kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

অনলাইন ডেস্ক   

৮ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:১২ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তাই সময়ের কাজ সময়মতো না করলে তার খেসারত দিতে হয়। কথাটি ব্যক্তিজীবনে যেমন সত্য, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এই সত্যের পরিধি ও পরিণতি হয় অনেক বড় ও বিস্তৃত। কোনো কিছুই হঠাৎ করে ঘটে না। একটা দীর্ঘ বা নাতিদীর্ঘ সময় নিয়ে প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে থাকে। কেউ সেটা টের পায়, আবার কেউ পায় না। আবার এক শ্রেণির মানুষ আছে, তারা দেখেশুনে অনেক কিছু উপেক্ষা করে। তাতে বিপদ যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন তার প্রতিকারের পথ পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণের জায়গা থেকে আমার কাছে মনে হয়, বিগত সময়ে ঘটে যাওয়া অনেক কিছুকে উপেক্ষা করার কারণেই আমরা আজ রোহিঙ্গা সমস্যার প্রতিকারের পথ খুঁজে পাচ্ছি না। দিন দিন সব কিছু কঠিন ও জটিল হয়ে যাচ্ছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে কক্সবাজার ক্যাম্পে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহ যেভাবে এবং যে প্রেক্ষাপটে নিহত হলেন তার জন্য বাংলাদেশকে অনেক খেসারত দিতে হতে পারে। আন্তর্জাতিক সব বড় মিডিয়ায় খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে ছাপানো হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশে কর্মরত অন্য সব দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। রোহিঙ্গা ইস্যুর শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে থাকা ব্যক্তি ও সংগঠন কত বড় ঝুঁকির মধ্যে আছে, সেটাই মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেল। মহিব উল্লাহর একান্ত সহচর ও ভাতিজা রহিম এখন ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বলছেন, আরসা (ARSA-Arakan Rohingya Salvation Army)  তাঁকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। মহিব উল্লাহ যে সংগঠনের নেতা ছিলেন সেই সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের পক্ষ থেকে রহিম একটা চিঠি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে। তাতে রহিম উল্লেখ করেছেন, হত্যাকারীরা প্রত্যাবাসন ও স্থানান্তরের বিরোধী। মহিব উল্লাহ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন এবং প্রচার চালাতেন, নিজ দেশ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতে হবে এবং তার জন্য শান্তিপূর্ণ পন্থা অবলম্বনই সর্বোত্তম উপায়; সংঘাত, সংঘর্ষ এবং সশস্ত্র বিদ্রোহ কোনো সমাধান দেবে না। ৩ অক্টোবর একটা নিউজ পোর্টালের খবরে দেখলাম, কিছুদিন আগে কিছু অডিও ক্লিপ ইউটিউবের মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাতে দেখা যায় সন্ত্রাসী সংগঠন আরসার পক্ষ থেকে মহিব উল্লাহকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ওই অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর সব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটা ভীতিকর ও থমথমে অবস্থার সৃষ্টি হয়। অডিও ক্লিপে শোনা যায় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি বলছেন, আরসা নেতা হাফেজ আতাউল্লাহর কথামতো না চললে মহিব উল্লাহর রক্তাক্ত মৃত্যু হবে। এই অডিও ক্লিপগুলো ছয় মাসের পুরনো বলে নিউজ পোর্টালের খবরে বলা হয়েছে। সুতরাং লেখার শুরুতে যে কথাটি বলেছি, তার সূত্রেই বলা যায় বহুদিন আগে থেকেই মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তাই এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার সুযোগ নেই।

kalerkanthoকক্সবাজারের সব ক্যাম্পে এবং স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে একটাই কথা, দেশি-বিদেশি কিছু পক্ষ এবং রোহিঙ্গাদের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো, যারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিরোধী তারাই এই মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সবার সন্দেহের আঙুল সন্ত্রাসী সংগঠন আরসার দিকে, যারা প্রত্যাবাসনবিরোধী এবং ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর প্রভোকেটর। আমার ধারণা, আগামী দিনে যদি আরো গোপন তথ্য-উপাত্ত বের হয় তাহলে হয়তো দেখা যাবে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের সকালে আরসা কর্তৃক মিয়ানমারের পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণের লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনার সরকারকে চরম নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে ফেলা দেওয়া, যাতে সরকারের অ্যাকশনে বাংলাদেশের মানুষ ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয় অথবা মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ একটা সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তাহলে ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চরম পরাজয় ঘটে এবং ক্ষমতায় আসতে পারে জামায়াত-বিএনপি। ২০১৭ সালে তখন বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক ও কিছু সিভিল সোসাইটির ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্তেজনাপূর্ণ ও উসকানিমূলক বক্তব্যের দিকে তাকালে ষড়যন্ত্রের কিছু আলামত দেখা যাবে। শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি সেদিন বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে।

