kalerkantho

শুক্রবার । ৬ কার্তিক ১৪২৮। ২২ অক্টোবর ২০২১। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

যেন লর্ড রাসেলের ভাষণ শুনছিলাম

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক   

১ অক্টোবর, ২০২১ ০২:৪০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



যেন লর্ড রাসেলের ভাষণ শুনছিলাম

কোন বছরের কথা তা ঠিক মনে নেই। তবে তখন আমি বিলেতে আইনের ছাত্র। সমগ্র আফ্রিকায় চলছিল মহাদুর্ভিক্ষ, অনাহারে প্রাণ হারাচ্ছিল শত শত মানুষ। ঠিক একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ চালকে প্লাস্টিক পণ্যে রূপান্তরিত করে মানবতা বিরোধিতার চরম উদাহরণ চালিয়ে যাচ্ছিল। জুড়িথ হার্ট নামের যুক্তরাজ্যের শ্রমিক দলের বিশ্বমানবতাবাদী নেত্রী ক্ষোভে ফেটে পড়ে তাঁর দলের সদস্যদের বলেছিলেন শিগগির ক্ষমতায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে এ ধরনের নগ্ন অমানবিক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার জন্য। চালকে যে প্লাস্টিকে রূপান্তর করা যায়, এ কথা তখনই প্রথম শুনেছিলাম। গত ২৫ সেপ্টেম্বর আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব সংস্থায় যে ভাষণ দিলেন, তা শুনে যুক্তরাজ্যের সেই শ্রমিকদলীয় নেত্রীর ভাষণের কথা মনে পড়ল, যার কারণ আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের বড় অংশজুড়ে ছিল বিশ্বমানবতার কথা, বিশ্বের দরিদ্র জনসংখ্যার স্বার্থের কথা, দরিদ্র দেশগুলোর অধিকারের কথা এবং উন্নত দেশগুলোর অমানবিক আচরণের কথা। এ ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো প্রধানমন্ত্রী ঠিক তাঁর বিশ্ববন্ধু পিতার পদাঙ্কই অনুসরণ করছেন, একই আদর্শের ধারক। বঙ্গবন্ধু বলতেন, তাঁর প্রথম পরিচয় তিনি একজন মানুষ। মধ্য যুগের কবি চণ্ডীদাস সব মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথা উল্লেখ করে লিখেছিলেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ জাতীয় কবি নজরুলও লিখেছেন, ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’, লালন গেয়েছেন ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।

