kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

‘রাগে-ক্ষোভে আগুন দিছি, আর বাইকই চালাব না’

কমিশন, হয়রানির প্রতিকার চান রাইড শেয়ারিং চালকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক    

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৪:০২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘রাগে-ক্ষোভে আগুন দিছি, আর বাইকই চালাব না’

করোনা মহামারির মধ্যে শওকত আল সোহেলের স্যানিটারি সামগ্রীর ব্যবসায় ধস নামে। রাজধানীর উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্নভাবে প্রায় ৯ লাখ টাকা ঋণ হয়েছে তাঁর। দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ পাঁচজনের সংসার চলানোর কোনো উপায় না পেয়ে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন শুরু করেন তিনি। দেড় মাস ধরে মোটরসাইকেল চালানোর সময় ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সোহেল। রাইডার অ্যাপগুলো চালকদের কাছ থেকে ২৫ শতাংশ কমিশন কেটে নেয়। আবার অ্যাপ ছাড়া যাত্রী পরিবহন করলে বা রাস্তায় দাঁড়ালেই মামলা করে ট্রাফিক পুলিশ, তখনো গুনতে হয় টাকা। সারা দিন কষ্ট করে উপার্জিত সে টাকা দিতে হবে অন্যদের—এমন কষ্টেই সোমবার  রাজধানীর বাড্ডায় নিজের মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেন সোহেল।

গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠ’র কাছে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সোহেল বলেন, ‘রাগে-ক্ষোভে মোটরসাইকেলে আগুন দিছি। কিছুদিন আগে পল্টনে একটা মামলা করছে পুলিশ। সেটা জরিমানা দিয়ে ভাঙিয়েছি। আবার একটু দাঁড়াতেই মামলা দিতে চায়। সারা দিন ভাড়া মারলে কয় টাকা পাই? অ্যাপওয়ালারা ২৫ পার্সেন্ট নিয়ে যায়। আবার অ্যাপ না নিলে পুলিশ মামলা দেয়।’

সোমবারের ঘটনার পর অনেকে ফোন করে সোহেলকে সহমর্মিতা জানিয়েছেন। কয়েকজন নতুন মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার কথা বলেছেন। ‘এই যোগাযোগই শেষ। সমাধান তো নাই। কেউ আসেনি আমার কাছে। আমি আর বাইকই চালাব না।’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন সোহেল। তিনি জানান, ৯ লাখ টাকা দেনার দায় নিয়ে পাঁচজনের সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেন। মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহনের হয়রানি বন্ধ না হলে অন্য কোনো উপায়ে সংসার চালাবেন তিনি। গত সোমবার রাত ৯টার দিকে পুলিশের গুলশান বিভাগের কার্যালয় থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি কেরানীগঞ্জের বাসায়ই আছেন।

এদিকে সব ধরনের রাইডে কমিশন ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা, পার্কিংয়ের জায়গা নির্ধারণসহ ছয় দফা দাবিতে গতকাল কর্মবিরতি পালন করেছে অ্যাপভিত্তিক ড্রাইভারস ইউনিয়ন অব বাংলাদেশ।  রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে জানানো হয়, এক সপ্তাহের মধ্যে ছয় দফা দাবির বিষয়ে সরকারকে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। এর পরও দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনে নামবেন রাইড শেয়ারের চালকরা।

সোমবারের ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে সোহেল বলেন, তিনি গুলশান লিংক রোডের কাছে বাড্ডায় রাস্তায় এক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। তখন ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্য এসে তাঁর কাগজপত্র চান। সোহেল পুলিশ সদস্যকে জানান, দুই সপ্তাহ আগে পল্টন এলাকায় দাঁড়ানোর কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি রং পার্কিংয়ের মামলা হয়েছে। তিনি মামলা না করে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তখন পুলিশ সদস্য রাইড শেয়ারিং অ্যাপ আছে কি না প্রশ্ন করেন। সোহেল জানান, বেশি টাকা কেটে নেওয়ার কারণে তিনি চুক্তিতে ভাড়া নিচ্ছেন। ওই সময় পুলিশ সদস্য মামলা করতে উদ্যত হন। এতে ক্ষুব্ধ হন সোহেল। নিজেই মোরসাইকেলের তেলের লাইন খুলে আগুন ধরিয়ে দেন। এক পর্যায়ে লোকজন এগিয়ে গেলে পুলিশ সদস্য তাঁর লাইসেন্সসহ কাগজপত্র ফেলে দিয়ে চলে যান। কিছুক্ষণ পর আরো কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। এরপর সোহেলকে বাড্ডা থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এক পর্যায়ে তাঁকে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সবখানে তিনি নিজের ক্ষোভের কথা বলেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে আইন মেনে চলার কথা বলেন। তবে সোহেলের দাবি, পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে কোনো সমাধান দিতে পারেননি। ঘটনার পর পুলিশ তাঁর বেশির ভাগ অংশ পুড়ে যাওয়া মোটরসাইকেলটি বাড্ডা থানায় নিয়ে রেখেছে।