আরসা স্থানীয়ভাবে আল ইয়াকিন নামে পরিচিত। আরসা সম্পর্কে বিশ্বের নামকরা গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের কিছু তথ্য তুলে ধরি। ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল— Myanmar : A new Muslim Insurgency in Rakhine State. ২০১৭ সালের ২৭ আগস্টে এদের আরেকটি বড় প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘Myanmar tips into new crisis after Rakhine state attacks’. ২০১৭ সালের ২০ জুন এশিয়া টাইমস পত্রিকায় একটি বড় প্রবন্ধ ছাপা হয়, যার শিরোনাম ‘Rohingya Insurgency takes Lethal form in Myanmar’. ২০১৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায় প্রশান্ত ঝাঁয়ের প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘Lashker militants inciting Rohingya Refugees, India warn Myanmar’. ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে আরসা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মিয়ানমারের ৩০টি পুলিশ ফাঁড়ির ওপর একযোগে আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণের বিস্তারিত পাওয়া যায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০১৮ সালের ১০ মে ও ২৭ জুনের প্রতিবেদনে। আরসার নেতৃত্ব এবং যারা এদের পৃষ্ঠপোষক তারা নিশ্চয়ই ভালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের ইতিহাস জানে এবং সামরিক যুদ্ধবিদ্যা সম্পর্কে যাদের সামান্য ধারণা আছে তারা সবাই একমত হবে যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামনে আরসা পিপীলিকা মাত্র। এর মাধ্যমে নিরীহ রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার ছাড়া কোনো লাভই তাদের হবে না। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, এমন আত্মঘাতী কাজ আরসা কেন করতে গেল। এই প্রশ্নের উত্তরে আমার অনুমানটা একটু আগে উল্লেখ করেছি। বাংলাদেশের মানুষকে গভীর ষড়যন্ত্রটি বুঝতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের তথ্যানুসারে, আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনী নামের একদল পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত রোহিঙ্গা ব্যক্তির দ্বারা ২০১২ সালে আরসা গঠিত হয়। ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের তিনটি পুলিশ ফাঁড়ির ওপর আরসা আক্রমণ চালায় এবং ৯ জন পুলিশকে হত্যা করে। আরসা নিজেরাই এই আক্রমণের দায়িত্ব স্বীকার করে। বিগত সময়ের ঘটনা সূত্রে বোঝা যায়, আরসা সন্ত্রাসী সংগঠনের উৎপত্তি ও তৎপরতার সঙ্গে পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন, বিশেষ করে লস্কর-ই-তৈয়বার পৃষ্ঠপোষকতা ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, যেটি হিন্দুস্তান টাইমসের ২০১৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। সুতরাং মহিব উল্লাহর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরসা জড়িত, যে কথা মহিব উল্লাহর পরিবার ও স্থানীয়রা বলছে, তার মধ্যে যুক্তি রয়েছে। ১৯৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ইস্যু রোহিঙ্গা সমস্যার যন্ত্রণা বাংলাদেশকে পোহাতে হচ্ছে। এক পাঠান সৈনিকের সেই নির্বুদ্ধিতার গল্পের মতো—‘খানাপিনা নাহি খায়া গ্লাস তুড়ে আট আনা।’ আমাদের অবস্থা হয়েছে সে রকম, কোনো রকম স্বার্থ না থাকা সত্ত্বেও অযথা খেসারত দিতে হচ্ছে। ১৯৭৮ সাল থেকে ২০১৭—৩৯ বছর বাংলাদেশের কোনো সরকারই ইস্যুটিকে যথার্থ গুরুত্ব দিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করেছে বলে মনে হয় না। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের পর সবাই একটু নড়েচড়ে বসলেন বলে মনে হলো, কিন্তু চার বছরের মাথায় এসে দেখছি সব কিছু যেন তথৈবচ।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে আমরা একটা বড় প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছিলাম। তখন কক্সবাজারের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আমাদের একটা মতবিনিময়সভা হয়েছিল। তাতে আমি বলেছিলাম, ভবিষ্যৎ কোনো ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে না, দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে। তাই এই অসহায় নির্যাতিত ক্ষুব্ধ দেশান্তরি জনগোষ্ঠীকে দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা হীন স্বার্থ উদ্ধারে যেন জিম্মি করতে না পারে তার জন্য প্রতিটি ক্যাম্পের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এমন নিরবচ্ছিন্ন ও নিশ্ছিদ্র হতে হবে, যাতে একটা সুচও যেন নিরাপত্তাবেষ্টনীকে এড়িয়ে ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে যেতে-আসতে না পারে। তখন আরো বলেছিলাম, এটা শুরু থেকেই করতে হবে, তা না হলে একবার ছাড় দিলে সেটি আর বেষ্টনীর মধ্যে আনা যাবে না। মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব যতখানি সোচ্চার, প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কিন্তু তাদের ততখানি উচ্চকণ্ঠ হতে দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রেখে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তাসহ সব ব্যবস্থাপনা নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই অনেক দূর চলে গেছে। তবে যত কঠিনই হোক সেগুলোকে রোলব্যাক করে যথাস্থানে আনতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা আমরা চাই, কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে নয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ জন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হয়েছে। কিভাবে ক্যাম্পের ভেতরে অস্ত্র ঢুকল, কারা এই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, কেন এই অস্ত্র উদ্ধার করা যাচ্ছে না—তার কোনো উত্তর কেউ দিচ্ছে না। মনে হয়, সব কিছু রহস্যে ঘেরা। তবে সবাই বলছেন, ২৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কণ্ঠস্বর রোহিঙ্গা নেতা মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

 

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]



সাতদিনের সেরা