গত শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী, শান্তির দূত হিসেবে যাকে চিহ্নিত করা হয় সেই লর্ড বার্ট্রান্ড রাসেল আজীবন বিলেতের হিউমেনিস্ট স্ট্যান্ডিং অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৬৭ সালে লিখিত আত্মজীবনীতে যা উল্লেখ করেছিলেন তা ছিল ‘তিনটি মৌলিক আবেগ আমার জীবনকে প্রভাবিত করেছে, যার একটি ভালোবাসার সন্ধান, দ্বিতীয় জ্ঞানের চর্চা এবং তৃতীয়টি মানবজাতির নিপীড়ন নিবারণের পথ খোঁজা।’ বিলেতের অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য (আর্ল) হয়েও তাঁর মানবপ্রেম ছিল অভাবনীয়। ১৯ শতকের বিলেতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলের দৌহিত্র নোবেলজয়ী বার্ট্রান্ড রাসেলকে গত যুগের শ্রেষ্ঠতম মানবতাবাদীদের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর বঙ্গবন্ধুর দর্শনতত্ত্বকেও ইউরোপের নামিদামি দার্শনিকরা বার্ট্রান্ড রাসেলের তত্ত্বের অনুসারী বলে বিবেচনা করতেন এ জন্য যে বঙ্গবন্ধু লর্ড রাসেলের সেই তিন আদর্শই পালন করতেন। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ও তত্পূর্বে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বিশ্বমানবতার পক্ষে কথা বলে এবং বিশ্বময় নির্যাতিত ও মুক্তিকামী মানুষের অধিকারের সমর্থনে কথা বলে বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। ঠিক একই নিদর্শন আমরা দেখতে পাচ্ছি তাঁরই সুযোগ্যা কন্যা শেখ হাসিনার মধ্যে। সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি বিশ্বের বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা বলে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছেন। অভিন্ন মানবজাতি শব্দটি উচ্চারণ করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন তাঁর চিন্তা-চেতনায়ও রয়েছে বিশ্বের সব মানুষ। তিনি সবাইকে সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থ ভুলে গিয়ে বিশ্বমানবতার জন্য নিবেদিত হওয়ার দাবি জানান। এটি গোটা মানবজাতির জন্য দুঃখজনক যে আজ করোনা মহামারির সুযোগ নিয়ে উন্নত দেশগুলো করোনার টিকা নিয়ে বাণিজ্যিক মনোভাব নিয়ে নেমে পড়েছে, যা দেখে মনে হচ্ছে ‘কারো সর্বনাশ, কারো পৌষ মাস।’ এটি ৭০ দশকে চালকে প্লাস্টিকে পরিণত করার মতোই নির্মম। যেখানে মানবতার দাবি হলো করোনার টিকাকে মানবজাতির সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে, মুনাফার কথা না ভেবে সেগুলো গোটা বিশ্বের মানুষের মধ্যে বিতরণ করা, সেখানে উন্নত দেশগুলো করোনার টিকাকে ব্যবহার করছে নিজ নিজ দেশের মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে, আর আমাদের নেত্রী ঠিক সেই অমানবিক মনোভাবের ওপরই প্রত্যক্ষ আঘাত হেনেছেন তাঁর ভাষণে, কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন এ ধরনের মুনাফা প্রবৃত্তির, দাবি করেছেন করোনার টিকা বৈষম্যহীনভাবে বিশ্বময় বিতরণ করতে, একে মানবজাতির সম্পদ বলে বিবেচনা করতে। করোনা টিকার ৮৪ শতাংশ উন্নত বিশ্ব তাদের দখলে রাখায় উষ্মা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেছেন, এই টিকা অবশ্যই বৈষম্যহীনভাবে বিশ্বের সব মানুষের কাছে বিতরণ করতে হবে, এই টিকার প্রযুক্তি সব দেশকেই জানাতে হবে, যাতে দরিদ্র দেশগুলোও করোনার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেছেন, দরিদ্র দেশগুলো করোনায় কাবু হয়ে থাকলে বিশ্বের উন্নতি সম্ভব হবে না, যে কথা শুধু একজন আন্তর্জাতিক চিন্তাবিদের ধারণারই প্রতিফলন। মানবতার প্রতি তাঁর সচেতনতার জন্য জলবায়ু সমস্যায় জাতিসংঘ গঠিত কমিটিতে তাঁকে বিশেষ অবস্থানে স্থান দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষণে নেত্রী জলবায়ুর ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে পৃথিবীকে রক্ষার জন্য উন্নত দেশগুলোর দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগী দরিদ্র দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে। বার্ট্রান্ড রাসেলের যেমন জীবনভর সংগ্রাম ছিল অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে, বঙ্গবন্ধুও তেমনি সোচ্চার ছিলেন নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে; আর একইভাবে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিষবৃক্ষের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন বিশ্বসভায়। তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনের কথা উল্লেখ করে বিশ্বনেতাদের কাছে দাবি তুলেছেন তাঁদের দুর্দশা লাঘবের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টার।

kalerkanthoনেত্রী ঠিক তাঁর মহামানব পিতার মতোই বিশ্বের গোটা জনগোষ্ঠীর অভাব-অনটন বিমোচনের কথা বলে মহাত্মা গান্ধীর সেই উক্তিই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যে উক্তি ছিল ‘পৃথিবীতে সব মানুষের ক্ষুধা নিবারণের জন্য যথেষ্ট রয়েছে, কিন্তু লোভ নিবারণের জন্য নয়।’ তিনি উন্নত দেশগুলোর কাছে দাবি তুলেছেন—করোনার টিকা ও জলবায়ুর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ঠেকানোর জন্য যে প্রযুক্তির প্রয়োজন তা বিশ্বময় বিতরণ করার। এমন কথা কিন্তু অন্য কারো মুখ থেকে শোনা যায়নি বলে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম তাঁর ভাষণকে অনন্য বলে আখ্যায়িত করেছে, তাঁর দূরদৃষ্টি, প্রজ্ঞা ও মানবপ্রেমী মনোভাবের প্রশংসা করেছে। বাংলাদেশে উন্নয়নের বিস্তারিত ধারাবিবরণী দিয়ে নেত্রী বিশ্বনেতাদের মূলত নিজ নিজ দেশে উন্নয়নের প্রবাহ সৃষ্টি করতেই দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন, যাতে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলা যায়। বাংলাদেশ যে উন্নয়নে চমকপ্রদ নজির সৃষ্টি করেছে, আজ তা পৃথিবীর কারো কাছে অজানা নেই। তাই বিশ্ববাসী, বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলো জানতে ইচ্ছুক বাংলাদেশ কিভাবে জাদুর স্পর্শের মতো এত অল্প সময়ে উন্নয়নের দীপশিখা জ্বালিয়ে এক দশক আগের দরিদ্র বাংলাদেশকে উন্নয়নের আলোকবর্তিকায় এনে চমক সৃষ্টি করল। তিনি যেভাবে বাংলাদেশে উন্নয়নের ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন তাতে হামবড়া বা স্বার্থপরতার গন্ধ ছিল না, ছিল উপদেশের সুর, যাতে অন্য দেশগুলোও বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে বিশ্বকে সুখ-শান্তির নিবাসে পরিণত করতে পারে—যা ছিল লর্ড রাসেলের প্রত্যাশা, বঙ্গবন্ধুর ভাবনা। নেত্রী এই প্রত্যাশার কথাটিই স্মরণ করিয়ে জানান দিয়েছেন যে মানবজাতি সভ্যতার উত্কর্ষের কারণে যা কিছু অর্জন করেছে, বৈষম্যহীনভাবে তার ভাগীদার সমগ্র মানবসমাজ। বিশ্বসম্পদ বিতরণে, বিশেষ করে করোনার টিকার বিশ্বময় বিতরণের ব্যাপারে বৈষম্যমূলক আচরণকে, কুক্ষিগত করার প্রবণতাকে তিনি কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে অর্জন করেছেন শ্রোতাদের শ্রদ্ধা।

জননেত্রী শেখ হাসিনা যে বিশ্ববাসীর কাছে অনেক বড় মাপের বিশ্বনেত্রী রূপে আবির্ভূত হয়েছেন তার বড় প্রমাণ তাঁকে প্রদান করা এসডিজি সম্মাননা (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা স্থায়ী উন্নয়ন)। এটি প্রদান করেছে স্বয়ং জাতিসংঘ ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যা বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় থাকা চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি। এটি যে কত উঁচু মাপের সম্মাননা তা আরো পরিষ্কার হয়েছে, যখন এই সম্মাননা প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘জুয়েল অব দ্য ক্রাউন’ বিশেষণে সম্বোধন করা হয়। তাদের কথার মর্মার্থ হলো, তিনি সারা পৃথিবীর মুকুটের মণি। উল্লেখ্য যে ঔপনিবেশিককালে ভারতবর্ষের সম্পদের জন্য, খ্যাতির জন্য একে ‘জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ বলা হতো। সুতরাং ‘জুয়েল অব দ্য ক্রাউন’ কথাটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ, যার জন্য বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই গর্বিত হওয়ার দাবিদার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণে আন্তর্জাতিকতা যেমন অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তেমনি সম্মোহিত করেছে জাতিসংঘের মহাসচিবকেও, যিনি শেখ হাসিনার প্রশংসায় কোনো কার্পণ্য প্রদর্শন করেননি। করোনার টিকা ও বিশ্ব জলবায়ু সমস্যার বিষয়ে তিনি যা বলেছেন তাকে অনেকেই মাইলফলক ভাষণ বলে আখ্যায়িত করেছেন। অনেকে বলেছেন, তাঁর ভাষণ উন্নত দেশগুলোর নেতাদের চোখ খুলে দিতে পারে, তাঁদের মধ্যেও বিশ্বমানবতার ধারার সূচনা হতে পারে। এ ভাষণ নিশ্চিতভাবে শেখ হাসিনাকে একটি দেশের রাষ্ট্রনায়ক থেকে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে, যে মর্যাদা সত্তরের দশকে বঙ্গবন্ধু লাভ করেছিলেন তাঁর জীবদ্দশায়ই। সব ভেদাভেদ ভুলে সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ার জন্য অভিন্ন মানবসমাজের যে কথা তিনি বলেছেন, তা নিশ্চিতভাবে একটি গভীর তত্ত্ব কথা। অভিন্ন মানবজাতির তত্ত্ব আগে যাঁরা উচ্চারণ করেছেন, তাঁদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এ ব্যাপারে স্মরণ করা যায় মার্কিন মানবাধিকার নেতা মার্টিন লুথার কিং, শিকাগো সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দের ভাষণ, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির পর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষণ, বিভিন্ন জায়গায় মহাত্মা গান্ধীর ভাষণ, ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালামের ভাষণে, দার্শনিক সার্ত্রে, অঁদ্রে মালরো, গোর্কি, কার্ল মার্ক্স, হেগেল, ইমানুয়েল কান্ত, স্টিফেন হকিন্স (লিখিতভাবে), অতীশ দীপংকর, জুলিও কুরি, ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল, মাদার তেরেসা, বঙ্গবন্ধু প্রমুখের ভাষণে। তা ছাড়া সে যুগের জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কয়েকজন নেতাও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির দুরবস্থা নিরোধকল্পে, ক্ষুধামান্দ্য রোধকল্পে অংশীদারির ভিত্তিতে এবং দরিদ্র দেশগুলোকে প্রযুক্তি বিতরণের দাবি জানিয়ে তিনি শুধু দরিদ্র দেশগুলোর সমর্থন পাননি, অনেক উন্নত দেশের রাষ্ট্রনায়করাও তাঁর চিন্তা-চেতনায় আন্তর্জাতিকতার স্পর্শ ছিল বলে তাঁর জয়গান গেয়েছেন। মহামারির কারণে দরিদ্র দেশগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ছাত্র-ছাত্রীদের মেধা বিকাশের পথে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে বলে তিনি দাবি করেন—এর থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার জন্য উন্নত দেশগুলোকেই গুরুদায়িত্ব নিতে হবে। তিনি দাবি করেছেন স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে উন্নয়নের পথে পা বাড়ানোর জন্য উন্নত দেশগুলোকে অংশীদারির ভিত্তিতে সহায়তা দিতে হবে। তিনি করোনার টিকাকে মানবজাতির সম্পদ উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এ কথা উন্নত দেশগুলো মানছে না; বরং ৮৪ শতাংশ টিকাই পাচ্ছে উন্নত দেশ, যে বৈষম্য রোধ না করলে বিশ্ব এক সংযুক্ত মানবগোষ্ঠী হিসেবে এগোতে পারবে না। জলবায়ু সমস্যা যে উন্নত দেশেরই সৃষ্টি সে কথা উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশগুলোকে উন্নত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি বহুলভাবে সমর্থিত হয়েছে।

ইন্টারনেট ব্যবস্থা, নারীর ক্ষমতায়ন, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধকরণ, অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি ন্যায়বিচারের ব্যাপারগুলোও তাঁর ছয় দফা দাবির মধ্যে ছিল। তাঁর ছয় দফা দাবি বাংলাদেশের মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু যে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন, সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। তাঁর এই ছয় দফা দাবিকে অনেক চিন্তাবিদই আন্তর্জাতিকভাবে মানবতার মুক্তির ম্যাগনাকার্টা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন এগুলো বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব হবে অনাহারমুক্ত, শান্তি সাম্য এবং ন্যায়বিচারের জায়গা। আফগানিস্তানের ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য ছিল অতি মূল্যবান এই অর্থে যে তিনি সেখানে গণমানুষের ইচ্ছার সরকার প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতার কথা বলেছেন, যা আজ সবার প্রত্যাশা। তিনি দক্ষিণ এশিয়াকে শান্তির অঞ্চল হিসেবে দেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার বীভৎস ফলের কথা উল্লেখ করে তিনি লর্ড বার্ট্রান্ড রাসেলের সেদিনের উক্তির কথাই স্মরণ করিয়ে দিলেন, যেদিন লর্ড রাসেল আণবিক শক্তির বিধ্বংসী ক্ষমতার আবিষ্কারের কথা শুনে বলেছিলেন—এরপর আর নিরাপদ বিশ্বের চিন্তা ধারণ করার অবকাশ থাকবে না।

শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচারের কথা উল্লেখ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের নিপীড়নের কথা বলে তাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপের বিকল্প নেই বলে যে কথা বলেছেন, সে কথা তাঁর ভাষণের পর বহুজনের মুখে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তাঁর ভাষণের একটি উল্লেখযোগ্য ছিল এই যে তিনি কারো প্রতি কটাক্ষমূলক ভাষা ব্যবহার না করে তাঁর ছয় দফা দাবি সাবলীলভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বিশ্বশান্তির জন্য কাজ করা। তিনি সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থ ভুলে গিয়ে সবাইকে বিশ্বের মানুষের কথা চিন্তা করার আহ্বান জানিয়ে যে আদর্শের কথা উচ্চারণ করলেন, তা প্রতিপালিত হলে এক নতুন বিশ্বের সূচনা হবে বলে বিজ্ঞজনরা মনে করছেন। তাঁর ভাষণের আরো একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ঘটিত বঙ্গবন্ধু হত্যার কথা বিশ্বসম্প্রদায়কে নতুন করে জানিয়ে দেন, যা এরই মধ্যে অনেকেই ভুলে গিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ‘জয় বাংলা’ শব্দ দুটিকেও বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে পরিচিত করিয়ে দেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলে জানিয়ে দিলেন বাংলাদেশ ইসরায়েলের পক্ষ নেয়নি।

শেখ হাসিনার জাতিসংঘে গমনের ফলে আমরা দেখতে পেয়েছি বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী নেতা তাঁদের নিজেদের উদ্যোগেই এই বিশ্বনন্দিত নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছেন, অথচ তৃতীয় বিশ্বের নেতারা সাধারণত উন্নত বিশ্বের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত পাওয়ার জন্য রীতিমতো ধরনা দিয়ে থাকেন। জাতিসংঘে তিনি যে সম্মান পেলেন তা আমাদের সবার জন্য গৌরবের ব্যাপার। আমাদের সবারই প্রত্যাশা—তাঁর দীর্ঘায়ু, যাতে বিশ্বব্যাপী আমাদের মানমর্যাদা সর্বোচ্চ অবস্থায় থাকে।

 

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি



সাতদিনের সেরা