kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

নিউ ইয়র্কে নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী

আমার কাছে ক্ষমতা মানে মানুষের ভাগ্য গড়া

জিয়া এরশাদ খালেদা কখনো জনগণের কল্যাণের কথা ভাবেনি

শামীম আল আমিন, নিউ ইয়র্ক   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:৩৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আমার কাছে ক্ষমতা মানে মানুষের ভাগ্য গড়া

বছর দুই আগেও যুক্তরাষ্ট্রে দলীয় নেতাকর্মী ও সুধীজনদের সামনে উপস্থিত হয়ে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু কভিড-১৯-এর কারণে পরিস্থিতি বদলে গেছে। মাঝে এক বছর আসতেও পারেননি। অনেকটা কঠিন পরিস্থিতিতেও এবার তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন, নানা ইস্যুতে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের অবস্থান। তবে বিশেষ সতর্কতার অংশ হিসেবে নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সুযোগ হয়নি। শুক্রবার নিউ ইয়র্ক সময় রাত ৮টায় ভার্চুয়াল সভার শুরুতে অনেকটা আক্ষেপ করেই প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পারলেই অনেক ভালো লাগত।’  

যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এই ভার্চুয়াল নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করে। লাগোর্ডিয়া ম্যারিয়ট হোটেলে আয়োজিত সভায় যোগ দেওয়ার জন্য শুধু নিউ ইয়র্ক নয়, অন্যান্য অঙ্গরাজ্য থেকেও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত হন। সেখানে তখন উৎসবমুখর পরিবেশের তৈরি হয়। রাত ৮টার কিছু সময় পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর হোটেল স্যুট থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। তখন উপস্থিত নেতাকর্মীরা বিপুল করতালি ও স্লোগান দিয়ে প্রিয় নেত্রীকে বরণ করে নেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে জাতিসংঘের অধিবেশনে এবার তাঁর অংশগ্রহণের নানা দিক তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে তাঁর সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথাও জানান। বিশেষ করে করোনা মহামারিতে দেশের মানুষের জীবনমান রক্ষায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেসব তুলে ধরেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি বক্তব্য দেন।  

শেখ হাসিনা বলেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তারা মূলত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তারা দেশের জনগণের শত্রু। তিনি বলেন, বিদেশে অবস্থান করা কিছু লোক সরকারের সমালোচনা করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ব্যস্ত। এমন সময়ে তারা এসব করছে, যখন আওয়ামী লীগ দেশকে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে। কেউই যাতে দেশে মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, রাজনীতি ভোগের জন্য নয়, বরং এটি আত্মত্যাগের জন্য। তিনি বরাবরই মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি করে এসেছেন। জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া কখনো জনগণের কল্যাণের কথা ভাবেননি; বরং তারা ক্ষমতাকে ভোগ এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন বলেও মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।

সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমালোচনাকারীরা একটা কথা ভুলে যায় যে আমি জাতির পিতার মেয়ে। আমরা দেশের জন্য কাজ করি, আর ক্ষমতাটা আমাদের কাছে দেশসেবা করা, মানুষের সেবা করা। আমরা অর্থ-সম্পদের জন্য লালায়িত না।’

বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তাদের সন্তানরা ক্ষমতাটাকে ভোগের জায়গা বানিয়েছে। ক্ষমতাটাকে তারা নিজেদের ভাগ্য গড়ার জায়গা বানিয়েছে। আর আমাদের কাছে ক্ষমতা হচ্ছে মানুষের ভাগ্য গড়া, বাঙালির ভাগ্য গড়া, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য গড়া। দেশের মানুষের উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে সরকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ সমগ্র বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হয়ে উঠেছে। কিছু মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারকে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার প্রশ্ন হলো, তারা কিভাবে এই কথাগুলো বলার সুযোগ পায়?’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারা তাঁর সরকারের তৈরি ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের সমালোচনার সুযোগ পাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা জনগণের অর্থ সম্পদ লুট করে, খুন করে অথবা অস্ত্র পাচার করার অথবা গ্রেনেড হামলা-মামলার আসামি, সেই আসামিদের হাতের টাকা খেয়েই তো তারা এই বড় বড় কথা বলে আর তারাই বলে আওয়ামী লীগ অবৈধ।’

জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলকে আদালত অবৈধ বলে রায় দিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তো অবৈধ সরকারের তাঁবেদারি করে আওয়ামী লীগকে বা আওয়ামী লীগ সরকারকে অবৈধ বলার অধিকারটা তাদের কে দিল?

‘জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে এবং বিএনপির যদি শক্তি থাকত, তাহলে তারা নির্বাচন করত।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে নিউ ইয়র্কে আসা প্রসঙ্গেও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ড্রিমলাইনার বিমানে করে দুটি কারণে নিউ ইয়র্কে এসেছেন। প্রথম কারণ হচ্ছে অন্য এয়ারলাইনসের পরিবর্তে দেশি একটি এয়ারলাইনসকে অর্থ দেওয়া। তিনি বলেন, ‘এভাবে আমাদের নিজের হাতেই এ ধরনের অর্থ থেকে যায়।’ সরকার ঢাকা-নিউ ইয়র্ক রুটে পুনরায় বিমান পরিচালনা শুরু করতে একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে এ সময় প্রধানমন্ত্রী জানান।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগ করার আহবান জানিয়েছেন। ভার্চুয়াল সংবর্ধনার পর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে একটি মতবিনিময়সভায় শেখ হাসিনা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণে তাঁর সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। প্রবাসীদের সেসব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার কথা বলেন তিনি। এ সময় সাংবাদিকদের বেশ কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।

ভার্চুয়ালি আয়োজিত এই মতবিনিময়সভায় রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু সমস্যা, ভ্যাকসিন কূটনীতিসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ উঠে আসে। ভারসাম্যহীন উন্নয়ন টিকবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য ব্যবস্থা না নিলে সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না।

তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন যে কভিড-১৯ মহামারির পর থেকে তিনি দেশবাসীকে আহবান জানিয়েছেন, বাংলাদেশের জন্য শুধু নয়, অন্য দেশের জন্যও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যেন এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি না থাকে। দেশে-বিদেশে শত্রু তৈরি এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে একটি প্রশ্ন করা হয় শেখ হাসিনাকে। উত্তরে তিনি বলেন, ‘ন্যায় ও সত্যের পক্ষে যখন কথা বলব, স্বাভাবিকভাবেই জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হবে। কিন্তু সে জন্য সত্যটা বলব না, ন্যায়সংগত কথাটা বলব না, এটা তো হয় না। সে জন্যই সেটা আমি করে যাচ্ছি। বারবার গ্রেনেড হামলাসহ নানা কিছুর মুখোমুখি আমাকে হতে হয়েছে, কতবার তো কারাগারে বন্দি হতে হয়েছে। সেগুলো জানি আমি। এবং জেনেই কিন্তু আমার পথচলা।’

সাংবাদিকদের কাছে প্রত্যাশাসংক্রান্ত একটি প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘সংবাদপত্র সমাজের আয়না। সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সুতরাং নির্বিচারে সমালোচনা না করে, একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা উচিত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রে মিথ্যা অভিযোগ করে কাউকে খাটো না করে, দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করতে হবে।’



সাতদিনের সেরা