয়ে সহজ এবং বেশ জনপ্রিয় প্রবাসীদের মধ্যে। কিন্তু প্রবাসীদের জন্য সেভাবে পোর্টফোলিও গঠন করে বিনিয়োগের আহ্বান জানাতে পারলে তা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। আমাদের দেশের শেয়ার মার্কেট যে অবস্থানে আছে সেখানে প্রবাসীরা বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন না এবং তাঁদের বিনিয়োগ নিরাপদও করতে পারবেন না। আমাদের শেয়ার মার্কেটে এখনো ডে-ট্রেডারদের দাপটই বেশি। প্রবাস থেকে এই ডে-ট্রেডারদের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন কাজ এবং এতে বিনিয়োগে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন।  প্রবাসীদের জন্য বিশেষ পোর্টফোলিও গঠন করে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সেই পোর্টফোলিও ম্যানেজ করা এবং প্রবাসীদের সেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগ করার জন্য নির্দিষ্ট করে দিতে পারলে প্রবাসীরা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে কোথায়, কিভাবে বিনিয়োগ করবেন। প্রবাসীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হলে এই মর্মে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে বিনিয়োগকারী চাইলে তাঁর বিনিয়োগের সমুদয় অর্থ লাভসহ খুব সহজে এবং বিনা বাক্যে প্রবাসে ফিরিয়ে নিতে পারবেন। যদিও বিএসইসির চেয়ারম্যান এমন নিশ্চয়তার ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর আশ্বাসে আস্থা রাখা কষ্টকর, কারণ প্রবাসে অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি তাঁর এখতিয়ার নয়। এ বিষয়টি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতায়। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক ভালো কাজের নজির যেমন আছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কম নেই।

নিকট অতীতে প্রবাসীদের জন্য খুবই সম্ভাবনাময় একটি বিনিয়োগ সুবিধা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা টিমের এক কলমের খোঁচায় বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে আমার কর্মরত ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর সহযোগিতা নিয়ে প্রবাসীদের জন্য দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের একটি বিশেষ প্রডাক্ট তৈরি করেছিলাম। প্রডাক্টটির ধরন এমন ছিল যে আগ্রহী প্রবাসী বিনিয়োগকারী ব্যাংকে একটি এফসি (ফরেন কারেন্সি) হিসাব খুলে ব্যাংকের সঙ্গে একটি অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করবেন। সেই অ্যাগ্রিমেন্টবলে ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিনিয়োগকারীর এফসি হিসাব ডেবিট করে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করবেন। সেই বিনিয়োগ লাভসহ ডলারে কনভার্ট করে পুনরায় সেই বিনিয়োগকারীর এফসি হিসাবে জমা করা হবে। এভাবে ক্রমাগত বিনিয়োগ চলতে থাকবে। প্রবাসী বিনিয়োগকারী নিয়মিত তাঁর হিসাবের স্টেটমেন্ট দেখে বিনিয়োগের অবস্থা জানতে পারবেন। যেহেতু দেশে শেয়ার বিক্রির অর্থ টাকায় পরিশোধ করা হয়, তাই এই লেনদেনটি সম্পন্ন করার সুবিধার্থে দেশের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অনুযায়ী নিটা (নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টমেন্ট টাকা অ্যাকাউন্ট) ব্যবহার করতে হয়েছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত জিএমের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিশেষ প্রডাক্টের অনুমোদন নিয়েই এটি চালু করেছিলাম। শুরু করার অল্প দিনের মধ্যেই এই প্রডাক্ট প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল এবং মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শতাধিক এফসি হিসাব খুলে কয়েক লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার জন্য। আমি কানাডা চলে আসার পর একদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নিরীক্ষা দল অডিট আপত্তি দিয়ে প্রডাক্টটি বন্ধ করে দেয়। ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের দারুণভাবে হতাশ করে। এই যেখানে অবস্থা সেখানে প্রবাসীরা আস্থার সঙ্গে কিভাবে দেশে বিনিয়োগ করবেন।

আরো একটি বিষয় এখানে প্রণিধানযোগ্য। উন্নত বিশ্বে যাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস করেন তাঁদের বেশির ভাগের হাতেই সেভাবে সঞ্চয় থাকে না বিনিয়োগ করার জন্য। কিছু সৌভাগ্যবান ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবাই এক ধরনের ঋণের মধ্যেই থাকেন। এর কারণ অনেক। এসব উন্নত দেশের অর্থনীতির কাঠামোই এভাবে তৈরি। আর এ কারণে উন্নত দেশের মাথাপিছু হাউসহোল্ড ঋণ (মর্টগেজ লোন ব্যতীত সব ঋণ) শতকরা দেড় শ ভাগ। অর্থাৎ কারো বার্ষিক উপার্জন যদি হয় পঞ্চাশ হাজার ডলার, তাঁর বার্ষিক হাউসহোল্ড ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে পঁচাত্তর হাজার ডলার। এই অবস্থায় বেশির ভাগ প্রবাসীর হাতে বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত সঞ্চয় থাকে না। মুদ্রার অন্য পিঠও আছে। প্রবাসীরা একটু সচেতন এবং কৌশলী হলে খুব সহজেই ও অতি সাশ্রয়ে পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু এই পরামর্শ এবং কর্মপন্থা তাঁদের সুন্দরভাবে এবং পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বাতলে দিতে হবে। এটা করতে পারলেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে বিনিয়োগ করে একদিকে নিজেরা যেমন লাভবান হতে পারবেন, অন্যদিকে তেমনি দেশের বিনিয়োগ খাতও যথেষ্ট সমৃদ্ধ হবে। এ কারণেই প্রবাস এবং দেশের আর্থিক খাত সম্পর্কে সমান দক্ষতা ও পারদর্শিতা আছে এমন প্রতিষ্ঠান ও পেশাদারদের প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের কাজে নিয়োজিত করতে পারলেই ভালো সুফল পাওয়া যাবে। তা না হলে শুধু রোড শো বা মৌখিক আহ্বান প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারলেও কার্যকর বিনিয়োগ করাতে সফল হবে না।

লেখক : ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
[email protected]



সাতদিনের সেরা