kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ফাঁসির আসামি পাহারাতেই অর্ধেক কারারক্ষী

ওমর ফারুক    

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফাঁসির আসামি পাহারাতেই অর্ধেক কারারক্ষী

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আট বছর আগে ১৫২ জন বিডিআর জোয়ানের ফাঁসির রায় দেন নিম্ন আদালত। ২০১৭ সালে হাইকোর্টের রায়ে ১৩৯ জনের ফাঁসির রায় বহাল রাখা হয়। এই ১৩৯ জন আট বছর ধরে রয়েছেন কারাগারের নির্জন কনডেম সেলে।

তাঁদের মতো ১৯৮৩ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারের কনডেম সেলে বন্দি রয়েছেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে কনডেম সেলের সংকীর্ণ স্থানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় পড়ে আছেন তাঁরা। এর মধ্যে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে সূত্র জানায়।

খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেছে এ রকম অনেক উদাহরণ। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে পাঁচ আসামির ডেথ রেফারেন্স বিচারাধীন। আবার ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ১৩ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাইকোর্ট বিভাগে বিচারের অপেক্ষায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নিয়মানুযায়ী প্রতিটি কনডেম সেলের সামনে একজন করে কারারক্ষী আট ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করেন। ২৪ ঘণ্টায় একজন আসামির পেছনে নিয়োজিত থাকেন তিনজন কারারক্ষী। এই হিসাবে ১৯৮৩ জনের জন্য প্রতিদিন ৫৯৪৯ জন কারারক্ষীর পাহারায় থাকার কথা। বর্তমানে কারাগারে ১২ হাজারের মতো রক্ষী রয়েছেন, যাঁদের অর্ধেককেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে ফাঁসির আসামিদের পেছনে।

কারা সূত্রগুলো বলছে, দেশের ৬৮টি কারাগারে বর্তমানে অন্তত ২০-২৫ হাজার কারারক্ষী দরকার। কিন্তু আছেই মাত্র ১২ হাজার। এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে তদন্ত চলমান, অনেকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায়, অনেকে অসুস্থ ও ছুটিতে থাকায় প্রতিদিন ১১ হাজারের বেশি কারারক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না কাজের জন্য। এ অবস্থায়ও কনডেম সেলের সামনে কারারক্ষী মোতায়েন রাখতেই হয়। এসব কারণে অন্যদিক সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় কারা কর্তৃপক্ষকে।

জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল আবরার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ১২ হাজারের মতো কারারক্ষী রয়েছে। কনডেম সেলে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক করারক্ষী মোতায়েন রাখতে হয়।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কারাগারে যেসব ফাঁসির আসামি রয়েছেন তাঁদের মামলাগুলো কী অবস্থায় আছে তা জানার চেষ্টা করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। গত ১ সেপ্টেম্বর তাঁরা ফাঁসির আসামিদের বিচারের তথ্য পেয়েছেন। সেই তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে সারা দেশের কারাগারে এক হাজার ৯৮৩ জন ফাঁসির আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন ২৩৩ জনের মামলা। আর হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন এক হাজার ৭৫০ জনের মামলা। হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন ছয় মাসের নিচে রয়েছেন ২৪৯ জন, ৬-১ বছরের রয়েছেন ১১৭ জন, ১-৩ বছরের রয়েছেন ৫৮০ জন, ৩-৬ বছরের রয়েছেন ৪৬৩ জন, ৬-৮ বছরের রয়েছেন ৯৯ জন, ৮-১০ বছরের রয়েছে ১২৯ জন, ১০-১২ বছরের রয়েছেন ৫১ জন, ১২-১৫ বছরের রয়েছেন ২৬ জন, ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে রয়েছেন ১৩ জন, অসম্পূর্ণ তথ্য রয়েছে ২৩ জনের।

আপিল বিভাগে রয়েছেন ছয় মাসের নিচে ১২ জন, ছয় মাস থেকে এক বছর ১৩ জন, ১-৩ বছরের ৪৯ জন, ৩-৬ বছরের ৩৩ জন, ৬-৮ বছরের ২৭ জন, ৮-১০ বছরের ১০ জন, ১০-১২ বছরের ৫১ জন, ১২-১৫ বছরের ৩৩ জন, ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে পাঁচজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যাঁরা ফাঁসির আসামি রয়েছেন তাঁদের চূড়ান্ত বিচারে গিয়ে যদি ফাঁসি থেকে দণ্ড কমে, তাহলে ওই ব্যক্তি কঠিন একটি অবস্থা থেকে মুক্তি পান। অন্যদিকে আদালত চূড়ান্ত বিচারে যদি ফাঁসির রায় বহাল রাখেন, তবে রায় কার্যকরের মাধ্যমে ফাঁসির আসামির সংখ্যা কমে। এতে কারা কর্তৃপক্ষ যেমন উপকৃত হয়, তেমনি তাদের পেছনে সরকারের খরচও কমে। কোনো কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ১৫-২০ বছর বেশি সময় ধরেও কনডেম সেলে রয়েছেন। তাঁদের পেছনে সরকারেরও অনেক ব্যয় হচ্ছে।

অনেক ফাঁসির আসামির মামলায় ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে হাইকোর্টে। আবার অনেকে ডেথ রেফারেন্স শেষ হওয়ার পর আপিল করেছেন। সেটা আপিল বিভাগে বিচারাধীন। উচ্চ আদালতে থাকা এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রায়ই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আইনে ডেথ রেফারেন্স কত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে, তার বাঁধাধরা নিয়ম নেই। তবে প্রধান বিচারপতি চাইলে পেপার বুক তৈরির পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার শুনানি হতে পারে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সিরিয়াল অনুযায়ী ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যায়। এখন ২০১৬ সালের মামলার শুনানি চলছে। এগুলো শেষ হলে ২০১৭ সালের মামলাগুলো যাবে। বিচারপতির অভাবে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বেঞ্চ বসাতে না পারার কারণেই এমন অবস্থা হচ্ছে।’ তিনি জানান, ডেথ রেফারেন্সের মামলাগুলো অন্য মামলার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে শোনেন আদালত। ফলে সময় বেশি লাগে।’

প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ফাঁসির রায় দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া উচিত এ কারণে যে যে লোকটি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত তাঁকে কারাগারে নির্জন স্থানে রাখা হয় এবং তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। যদি চূড়ান্ত বিচারে তাঁর ফাঁসি বহাল রাখা হয়, তাহলে কার্যকরের মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করা যায়। আর যদি তাঁর ফাঁসি না হয়ে সাজা কমে, তাহলে তিনি কারাগারের ওয়ার্ডে চলে যাবেন। মানসিক বিপর্যস্ততা থেকে রক্ষা পাবেন।’

আইনজীবীরা জানান, বিচারিক আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হলে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন নিতে হয়, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হিসেবে পরিচিত। হাইকোর্টের রায়ের পর সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করতে পারে। আর আপিলে আসা সিদ্ধান্তের পর তা পুনর্বিবেচনা চেয়ে সংক্ষুব্ধ পক্ষের আবেদন করার সুযোগ থাকে। ডেথ রেফারেন্স শুনানির আগে পেপার বুক তৈরি করতে হয়, যেখানে মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, সাক্ষীদের বক্তব্য, বিচারিক আদালতের রায়সহ মামলার তথ্যাদি সংযোজিত থাকে।

যেসব আলোচিত মামলা : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ওপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মামলা (ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল) হাইকোর্টে শুনানির জন্য রয়েছে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ওই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। একটি হত্যা, অন্যটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে। এরপর বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে ঘটনার সময়ের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ও সাবেক এমপি কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দুটি মামলায় তাঁদের অভিন্ন সাজা দেওয়া হয়েছে। এরপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা অনুমোদনের জন্য ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। এরপর কারাবন্দি আসামিরা ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহীরা ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করেন। হত্যা মামলায় ২০১৩ সালে নিম্ন আদালত ১৫২ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেন। এর পর তাঁরা হাইকোর্টে আবেদন করলে ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর ১৩৯ জনের ফাঁসি বহাল রাখা হয়। এখন তাঁদের মামলাগুলো সুপ্রিম কোর্টের অপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।



সাতদিনের সেরা