kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৫ কার্তিক ১৪২৮। ২১ অক্টোবর ২০২১। ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

প্রভাবশালীদের ইন্ধনে বেপরোয়া ৬ হত্যার আসামি জাহিদ!

ফরিদ আহমেদ   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:৩৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রভাবশালীদের ইন্ধনে বেপরোয়া ৬ হত্যার আসামি জাহিদ!

ঘাতক জাহিদ

নরসিংদীর শিবপুরে মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন, আওয়ামী লীগকর্মী মিলন মিয়াসহ অন্তত ছয়টি হত্যা মামলার প্রধান আসামি জাহিদ সরকার এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিবপুর উপজেলা আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের আহ্বায়ক হওয়ার পর তিনি হত্যা মামলার বাদী ও সাক্ষীদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছেন। বাদী মামলা তুলে না নিলে, সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের হত্যার হুমকি দিচ্ছেন জাহিদ।

ভুক্তভোগী পরিবার ও শিবপুরের একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভুঞা মোহনের ইন্ধনে জাহিদ এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সংসদ সদস্যের ইঙ্গিতে এরই মধ্যে নৌকা প্রতীক নিয়ে বাগাবো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করতে জনসংযোগ ও শোডাউন করছেন।

শিবপুরের কুন্দারপাড়া এলাকার মৃত কালা মিয়ার ছেলে জাহিদ সরকার। তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয় ১৯৯১ সালে। ওই সময় স্থানীয় জনতা ব্যাংকের ১০ লাখ টাকা ডাকাতির অভিযোগে করা মামলায় ১৭ বছর সাজা হয় জাহিদের। পরে তিনি কয়েক বছর কারাভোগ করে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন।

ব্যাংক ডাকাতির মামলায় জামিনে থাকার সময় ২০০১ সালে কোন্দারপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী মো. ফিরুজ মিয়াকে হত্যার অভিযোগ ওঠে জাহিদের বিরুদ্ধে। এই মামলায় তিনি প্রধান আসামি হলেও পরে রাজনৈতিক বিবেচনায় খালাস পান।

এরপর ২০০২ সালে চাঁদপাশা এলাকার মো. ইউসুফ খন্দকারকে গুলির পর কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে জাহিদ সরকারের বিরুদ্ধে। ওই মামলায়ও প্রধান আসামি করা হয় জাহিদকে। পরে মামলাটি আপস মীমাংসা হয়েছে বলে দাবি করেন জাহিদ।

এরপর জাহিদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ওঠে ২০০৩ সালে। ওই বছরের ১৩ নভেম্বর সকাল ১১টায় জয়মঙ্গল এলাকার মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিনকে কোন্দারপাড়া বাসস্ট্যান্ডে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে জাহিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় নিম্ন আদালত তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেন। তবে পরে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আদালতে আপিল করে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হন জাহিদ। কিছুদিন সাজাভোগের পর অ্যাপিলেট ডিভিশনের এক আদেশে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি। আর জাহিদ দাবি করেন, উচ্চ আদালতে আপিল করলে এই মামলা থেকে তাঁকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

২০০৯ সালে কোন্দারপাড়া বাসস্ট্যান্ডে জাহিদ সরকারের গুলিতে পথচারী শামসুল ইসলাম নিহত হন বলে অভিযোগ ওঠে। নিজের এক প্রতিপক্ষকে গুলি করলেও নিহত হন ওই পথচারী। এ ঘটনায় আদালতে মামলা হলেও পরে আপস মীমাংসা করেন বাদী ও জাহিদ।

২০১২ সালে খুন হন কোন্দারপাড়া এলাকার আবদুল জলিল মিয়ার ছেলে নরসিংদী সরকারি কলেজের ছাত্র রুবেল মিয়া। পরে অভিযোগ ওঠে, ওই সময় জাহিদ কারাগারে থাকলেও তাঁর নির্দেশে তাঁরই ভাগ্নে এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে অপহরণ করে নরসিংদী সদর উপজেলার চরাঞ্চল আলোকবালী এলাকায় নিয়ে রুবেলকে হত্যা করা হয়। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শিবপুরে আওয়ামী লীগের এজেন্ট মিলন মিয়াকে গলা কেটে হত্যা মামলায় প্রথমে আসামি করা না হলেও ডিবি ও সিআইডির করা তদন্ত প্রতিবেদনে জাহিদকে প্রধান আসামি করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী পারভীন বেগম বাদী হয়ে শিবপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি প্রথমে থানা-পুলিশ ও পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করে। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ ৯ মাস তদন্ত শেষে বাদীসহ মোট ৩১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগপত্রে জাহিদ সরকারকে এ হত্যা মামলায় প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া জাহিদের আপন ভাতিজা কোন্দারপাড়া এলাকার মৃত জয়নাল আবেদীন সরকারের ছেলে হৃদয় সরকার (২৫) ও আপন ভাগ্নে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের চণ্ডিবের এলাকার আলাউদ্দিনের ছেলে রুবেল (২৬) ও কোন্দারপাড়া এলাকার মৃত চান মিয়ার ছেলে দেলোয়ার হোসেনকে (৩২) অভিযুক্ত করা হয়।

এই মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে বের হয়ে রায়পুরার ডৌকারচরের তেলিপাড়া এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতি নেওয়ার সময় অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন জাহিদ। জেলা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারের খবর ফেসবুক পেজে ছবিসহ দেয়। এ মামলায় কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়ার পর জাহিদ সরকারকে শিবপুর উপজেলা মৎস্যজীবী লীগের আহ্বায়ক করা হয়।

এর পর থেকে জাহিদ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সামনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন করতে হত্যা মামলাগুলো থেকে খালাস পেতে চাপ সৃষ্টি করছেন মামলার বাদীদের ওপর। মামলা তুলে না নিলে তাঁদের হত্যারও হুমকি দিচ্ছেন। একই সঙ্গে মামলার সাক্ষীদের নাম প্রত্যাহার করে সাক্ষী না হতে হুমকি দিচ্ছেন। নিহত মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন কবিরের বড় ছেলে লতিফুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার পিতা দেশকে শক্রমুক্ত করতে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। অথচ তাঁকেই প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। আমি আমার মুক্তিযোদ্ধা পিতা হত্যার বিচারের আকুল আবেদন জানাচ্ছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে।’

মিলন মিয়ার স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী আওয়ামী লীগ করত বলে দলের প্রার্থীর এজেন্ট হয়ে নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিল। কিন্তু ভোটকেন্দ্রেই আমার স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলেও আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার পাচ্ছি না। উল্টো মামলা তুলে নিতে আমাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’ মিলনের মা রাহেমা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাহিদ সরকার আমার বুকের ধনকে কেড়ে নিয়েছে। আমার দুই নাতি ও এক নাতিনকে সে এতিম বানিয়েছে। এখন আবার আমাদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাহিদ সরকারকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জাহিদ সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। এ জন্য একের পর এক মামলায় আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা আমার বাবা ও ভাইকে হত্যা করেছে। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে সেগুলো মিথ্যা। আমাকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে এসব করা হচ্ছে।’



সাতদিনের সেরা