kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

আমাদের ব্যর্থতায় টিকার বৈষম্য

গর্ডন ব্রাউন   

১ অক্টোবর, ২০২১ ০২:৩৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমাদের ব্যর্থতায় টিকার বৈষম্য

বিশ্বে শিগগিরই এক হাজার কোটিতম কভিড ভ্যাকসিন উৎপাদিত হতে যাচ্ছে। ডাটা রিসার্চ এজেন্সি এয়ারফিনিটি সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আগামী জানুয়ারির মধ্যে এই টিকা উৎপাদন একটি শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে যাবে। তখন প্রতিটি মহাদেশের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য টিকার ডোজ পর্যাপ্ত থাকবে। জুনের মধ্যে ডোজের সংখ্যা দুই হাজার ৭০০ কোটিতে পৌঁছে যাবে, যা বিশ্বের জনসংখ্যাকে দুইবার করে টিকা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

তবে উৎপাদনের এই বিজয়ানন্দ সত্ত্বেও প্রতিটি দেশের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতার দৌড়ে আমরা বাজেভাবে পরাজিত হচ্ছি। বর্তমান প্রবণতা বলছে, আগামী গ্রীষ্মেও বিশ্বের অর্ধেকের বেশি টিকাবিহীন থেকে যাবে। উৎপাদন নয়, স্রেফ টিকাপ্রাপ্তির অভাবেই প্রয়োজন থাকা লোককে আমরা টিকা দিতে পারছি না।

কিছুদিন আগ পর্যন্ত টিকা উৎপাদনের যুক্তিসংগত ঘাটতি ছিল বলে এমনটা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যাপ্ত উৎপাদন সত্ত্বেও টিকাগুলো সমভাবে বিতরণ করা যাচ্ছে না—এর পেছনে একটি স্পষ্ট ও প্রশ্নাতীত ব্যর্থতা রয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোকে টিকা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং তাদের মাত্র ২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ককে টিকা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ধনী দেশগুলো এরই মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি নাগরিককে পূর্ণ ডোজ টিকা দিয়ে টিকা আধিপত্য বজায় রাখছে। এই মাসে এবং অদূরভবিষ্যতে বিশ্বে হাজার হাজার লোক মারা যাওয়ার যে আশঙ্কা রয়েছে, তা শুধু টিকা উৎপাদনের স্বল্পতা নয়, বরং অতিরিক্ত মজুদ হওয়ার কারণেই ঘটবে।

জি-৭-এর পক্ষ থেকে বরিস জনসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ২০২১ ও ২০২২ সালের মধ্যে সমগ্র বিশ্বকে টিকা দেওয়া হবে; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে তা পূরণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে শতাধিক দেশ তাদের জনসংখ্যার ন্যূনতম ১০ শতাংশকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি এবং পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তাতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৩০ শতাংশকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য পূরণের সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভ্যাক্স কর্মসূচি গত বছর বিশ্বে ন্যায়সংগত টিকা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এমনকি জি-৭ দেশগুলো গত জুনে দরিদ্রতম দেশগুলোকে ৮৭ কোটি টিকা বিতরণ করার যে প্রতিশ্রুতি কোভ্যাক্সকে দিয়েছিল, সেখানেও তারা মাত্র ১০ কোটি ডোজ টিকা ছাড় দিয়েছে। আর সর্বসাকল্যে বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত সব টিকার মাত্র ৪ শতাংশ ডোজ কোভ্যাক্সের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে।

এভাবে কভিড ভ্যাকসিন উৎপাদনের বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে সবার প্রকৃত সুরক্ষায় পরিণত করতে না পারা এবং ভ্যাকসিন আছে ও ভ্যাকসিন নেই বলে বৈশ্বিক বিভক্তি এড়াতে না পারা আমাদের এই সম্মিলিত ব্যর্থতা, মানে একটি নৈতিক বিপর্যয়।

অথচ সব কিছু উল্টে দিতে আমরা সময়ের সঙ্গে লড়ছি। উচ্চ হারে টিকা দেওয়া দেশগুলো যখন কভিড সংক্রমণ ও মৃত্যু হারের যোগসূত্রটি ভেঙে দিতে পেরেছে, তখন অল্প পরিমাণ ভ্যাকসিন প্রদানকারী দেশগুলোকে হাসপাতাল ও মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে। গত সপ্তাহে আফ্রিকান নেতারা ভ্যাকসিন ইকুইটিতে হতাশ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তাঁরা আর পশ্চিমা দেশের ওপর নির্ভর করবেন না।

তার পরও একটা উপায় আছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি একটি জরুরি জি-৭ ভ্যাকসিন শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করা উচিত। পশ্চিমের অব্যবহৃত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং এরই মধ্যে সম্পন্ন হওয়া বিতরণ চুক্তিগুলো কোভ্যাক্সে হস্তান্তরের একটি সমন্বিত পরিকল্পনায় সম্মত হওয়ার জন্যই সম্মেলনটি করা উচিত। কারণ পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন আমাদের রয়েছে। এরই মধ্যে মাসিক উৎপাদন দেড় শ কোটিতে রয়েছে এবং বছর শেষে প্রতি মাসে ২০০ ডোজ সারপ্লাস থাকবে। তত দিনে আমরা ১০০ কোটির বেশি অব্যবহৃত ভ্যাকসিনও সংগ্রহ করতে পারব, করব। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে অব্যবহৃত ভ্যাকসিনের সংখ্যা ২০০ কোটি অতিক্রম করতে পারে। বিশ্বের টিকা প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা মানে নিজেদের পরাজয় এবং তা আমাদেরই তাড়া করতে পারে। কারণ টিকাবিহীন ব্যক্তির মধ্যেই রোগটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর নতুন নতুন ধরন উদ্ভব ঘটতে পারে, যা এমনকি আমাদের বর্তমান ভ্যাকসিন কাভারেজকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তাই টিকা ভারসাম্যের ওপর লাখ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন নির্ভর করছে না, বরং আমাদের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের স্থায়িত্ব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধির সম্ভাবনাও নির্ভর করছে।

লেখক : সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও বৈশ্বিক শিক্ষাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা