kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সিসার কারবারে ধূম্রজাল

এস এম আজাদ   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:২৩ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সিসার কারবারে ধূম্রজাল

প্রতীকী ছবি

রাত সাড়ে ১০টা। রাজধানীর ধানমণ্ডির ১৫ নম্বর এলাকার কেবি স্কয়ার ভবনের লিফটে চেপে তিনতলায় (লেবেল টু) ওজং রেস্টুরেন্টে ঢুকে দেখা গেল অন্য এক জগৎ। আলো-আঁধারির মধ্যে ধোঁয়ার রাজত্ব। সুগন্ধির সুবাস ছড়ানো পরিবেশে বাজছে ইংরেজি গান। টেবিল ঘিরে সাজানো সোফাগুলোতে পা তুলে হেলান দিয়ে আয়েশে বসা যায়। বিভিন্ন টেবিলে অর্ধশত তরুণ-তরুণী। সব টেবিলেই শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের হুঁকা, সেখানে সবাই যাকে সিসা বলছেন। হুঁকার নল ঘুরছে হাতে হাতে। কেউ একাই টানছেন। কয়েকজন একে অপরের কাঁধে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন। সার্ভিস টেবিলের পাশের সোফায় বসে অপেক্ষায় চারজন তরুণ-তরুণী।

গ্রাহক সেজে এক কর্মীর কাছে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ১১টার পর অর্ডার নেওয়া বন্ধ থাকে। তবে ১২টার পরও খোলা থাকে। কোনো সমস্যা নেই থাকতে পারবেন।’

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ওজং রেস্টুরেন্টে রাত ১২টা পর্যন্ত থেকে সিসা সেবনের এমন চিত্র দেখা গেল। জানতে চাইলে রেস্টুরেন্টের তত্ত্বাবধায়ক শাহিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এখানে কোনো ঝামেলা নেই।’

চলতি বছরের ৪ জুন ওই রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) সিসার সরঞ্জামসহ ২৫ জনকে আটক করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। লকডাউনের পর ফের চাঙ্গা এই সিসা লাউঞ্জ। কেবি স্কয়ারের কয়েকজন ব্যবসায়ীসহ আশপাশের কয়েকজন ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে বলছিলেন, মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় ওজং রেস্টুরেন্টে অভিযান পরিচালিত হয় না। সাতমসজিদ রোডের অন্য সিসা লাউঞ্জে আগে নজরদারি হলেও এখন তা একেবারেই বন্ধ।

একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর বনানী এলাকা ঘুরেও। এখানে সবচেয়ে বেশি সিসা লাউঞ্জ। সম্প্রতি মাদকসহ মডেল পিয়াসা ও মৌ গ্রেপ্তার হলে মিন্ট আল্ট্রা লাউঞ্জ ও পেট্টাস লাউঞ্জের নাম আসায় মালিকরা সেগুলো বন্ধ রেখে গাঢাকা দিয়েছেন। বাকি সবই চলছে দেদার।

এসব সিসা লাউঞ্জের মালিকরা দাবি করছেন, তাঁরা প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ করে’ কারবার চালাচ্ছেন। আইনে সিসার উপাদান মোলাসেস বা ফ্লেভারে ২ শতাংশের বেশি নিকোটিন থাকলে ‘খ’ শ্রেণির মাদকের তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশে নিকোটিন নিষিদ্ধ নয়—এই অজুহাত কাজে লাগিয়ে সাতটি লাউঞ্জের মালিক উচ্চ আদালতে রিট করে ছয় মাস করে স্থগিতাদেশ পাচ্ছেন।

তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০১৩ সালের পর থেকে সিসা লাউঞ্জে অভিযানে মদ, গাঁজা ও ইয়াবা সেবনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রায় এক বছর আগে ২৩টি লাউঞ্জ থেকে সিসার নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে পাওয়া গেছে ২ শতাংশের বেশি নিকোটিন। তরুণ-তরুণীদের আসক্ত করে তুলতে সিসায় মাদকদ্রব্য মেশানো হচ্ছে। ইয়াবা, গাঁজা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক সেবনের সুযোগও আছে ওই সব সিসা লাউঞ্জে। সম্প্রতি অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া সবাই জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে তাঁরা সিসাবারে নিয়মিত যেতেন। সিসাবার থেকেই মাদকের আড্ডা এবং চক্রে যুক্ত হয়েছেন তাঁরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সিসাবারে নজরদারি নিশ্চিত করতেই নিকোটিনের পরিমাণ বেঁধে দিয়ে সিসাকে মাদক আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ডিএনসির সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামালউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁরা (ব্যবসায়ী) অবৈধ কারবার করতে আইনকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। উল্টা-পাল্টা বোঝালে বিপদ হবে। ডিএনসির উচিত ভালোভাবে আদালতে এর জবাব দেওয়া। নিকোটিনের একটা মাত্রা আছে, ২ শতাংশের বেশি হলেই ঝামেলা। এতে অন্য কিছু ঢুকতে পারে। তাঁরা মাদকের কারবার করতে এবং নজরদারির বাইরে থাকতে নিকোটিন নিষিদ্ধ নয় বলে ধূম্রজাল ছড়াচ্ছেন।’

২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮’ কার্যকর হয়। এই নতুন আইনে সিসাকে মাদকদ্রব্যের ‘খ’ শ্রেণির তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই মাদক সম্পর্কিত অপরাধ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম এক বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও নগদ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

২০১৯ সাল থেকে সাতটি সিসা লাউঞ্জের মালিক অভিযান স্থগিতের জন্য উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। চলতি বছরের শুরুতে ডিএনসি ঢাকা উত্তরের ১৯টি, দক্ষিণের দুটি এবং চট্টগ্রামের দুটি সিসা লাউঞ্জের সিসার নমুনা সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগারে পাঠায়। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, ২৩টি লাউঞ্জেরই সিসার মধ্যে ২ শতাংশের বেশি নিকোটিন আছে। অথচ প্যাকেটে ২ শতাংশের কম লেখা আছে।

সিসাবারের ব্যাপারে ডিএনসি একেবারে নীরব কেন জানতে চাইলে অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন্স ও গোয়েন্দা) ডিআইজি কুসুম দেওয়ান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সায়েন্স ল্যাবে কিছু বিষয় পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলাম। তারা ড্রাগ আইটেমগুলো পরীক্ষা করতে পারবে না। আবার আমাদের ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি।’ জানতে চাইলে ডিএনসির প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেন, ‘আমরা এখনো পরীক্ষা করে দেখছি অন্য কিছু আছে কি না।’

রিটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিআইজি কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘এটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে।’

যেভাবে চলছে সিসাবার : গত এক সপ্তাহ বনানী ও ধানমণ্ডি ঘুরে অবাধে সিসা লাউঞ্জগুলো চলতে দেখা গেছে। গত শনিবার রাতে বনানীর ডি-ব্লকের ১০ নম্বর রোডের ৬৬ নম্বর বাড়িতে আরগিলা লাউঞ্জ থেকে বান্ধবীসহ বের হওয়া তরুণ নাফিস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে আমরা এনজয় করতে আসি। এখানে যারা আসে তারা সবই (মাদক) পায়। একটা সার্কেল হয়ে যায়।’ নিজের নাম ছাড়া কোনো পরিচয় দেননি আনুমানিক ২৩ বছরের ওই তরুণ।

বনানী ১১ নম্বর রোডের এইচ ব্লকের ৫২ নম্বর ভবনে প্লাটিনাম গ্র্যান্ড আবাসিক হোটেলের প্লাটিনাম সুইটস লাউঞ্জে অভিজাতরা সিসা সেবন করছেন। বিএফসি ভবনের ১০-১২ তলায় এক্সিট, দ্য নিউ ঢাকা ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ও টিজেএস নামের লাউঞ্জে চাঙ্গা বেচাকেনা। বনানী কবরস্থানের কাছে ফিউশান হান্ট, ই-ব্লকের ১২/বি রোডের ৭৭ নম্বর বাড়িতে আল গ্রিসিনো, জি-ব্লকের ১১ নম্বর রোডের ৩২ নম্বর বাড়িতে ব্ল্যাক ব্রিচ কিচেন অ্যান্ড লাউঞ্জ, ১১ নম্বর রোডের এআর রেস্টুরেন্ট, সিটি ব্যাংকের ভবনে ৩২ ডিগ্রি লাউঞ্জ, ১১ নম্বরে ফ্লোর-সিক্স রিলোডেড, লাল সোফা, কিউডিএস, রিলোডেট, গোল্ডেন টিউলিপ, ব্ল্যাক পাথ কিচেন ও ফারহান নাইট এবং গুলশানের আরএম সেন্টারে ডাউন টাউন, মনটানা ও কোর্ট ইয়ার্ড বাজার চলছে নির্বিঘ্নে।

ব্ল্যাক পাথ কিচেনের মালিক রাইসুল ইসলাম জুয়েল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমারটা ছোট আকারের। তবে অনেকগুলো বড়। তারাই বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে চালায়। আমরা বসে একটা সিদ্ধান্ত নিই।’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ম্যানেজ করেই রিটে গেছি। ছয় মাস পর পর তিন লাখ করে টাকা দিয়ে রেইড (অভিযান) বন্ধের অর্ডার আনা হচ্ছে। আমরা স্থায়ী অর্ডার চাই।’ জুয়েল দাবি করেন, ‘আমরা মাদক তো মিশাই না। প্রশাসন দেখুক কারা মেশায় বা বিক্রি করে।’

