kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

নতুন ছন্দে ফিরুক ক্যাম্পাস

এ কে এম শাহনাওয়াজ   

১০ অক্টোবর, ২০২১ ০৪:০৯ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নতুন ছন্দে ফিরুক ক্যাম্পাস

দম বন্ধ করা এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রায় পৌনে দুই বছর কেটে গেল। বৈশ্বিক মহামারি কভিডের রক্তচক্ষু থমকে দিয়েছিল আমাদের জীবন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা অঞ্চল। ইতিহাসে এই প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিনের জন্য টানা বন্ধ হয়ে যায়। ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করায় তবু অনলাইন ব্যবস্থাপনায় কিছুটা ক্লাস পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু অনলাইন ভার্সন সরাসরি ক্লাসের বিকল্প হতে পারে না। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দুর্যোগটা একটু ভিন্ন। বিজ্ঞানশিক্ষা ভার্চুয়াল মাধ্যমে কতটুকুই বা সামাল দেওয়া যায়! ল্যাবনির্ভর জ্ঞানচর্চার বিকল্প তো আর ভার্চুয়াল মাধ্যম হতে পারেনি। সুতরাং ভীষণ একটি অস্বস্তি আর অশান্তি নিয়ে চলতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এ অঞ্চলে সংকট আরো আছে। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-ছাত্রীরা দেশের নানা অঞ্চল থেকে আসেন। তাঁদের অনেকের পরিবার তেমন সচ্ছল নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে খরচ চালানোর জন্য টিউশনি করতে হয়। এমন কেউ কেউ থাকেন যাঁরা পড়ার খরচ চালিয়েও চেষ্টা করেন বাড়িতে কিছু অর্থ পাঠাতে। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ও হল খালি করে দেওয়ার কারণে লেখাপড়ার সংকটের পাশাপাশি টিউশনিও হারাতে হয়। শহরে কোথাও মেস করে থেকে সংকট মোকাবেলা করার চেষ্টা করেছেন কেউ কেউ। অনেকে তা-ও পারেননি। গ্রামে ফিরে পারিবারিক সংকট বাড়িয়েছেন। শেষ পর্বের শিক্ষার্থীদের সংকট আরো বেশি। তাঁরা হলে থেকে পাশাপাশি চাকরির বাজারে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নেন। সেখানেও দারুণ ছন্দঃপতন ঘটিয়েছে কভিড। এসব নানা কারণে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার দাবিতে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছিলেন শিক্ষার্থীরা।

কিন্তু কভিড সংকট তো মনুষ্যসৃষ্ট নয়। সরকার ও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ হল ও বিশ্ববিদ্যালয় খোলার মতো ঝুঁকি নিতে পারেনি। তবে নানা মহলে এই প্রশ্নটি ছিল যে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা সব কিছু খুলে দেওয়া হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আটকে গেল কেন? সরকারপক্ষ থেকে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে হলে কভিড সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে ভ্যাকসিন চলে আসে দেশে। টিকাগ্রহীতাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। কমতে থাকে মৃত্যু ও সংক্রমণ দুটিই। চারদিক থেকে চাপ বাড়তে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার। এসব বাস্তবতা সামনে রেখে প্রথম স্কুল-কলেজ পরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একে একে খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শুধু বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হল না থাকলেও এখনো অনলাইনে রয়ে গেছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। ছাত্র-ছাত্রীদের পদচারণে মুখরিত হচ্ছে। হলের ঘরগুলোতে আবার বাতি জ্বলছে। কমনরুমে ছাত্র-ছাত্রীদের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। লাইব্রেরির তালা খুলছে। আবার জীবন্ত হবে ক্লাসরুম। আবার সম্মিলন ঘটবে ছাত্র-শিক্ষকের। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সরব হবে। খেলার মাঠে বল গড়াবে। পৌনে দুই বছর পর নিজ রূপ ফিরে পাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়।

তাই বলে ভাবলে হবে না যে করোনাভাইরাস পুরোপুরি বিদায় নিয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীসহ ক্যাম্পাসবাসী সবার স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে শৈথিল্য দেখানো চলবে না। আমরা কেউ চাইব না আবার দুঃসহ অবস্থা ফিরে আসুক। আবার বন্ধ হয়ে যাক ক্যাম্পাস। কভিডকে কিছুটা সমীহ করতেই হবে। তাই আগের মতো ক্যাম্পাসে স্বাস্থ্যবিধি না মানার মতো উচ্ছলতায় গা ভাসালে চলবে না।

হলে হল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক এবং বিভাগের শিক্ষক সবারই অতিরিক্ত দায়িত্ব রয়েছে এবার। বুঝতে হবে দীর্ঘদিনের প্রায় বন্দিত্ব জীবনে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই মনস্তাত্ত্বিক সংকট দেখা দিতে পারে। এ কারণে বন্ধুর মতো তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজনে কোর্স কারিকুলামকে যতটা পারা যায় নির্ভার করতে হবে। কোনো দুর্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় অনাকাঙ্ক্ষিত বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষকরা অতিরিক্ত ক্লাস করে ক্ষতি পুষিয়ে নেন। সে দায়িত্ব এবারও নিশ্চয় তাঁরা পালন করবেন। তবে ঘুরে দাঁড়াতে হবে অল্পসংখ্যক সেই শিক্ষকদের, যাঁরা নিজেদের নানা ‘ব্যস্ততায়’ ঠিকমতো ক্লাস নিতে পারেন না। তাঁদের ওপর অর্পিত ক্লাসগুলোর বেশির ভাগ বাকি থাকতেই পরীক্ষা এসে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত স্বায়ত্তশাসনের অপপ্রয়োগ ও নষ্ট রাজনীতির কারণে এ ধারার শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায় না। আমরা আশা করব কভিডের এই ঝাঁকুনির পর তাঁদের বিবেক জাগ্রত হবে। ক্লাসের পূর্ণ গতি পাবে। শিক্ষার্থীদের হতাশাও কিছু কমবে।

সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে। দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সরব হতে হবে মঞ্চ। অন্যদিকে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ও তথাকথিত প্রগতিবাদী রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের অযৌক্তিক ও ইস্যুহীন নষ্ট রাজনীতির ক্ষতিকর তৎপরতায় রাশ টানতে হবে। ক্যাম্পাস অশান্ত হওয়ার পেছনে এ ধারার রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভূমিকা কম থাকে না। এটিও ঠিক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষক রাজনীতির অসাধু ইন্ধনও থাকে রাজনীতির ব্যানারে থাকা এসব ছাত্র-নেতাকর্মীকে ভুল পথে পরিচালিত করতে। মানতে হবে, কভিড আমাদের শিক্ষা দিয়েছে নিয়ন্ত্রিত পথে নিজেদের পরিচালিত করতে। সুন্দর ও সুস্থতার পথে চলার জন্য আমরা সব পক্ষই ঘুরে দাঁড়াব বলে আশা করি।

এই দুঃসময়ে কভিড স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্র-শিক্ষকদের ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের দীক্ষা দিয়েছে। এটিকে আমি কভিড ঝড়ের প্রতিক্রিয়ায় একটি বড় প্রাপ্তি বলে মনে করি। এখন আমরা সহজেই ডিজিটাল পদ্ধতি প্রয়োগ করে বৈশ্বিক জ্ঞানের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারব। এখন গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আয়োজনের জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুদান বা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ও দান-ধ্যানের আশায় বসে থাকতে হবে না। জ্ঞানের পারস্পরিক আদান-প্রদান করা সম্ভব হবে। ক্লাস বা ক্যাম্পাসের বাইরেও শিক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অথবা আনুষঙ্গিক সমস্যা নিয়ে সহজেই শিক্ষক যেকোনো সময় জুম মিটিং করতে পারবেন। এতে একদিকে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের যেমন উন্নতি হবে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাম্য জ্ঞানচর্চার পথও সম্প্রসারিত হবে।

নতুনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে, ক্যাম্পাসকে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে সরকারেরও সুদৃষ্টি প্রয়োজন। আমাদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক সরকার স্বাধীনতা-উত্তরকালে, বিশেষ করে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের দাবার ঘুঁটি বানানোর চেষ্টা করেছে। উদ্দেশ্য পূরণের জন্য মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছে নষ্ট রাজনীতির ভাইরাস। যখন থেকে পাণ্ডিত্যের ও যোগ্যতার বিচারের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের বিচারে উপাচার্য নিয়োগ শুরু হয়েছে, তখন থেকেই পচনের যাত্রা শুরু। এভাবেই শিক্ষক রাজনীতির ভেতর শুরু হয় ক্ষমতাচর্চা। বলয় নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি শুরু হয়। বড় করে দুটি বিভক্তি দেখা যায়। একটি উপাচার্যপক্ষীয় দল আরেকটি উপাচার্যবিরোধী বলয়। এদের মধ্যে আবার অনেক উপদলও জন্ম নিতে থাকে। দলীয় সরকারগুলো চায় উপাচার্য নিয়ন্ত্রিত দল শক্তিশালী থাকুক। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। সম্ভবত এ ধারার উগ্র প্রয়োগ বাংলাদেশেই বেশি। উপাচার্য ও তাঁর দল বিরোধীপক্ষের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে যোগ্যতা ও মেধা বিচারের বদলে দলীয় আনুগত্যের বিচারে শিক্ষক নিয়োগে বেশি মনোযোগী হয়। এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ে শিক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে রাজনৈতিক বিচারে নিয়োগকৃত শিক্ষকরা পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছেন না শিক্ষা গবেষণায়। এর পেছনে কখনো কখনো মেধা ঘাটতি, আবার কখনো দলীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষকের দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে যায়।

কভিড-উত্তর এই শিক্ষা যাত্রায় আমরা পেছনের সব জরা থেকে মুক্তি পেতে চাই। কিন্তু এই মুক্তির জন্য সমর্থন ও সহযোগিতা লাগবে সব পক্ষের। এ ক্ষেত্রে প্রধান সহযোগিতাটি আসবে সরকারের কাছ থেকে। কোনো দলীয় সরকার যদি নিজেদের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বাবলম্বী মনে করে, জনগণের শক্তিকে শ্রদ্ধা করে এবং মনে-প্রাণে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তেমন সরকার ও সরকারি দল প্রথম দায়িত্ব পালন করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির তপোবন বানাতে। নিশ্চিত করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচ্চতম স্থান থেকে শিক্ষক নিয়োগ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের বদলে মেধার পরিচয়ই প্রাধান্য পাবে। শুধু সরকার কেন, বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলগুলোকেও অভিন্ন চেতনায় ফিরতে হবে। তাদের দলীয় আদর্শে পরিচালিত ছাত্রদেরও জ্ঞানচর্চার পক্ষে যুক্ত থাকার নির্দেশনা দিতে হবে। এমন পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারলে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক দিকগুলো ধীরে ধীরে অপসৃত হতে থাকবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আমরা চাইব বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে জ্ঞানচর্চা সবচেয়ে বেশি মূল্য পাক।

সবাই মানি, কভিড আমাদের যতটা পিছিয়ে দিয়েছে সুস্থ চিন্তায় ও সুস্থ ধারায় নতুন ছন্দে পথ চলতে পারলে আমরা ততটাই এগিয়ে যাব। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে এই ছান্দসিক পথচলায় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবারই কাম্য সহযোগিতা থাকবে।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



সাতদিনের সেরা