kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

অবৈধ ভিওআইপির বিরুদ্ধে অভিযানের সুফল

বৈধ পথে কল বেড়েছে দিনে ৭৫ লাখ মিনিট

কাজী হাফিজ ও হায়দার আলী    

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:৫৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বৈধ পথে কল বেড়েছে দিনে ৭৫ লাখ মিনিট

কালের কণ্ঠে গত ৩১ আগস্ট প্রধান প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, ‘অভিযানে বাড়ে বৈধ কল’। অতীতেও এর প্রমাণ মিলেছে। বর্তমানেও মিলছে। গত ১৪ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল বা ভিওআইপির অবৈধ কারবারিদের বিরুদ্ধে বিটিআরসি ও র‌্যাবের কয়েকটি সফল অভিযানের পর প্রতিদিন দেশে আসা বৈদেশিক ভয়েস কলের পরিমাণ গড়ে প্রায় ৭৫ লাখ মিনিট বেড়েছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ দুই কোটি ৭০ লাখ ৭৩ হাজার মিনিট কল আসে। তার আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর কল আসে দুই কোটি ৭০ লাখ ৬৪ হাজার মিনিট। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে দুই কোটি ৬৫ লাখ মিনিট কল এসেছে। এ তথ্য দেশে আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানের লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডাব্লিউ) অপারেটরদের। অভিযানের আগে এই কলের পরিমাণ ছিল প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৯০ লাখ মিনিটের মতো।

বেসরকারি আইজিডাব্লিউ অপারেটরদের ফোরাম আইওএফের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মুশফিক মঞ্জুর গত মাসে কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন,  ‘অভিযান চলাকালে ভিওআইপির অবৈধ কার্যক্রমে সাময়িক ভাটা পড়ে; কিছু কল অবৈধ পথ থেকে বৈধ পথে পরিচালিত হয় এবং বৈধ পথে আসা কলের পরিমাণ সাময়িক বৃদ্ধি হয়। গত ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে বিটিআরসি ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণে অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জাম ধরা পড়ার পর ওই মাসে বৈধ পথে দৈনিক ৮০ লাখ মিনিট কল বেড়ে যায়। ফলে রাজস্ব আয়ের পরিমাণও দৈনিক ৪২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ লাখ টাকায় উন্নীত হয়, কিন্তু মার্চে আবারও কল কমতে থাকে। আগস্ট মাসে কলের পরিমাণ দাঁড়ায় দৈনিক এক কোটি ৯০ লাখে।’

সাম্প্রতিক অভিযান বিষয়ে মুশফিক মঞ্জুর গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারির অভিযানের মতো এবারের অভিযানেও বৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক কল কিছুটা বেড়েছে।’

গত মাসে আইওএফ থেকে আরো জানানো হয়, দেশে বৈধ ও অবৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক কলের বাজার রয়েছে দৈনিক পাঁচ কোটি থেকে ছয় কোটি মিনিট। এই হিসাবের মধ্যে ওটিটি (ওভার দ্য টপ) কল অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু বৈধ পথের তুলনায় অবৈধ পথেই বেশি কল আসছে। দৈনিক অবৈধ পথে আসা তিন কোটি মিনিট কল থেকে বিদ্যমান রেটে সরকারের রাজস্ব হারানোর পরিমাণ বছরে ২১৮ কোটি টাকা এবং দেশের সব আইজিডাব্লিউর হারানো আয়ের পরিমাণ বছরে ১০৯ কোটি টাকা।

এ হিসাবে সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে বৈধ পথে কলের পরিমাণ কিছুটা বাড়লে ভিওআইপির অবৈধ কারবারিদের বেশ কয়েকটি চক্র এখনো সক্রিয় বলেই সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তা ছাড়া এসব অভিযানে কর্মচারী পর্যায়ের কিছু লোক ধরা পড়লেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। চট্টগ্রামে এক রাজনৈতিক নেতার ছেলে এসব চক্রের সঙ্গে যুক্ত মর্মে আলোচনা ও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে শারুন নামের এই বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে টেলিটকের দুর্নীতিবাজ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং একসময় হাওয়া ভবনের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট এ ব্যবসা থেকে ফায়দা লুটছে।

এদিকে গত ২৩ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ অভিযানে ভিওআইপির অবৈধ কারবারের পদ্ধতি সম্পর্কে মিলেছে নতুন কিছু তথ্য। ওই দিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানে রাজধানী ফকিরাপুল এলাকায় বিটিআরসির অভিযানে প্রায় ২০ কোটি টাকার কলিং কার্ডসহ ভিওআইপির অবৈধ ব্যবসা চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিটিআরসি জানায়, রাজধানীর ফকিরাপুল গরম পানির গলি এলাকার প্রিন্টিং প্রেসে অভিযান চালিয়ে ওই চারজনকে আন্তর্জাতিক কলিং কার্ডসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এঁরা হচ্ছেন মোহাম্মদ আমির হামজা (৩৩),  আলমগীর হোসেন (৪৫),  শামীম মিয়া (২৯) ও  সাগর মিয়া (২৭)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ভিওআইপি ব্যবসায় ব্যবহার করা বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে জানা যায় ওই প্রিন্টিং প্রেসে যে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক কলিং কার্ড পাওয়া গেছে তা যদি ব্যবহার করা হতো তাহলে বাংলাদেশ সরকার আনুমানিক ১৯ কোটি ৪৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫০ টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতো। প্রিন্টিং প্রেসটিতে পাকিস্তান ভয়েস, কাতার এক্সপ্রেস, এশিয়ান টেলিকম, এনএস এক্সপ্রেস, প্রবাসী কার্ড, স্বপন টেল, সুপার কার্ড, কাতার টুসহ মোট ১০৭টি কলিং কার্ড ক্লাইটের দেড় লক্ষাধিক কুপন পাওয়া গেছে।