আরেকজন ব্যবসায়ী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসনের পরামর্শে আদালতে রিট করে, প্রভাব আর টাকা দিয়েই সিসাবার চালাচ্ছেন তাঁরা। পুলিশ প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের লোকজনকে টাকা দিলে তারাই রিট করার পরামর্শ দেয়। এর পরও টাকা দিতে হয়। দু-একজনের রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকায় তাঁরা টাকা দেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিকল্পনা করে কিউডিএসের মালিক হুমায়ুন কবির, পেট রুশ রেস্টুরেন্টের আনোয়ার হোসেন, ফ্লোর সিক্স রেস্টুরেন্টের সাইদ আল কামাল, এফ-ব্লকের ১১ নম্বর সড়কের সারোয়ার হোসেন, ই-ব্লকের ১১ নম্বর সড়কের ফারহান তওসিফ রহমান, কক্সবাজারের কলাতলীর ফ্রেন্ডস ক্লাবের টপি রানী কুণ্ডু এবং সহিবুর রহমান খান রিট করেছেন। পরবর্তী সময়ে বনানীর রিটকারী ফ্লোর-সিক্স রিলোডেড, কিউডিএসসহ আল ফাকির, লাল সোফা, গোল্ডেন টিউলিপ, টিজেএস, পেট্টাস, ফারহান নাইট ও দ্য নিউ ঢাকা ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের নমুনা পরীক্ষায় ২ শতাংেশর বেশি নিকোটিন মিলেছে।

ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর রোডে এলএইচএফ ফুড, সাতমসজিদ রোডে ঝাল লাউঞ্জ, এইচটুও, অ্যারাবিয়ান নাইটস, ধানমণ্ডির ৬ নম্বর রোডে লাউঞ্জ সিক্স, সেভেন টুয়েলভ, ফুড কিংসসহ কয়েকটি সিসা লাউঞ্জ চালু আছে। উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে হাঙরি আই-১, হাঙরি আই-২, উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে ক্যাফে মিররসহ অন্তত এক ডজন লাউঞ্জ চলছে।

সিসা লাউঞ্জ থেকে ছড়াচ্ছে মাদক : পুলিশ, র‌্যাব ও ডিএনসির বেশ কিছু অভিযানে সিসার সঙ্গে আলাদা মাদকদ্রব্য জব্দ এবং সিসার মোলাসেসের সঙ্গে মাদকদ্রব্য মেশানোর আলামত মিলেছে। সম্প্রতি মাদকদ্রব্যসহ মডেল পিয়াসা, মৌ, প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ, ব্যবসায়ী মিশু হাসানকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে উঠে আসে সিসাবার থেকেই মাদক কারবার এবং হাউস পার্টিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে। এসব কাজের একজন হোতা বনানীর ১১ নম্বর সড়কের ১৫৩ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলার মিন্ট আল্ট্রা সিসা লাউঞ্জের মালিক শাকিল। রিট আবেদনসহ লাউঞ্জ মালিকদের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। অথচ তাঁর লাউঞ্জেই আড্ডার নামে উঠতি মডেলদের ইয়াবা-আইস সেবন এবং কারবারে ব্যবহার করা হতো। সেখানে বসে হাউস পার্টির পরিকল্পনা করে ভাড়া ফ্ল্যাটে নিয়ে অসামাজিক কাজ করা হতো। লকডাউনের পর আশপাশের লাউঞ্জ খুললেও মিন্ট আল্ট্রা বন্ধ করে গাঢাকা দিয়েছেন শাকিল। এর পাশের পেট্টাস নামের লাউঞ্জটিতেও সরাসরি মাদক কারবার চলত বলে তথ্য মিলেছে। এই প্রতিষ্ঠানটিও এখন বন্ধ।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে প্রথমবার ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর এলএইচএফ ফুড অ্যান্ড লাউঞ্জে অভিযান চালায় ডিএনসি। জব্দ করা আলামত পরীক্ষায় মাদকের উপাদান না পাওয়া গেলেও লাউঞ্জে মেলে মদ। তখনই সিসাবারে মাদকদ্রব্য সেবনের বিষয়টি প্রথম নজরে আসে। এরপর বেশ কয়েকটি অভিযানে সিসার সঙ্গে ইয়াবা, গাঁজা, আইস, হেরোইন, মদ ও বিয়ার পাওয়া গেছে। গত ১৫ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান প্রকাশ্যে আত্মহত্যা করার ঘটনার সূত্র ধরে আলোচনায় আসে নতুন মাদক লাইসার্জিক এসিড ডাইইথ্যালামাইড (এলএসডি)। পুলিশের অভিযানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কাছ থেকে সিসার উপাদানও জব্দ করা হয়। র‌্যাবের অভিযানে এলএসডি, আইসসহ নতুন মাদক উদ্ধারের সময়ও মিলেছে সিসা। গত ২০ আগস্ট ৫০০ গ্রাম আইসসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তারে সিসাবারে মাদকের আড্ডা ও বিক্রির তথ্য পেয়েছে ডিএনসি।



সাতদিনের সেরা