নিজের পরিবারের অবস্থা জানিয়ে সোহেল বলেন, ‘৯ লাখ টাকার মতো মার্কেটে দেনা। দোকান বন্ধ। বিক্রি নাই। ব্যবসা বন্ধ। পাঁচজনের সংসার। মোটরসাইকেল চালিয়ে যে ইনকাম করব, তার একটা বড় অংশ দিতে হবে অ্যাপ আর পুলিশকে! তাহলে আমি কয় টাকা ইনকাম করব আর কিভাবে চলবে?’

সোহেল জানান, কয়েকজন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে সহমর্মিতা জানান। মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার কথাও বলেছেন কয়েকজন। তবে গতকাল পর্যন্ত তিনি কারো সহায়তা গ্রহণ করেননি। মূলত তিনি তাঁর সমস্যা আর ক্ষোভের কথা জানান বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে গতকাল এক দিনের কর্মবিরতি পালনের পাশাপাশি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন করেছেন রাইড শেয়ারিং চালকরা। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে অ্যাপভিত্তিক ড্রাইভারস ইউনিয়ন অব বাংলাদেশের সাধারণ সমপাদক বেলাল আহমেদ ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো অ্যাপনির্ভর শ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি, কর্ম সময়ের মূল্য দেওয়া, সব ধরনের রাইডে কমিশন ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা, মিথ্যা অজুহাতে কর্মহীন করা বন্ধ, পার্কিংয়ের জায়গা নির্ধারণ এবং তালিকাভুক্ত রাইড শেয়ারকারী যানবাহনকে গণপরিবহনের আওতায় নিয়ে আগাম কর কেটে রাখা বন্ধ করা।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, কোনো চালক কোন পরিস্থিতিতে গেলে নিজের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে ফেলতে বাধ্য হন, তা সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে। অ্যাপ কম্পানিগুলো বেশি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। বাইকারদের সংসার চালাতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় পুলিশও কঠোর আচরণ করে। এক সপ্তাহের মধ্যে দাবিগুলো স্মারকলিপি আকারে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হবে। এর পরও সমস্যার সামাধান না হলে আন্দোলনে নামবেন রাইড শেয়ারিং চালকরা।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মনিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা বিভিন্নভাবে যাচাই করে দেখেছি, দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট বা সদস্যের কোনো ত্রুটি আছে কি না। এমন কিছু পাওয়া যায়নি। রং পার্কিংয়ের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আগে মামলা হয়েছে। এবারও একই অপরাধে তাঁর মোটরসাইকেল আটকানো হয়। ওই সময় তিনি নিজের ক্ষোভ সংবরণ করতে পারেননি। করোনার কারণে তাঁর ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। কষ্টের মধ্যে আছেন। এটা আসলে একটা সংকট। অনেকেই বিকল্প উপাজর্নের মাধ্যম হিসেবে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। তাঁরা অ্যাপ নিচ্ছেন না, কারণ ২৫ শতাংশ দিয়ে দিতে হয়। আবার অ্যাপটাকে আমরা সাপোর্ট করি। কারণ এটা হলে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা কর্মসূচিও করেছে কিছু দাবি নিয়ে। এ ব্যাপারে আমাদের সরাসরি কিছু করার নেই। বিভিন্ন পক্ষ আছে। তবে বসে এটা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’

প্রসঙ্গত, গত সোমবার রাজধানীর বাড্ডায় শওকত আলী সোহেল তাঁর মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক তোলপাড় হয়। ঘটনার প্রতিবাদে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দেয় অ্যাপভিত্তিক ড্রাইভারস ইউনিয়ন অব বাংলাদেশ।



সাতদিনের সেরা