বিটিআরসি আরো জানায়, অসাধু ভিওআইপি কারবারে প্রচলিত সফটওয়্যারভিত্তিক সুইচের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করে অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক কল রাউট করা হতো এবং ওই স্থাপনা পরিচালনা করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে যান্ত্রিক ভার্চুয়াল সফটওয়্যারভিত্তিক কৌশল অবলম্বন করে অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও রিচার্জ সেবা দিত।

চক্রটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রচলিত ডায়ালার কলগুলো বাংলাদেশে অবৈধভাবে আউট করত এবং ওই অ্যাপে রিচার্জের জন্য বিভিন্ন অঙ্কের কলিং কার্ড বিক্রি করত। এ ছাড়া তারা অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক রিচার্জ সেবা দিত এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে আসছিল। এরা সাত-আট বছর এই অপকর্মে লিপ্ত ছিল। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠান মেইনবার্গ লিমিটেড ও সংবার্ড ট্রেডিং লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে এই চোরাকারবার চালিয়ে যাচ্ছিল।

এদিকে এসংক্রান্ত মামলার এজাহার বিশ্লেষণে জানা যায়, বিটিআরসি ও র‌্যাবের সাম্প্রতিক অভিযানগুলো কারিগরি সক্ষমতার বাইরে হঠাৎ পাওয়া কোনো সূত্রের তথ্যনির্ভর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিটিআরসির কারিগরি সক্ষমতা বাড়লে ভিআইপির অবৈধ কারবার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এ কারবার বন্ধে মোবাইল ফোন অপারেটররা ২০১০ সালের মে মাসে বিটিআরসিতে যে সিমবক্স ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপন করে দিয়েছিল, তা গত ৩১ মে বন্ধ হয়ে গেছে। অপারেটররা আর এই সিস্টেম চালু রাখার জন্য টাকা খরচ করতে রাজি নয়। এ ছাড়া বেসরকারি ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডাব্লিউ) অপারেটরদের সংগঠন ‘আইওএফ’ এ পরীক্ষামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ল্যাট্রো সার্ভিস ইনকরপোরেশনের একটি পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালু ছিল। সেটাও বন্ধ। বর্তমানে মোবাইল ফোন অপারেটরদের এসআর বা সেলফ রেগুলেটরি ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো গ্রাহকের সিমের মাধ্যমে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক কলের পর্যবেক্ষণ কিছুটা চালু আছে। এসব সীমাবদ্ধতা থেকে উত্তরণের জন্য বিটিআরসি সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে নিজেদের অর্থায়নে একটি পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব পাঠায়।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের কার্যক্রম তদারকির জন্য বিটিআরসি গত ২ আগস্ট কানাডাভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান টিকেসি টেলিকমের সঙ্গে টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম ক্রয়সংক্রান্ত একটি চুক্তি করেছে। বিটিআরসির পক্ষে বলা হচ্ছে, এ সিস্টেমটি বাস্তবায়িত হলে মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং রিপোর্টিং প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব তথ্য বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকে পরের ১৮০ দিনের মধ্যে বা আগামী ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে এই মনিটরিং সিস্টেম চালু হওয়ার কথা। কিন্তু এর মাধ্যমে ভিওআইপির অবৈধ কারবার বন্ধ করা যাবে কি না, সে সম্পর্কে বিটিআরসির কর্মকর্তারা নিশ্চিত নন।

সাম্প্রতিক অভিযান ও কারিগরি দক্ষতা বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভিওআইপির অবৈধ কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে ও থাকবে। এটা কখনই বন্ধ হবে না। আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যাঁরা আছেন তাঁরা এটা নিয়ে কাজ করছেন।’

ভিওআইপির অবৈধ কারবার বন্ধে নিজেদের কারিগরি সক্ষমতা অর্জন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আশা করছি, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে আমরা এ বিষয়ে পুরোপুরি সক্ষমতা অর্জন করতে পারব। তবে  সে সক্ষমতা কী ধরনের হবে তা প্রকাশ করা ঠিক হবে না।’ 

প্রতিবেশী ভারতেও ভিওআইপির অবৈধ কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সে দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে সেখানে বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরাও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থেই এ কারবার পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে। রাজস্ব ক্ষতিও এ ক্ষেত্রে উপেক্ষার নয়।’

যখনই অভিযান চালানো হয় তখনই এ অবৈধ কাজে বিপুল পরিমাণে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের সিম জব্দ করা হয়। এ বিষয়ে শ্যাম সুন্দর সিকদারের বক্তব্য, ‘ভিওআইপির অবৈধ কারবারের বিরুদ্ধে অভিযানে আমাদের কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। আমরা পরিস্থিতি সম্পর্কে অথরিটিকে বারবার বলে আসছি, রিপোর্ট করছি। বিটিআরসির দিক থেকে কাউকে অনুকম্পা বা ক্ষমা প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই।’



সাতদিনের সেরা