kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৯ ডিসেম্বর ২০২১। ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

মজুরি নিয়ে উদ্বিগ্ন পোশাক শ্রমিকরা

তামজিদ হাসান তুরাগ   

৯ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:৩৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মজুরি নিয়ে উদ্বিগ্ন পোশাক শ্রমিকরা

করোনার ধাক্কা ধীরে ধীরে সামলে উঠছে দেশের পোশাক শিল্প খাত। আগের তুলনায় ক্রয়াদেশ বেড়েছে। তাই শ্রমিকদের কাজের চাপও বেশি। অতিরিক্ত সময় কাজ করালেও ঠিকমতো টাকা না পাওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ছুটিছাটাও বন্ধ। করোনায় ক্ষতির অজুহাত দিয়ে এরই মধ্যে কোনো কোনো কারখানা কর্তৃপক্ষ বছর শেষে ইনক্রিমেন্ট না দেওয়ার মৌখিক ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় শ্রমিকরা হতাশ।

সাম্প্রতিক সময়ে পোশাক শ্রমিকদের হতাশা ও দুর্দশার কিছু চিত্র সাউথ এশিয়ান ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও মাইক্রো ফাইন্যান্স অপরচুনিটিজের (এমএফও) এক জরিপেও উঠে এসেছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই জপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকরা বেতন-ভাতা না বাড়ার বিষয়ে শঙ্কিত। অনেকের দিন কাটছে বেতন কমার শঙ্কায়। ১৮ শতাংশ শ্রমিক বলেছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁরা খাবারের খরচ কমাবেন।

এই জরিপ প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সম্প্রতি আশুলিয়ার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।

একটি কারখানায় একজন নারী শ্রমিক বলছিলেন, প্রতিবছর জানুয়ারিতে তাঁদের ইনক্রিমেন্ট হয়। আসছে জানুয়ারিতে সেটা হবে না বলেই তাঁর ধারণা। কারণ কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে বলে দিয়েছে যে নতুন বছরে কোনো ইনক্রিমেন্ট হবে না। কাজ বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের ছুটিও দেওয়া হবে না।

আরেক নারী শ্রমিক বলছিলেন, করোনার কারণে দীর্ঘদিন পর বন্ধ থাকার পর আগস্ট মাসে কাজে যোগ দিয়েছেন তিনি। সামনের বছর ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে—কারখানা কর্তৃপক্ষের এমন মৌখিক ঘোষণায় তিনি হতাশ। দিন দিন যে খরচ বাড়ছে, সেটা সামাল দিতে খাবার খরচ কমাবেন বলে তিনি জানান। কারণ ঘরভাড়া তো আর কমবে না।

গত বছরের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর এপ্রিল থেকে চট্টগ্রাম, ঢাকা শহর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারে কর্মরত পোশাক শ্রমিকদের সম্পর্কে প্রতি মাসে তথ্য সংগ্রহ করছে সানেম ও এমএফও। গত ৬ আগস্ট এক হাজার ২৭৮ জন শ্রমিকের একটি নির্বাচিত পুলের মধ্যে ফোনে জরিপ চালানো হয়। জরিপে অংশ নেওয়া তিন-চতুর্থাংশের বেশি নারী শ্রমিক।

‘গার্মেন্ট ওয়ার্কার ডায়েরিজ’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া এক হাজার ২৭৮ জন শ্রমিকের মধ্যে ৬৩ শতাংশ মনে করেন, সামনের বছর তাঁরা প্রায় একই ধরনের মজুরি পাবেন। ৭৫ শতাংশ শ্রমিক ধারণা করছেন, এখন যা পান তার চেয়ে কম পাবেন। ৭৫ শতাংশ মনে করেন, লকডাউনসংক্রান্ত কারণে মজুরি কমবে। কম মজুরি দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকুলান প্রশ্নে ১৮ শতাংশ অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করার কথাও বলেছেন। ১৬ শতাংশ শ্রমিক জানান, তাঁরা অন্যান্য ব্যয় কমাবেন। ১৩ শতাংশ নিজের ঘরের বাইরের পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর নির্ভর করবেন। ৯ শতাংশ তাঁদের সঞ্চয় থেকে ব্যয় করবেন। ৪ শতাংশ নিজ ঘরের অন্য সদস্যের ওপর নির্ভর করবেন। ১ শতাংশ জানান যে তাঁরা বাড়িভাড়া দেরিতে দেবেন।

আশুলিয়ার ১৫ জন পোশাক শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের কাজের চাপ আগের চেয়ে বেড়েছে। একজন জানান, এখন তাঁদের সকাল ৮টায় কারখানায় ঢুকতে হয়। কাজ শেষ করে বের হতে হতে রাত ১১টা বা ১২টা বেজে যায়। উদাহরণ দিয়ে আরেক শ্রমিক বলেন, আগে যেখানে ১০০ পিস কাজের টার্গেট ছিল, এখন সেটা হয়েছে ১৪০ পিস। অতিরিক্ত সময় কাজ করালেও তার টাকা দিতে চায় না কারখানা কর্তৃপক্ষ।

বাধ্যতামূলকভাবে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে জানিয়ে নাম না প্রকাশ করে এক শ্রমিক কালের কণ্ঠকে বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ বলেছে এখন কোনো ছুটি দেওয়া হবে না। ছুটি চাইলে চাকরি থেকে বাদ দেবে, এমন কথাও বলেছে।

সানেম বলেছে, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, শ্রমিকদের উদ্বেগ নিরসনে ও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয়  কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে অভিযোগ করছেন। আমরা চাই, এই বিশেষ সময়ে তাঁদের বিশেষ ভাতা দেওয়া হোক।’



সাতদিনের সেরা