kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংসের আগমন সময়ের দাবিতে

ইকরামউজ্জমান   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৪:২৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংসের আগমন সময়ের দাবিতে

মৌসুমের শেষ খেলায় ঘরোয়া লিগে একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বসুন্ধরা কিংস ও আবাহনী। সহজ-সরল খেলা ফুটবলের মাঠের গল্প এমন যে শেষ বাঁশি বাজার আগে পর্যন্ত বোঝার উপায় নেই—সমাপ্তি কিভাবে ঘটতে যাচ্ছে। ঘরোয়া ফুটবল মৌসুমের শেষ খেলা ছিল বসুন্ধরা কিংস ও ঢাকা আবাহনীর মধ্যে। চার ম্যাচ হাতে রেখে গত মাসেই দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা অধিকার করে নিয়েছে বসুন্ধরা কিংস। আর ঢাকা আবাহনীর ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছে লিগে তৃতীয়। যেন খেলার ফলাফলে এই অবস্থানের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হতো না—তার পরও মর্যাদার লড়াই। গত দুই মৌসুমে মাঠের লড়াইয়ে তো পেরে ওঠেনি ঢাকার লিগে একসময়ের সবচেয়ে সফল, জনপ্রিয় এবং আলোচনা সৃষ্টিকারী দল ঢাকা আবাহনী। উভয় দলের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। বসুন্ধরা কিংস চেয়েছে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীকে শেষ ম্যাচে পরাজিত করে বিজয়রথ টেনে নিয়ে যেতে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষ আবাহনীর সৃষ্টি লিগ টেবিলের সর্বোচ্চ পয়েন্ট সংগ্রহের রেকর্ড অতিক্রম করতে। অন্যদিকে আবাহনী চেয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে জিততে, আর তা সম্ভব না হলে ড্র করে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে। শেষ পর্যন্ত গল্প শেষ হয়েছে উভয় দল (১-১) সমান। কেউ কাউকে হারাতে পারেনি। ভাগ্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। আত্মঘাতী গোল। এই গোল না হলে হয়তো গল্পের শেষ হতো অন্যভাবে। গত দুই মৌসুমে বসুন্ধরা কিংসের অর্জন অসাধারণ। এত কম সময়ে এত অর্জনের নজির নেই দেশের ঘরোয়া ফুটবলের ইতিহাসে। পুরুষ দলের পাশাপাশি নারী ফুটবল দলও লিগ শিরোপা জয় করেছে। এ ছাড়া দেশের বাইরে এএফসি কাপ প্রথমবারের মতো খেলতে গিয়ে মাথা উঁচু করে গ্রুপ রানার্স-আপ হয়ে দেশে ফেরা। জানান দিয়ে আসা আগামী মৌসুমে এএফসি কাপে গ্রুপ সেরা হয়ে পরবর্তী রাউন্ডে খেলার জন্য বসুন্ধরা কিংস আসবে। ক্লাব চাইছে দেশের ফুটবলের অবস্থানে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে। দেশের ফুটবলের স্বার্থে ক্লাবের কোচকে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করারও অনুমতি দিয়েছে বসুন্ধরা কিংস।

ফুটবল দেয় আবার কেড়েও নেয়। মৌসুমের শেষ দিনে আশা পূরণের ক্ষেত্রে ধাক্কা। ভাগ্যের পাশাপাশি এ সবই খেলার অংশ। জীবনের সঙ্গে কী অদ্ভুত মিল।

ঢাকা আবাহনী ক্লাব ফুটবলে রং হারাচ্ছে এটা লক্ষণীয়। বিষয়টি রীতিমতো চিন্তা ও উদ্বেগের। স্বাধীনতার পর ক্লাবটি ফুটবলে এসে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে। ফুটবলে আসার পর থেকে আবাহনীকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই ক্লাবের ফুটবলে এত বছর পর সংকুচিত ভাব। এর পেছনে যুক্তিসংগত কারণ আছে। আর এই কারণগুলো নির্ণয় করার দায়িত্ব হলো ক্লাব কর্তৃপক্ষ ও টিম ম্যানেজমেন্টের। সময়কে পড়তে ভুল করা বা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

স্বাধীনতার পর পর নতুন দেশে ফুটবল চত্বরে আবাহনীর আগমন ছিল আশীর্বাদ। ক্লাবটি দেশের ফুটবলের চেহারা পাল্টে দিয়েছে অল্প সময়ের মধ্যে। প্রথম থেকেই প্রাধান্য বিস্তার করে সেরা হয়ে ফুটবল খেলেছে। আবাহনীর মাঠে আগমনের সাড়ে চার দশকেরও বেশি পরে নির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং কমিটমেন্টের মাধ্যমে ফুটবলে এসেছে বসুন্ধরা কিংস। দেশের বৃহৎ করপোরেট গ্রুপ বসুন্ধরার পৃষ্ঠপোষকতায় ক্লাব। বসুন্ধরা কিংসের ফুটবলে আগমন সময়ের প্রয়োজন এবং দাবিতে। ক্লাবটির প্রথম থেকেই লক্ষ্য ছিল ভালো ফুটবল খেলা। মাঠে আবার দর্শক টানার আকর্ষণীয় ফুটবল উপহার দেওয়া। দেশের ফুটবলকে অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে অবদান রাখা। মাঠে বসুন্ধরা কিংসের খেলা এবং দেশের ফুটবলে ক্লাবের ভূমিকা প্রথম থেকেই বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করেছে। বিশ্লেষক হিসেবে মনে করি, আবাহনীর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্লাবটি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে। কমিটমেন্টগুলো পূর্ণ করছে। ফুটবল চত্বরে সঠিক ভূমিকা পালনের পেছনে আছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ ও টিম ম্যানেজমেন্টের পেশাদারি মনোভাব, খেলার প্রতি ভালোবাসা, আন্তরিকতা, শৃঙ্খলা, দূরদৃষ্টিতা এবং নতুন সংস্কৃতির বাস্তবায়ন। এই ক্লাব থেকে যেটি অনুকরণীয় তা হলো পেশাদার মানসিকতা। আর এই মানসিকতা পোষণ করে স্থানীয় ফুটবলার ও কর্মকর্তারা এগিয়ে এলে দেশের ফুটবল পরিবেশ বদলাবে।

ক্লাব হলো ফুটবলের প্রাণ। ফুটবল লালন-পালন করে। ক্লাব যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে দেশের ফুটবলের সমস্যার সমাধান কঠিন নয়। পরিবর্তনের বিকল্প নেই। পরিবর্তন আসবে, আসতে হবে—আগে বা পরে।

আগামী ফুটবল মৌসুম বসুন্ধরা কিংসের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং ঘটনাবহুল। ক্লাবকে লড়তে ফেডারেশন কাপ, লিগ শিরোপা, নারী ফুটবলের লিগ শিরোপা হ্যাটট্রিক অর্জনের জন্য। পাশাপাশি আছে এএফসি কাপে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নের বাস্তবায়নের সর্বাত্মক চেষ্টা। কথাগুলো ক্লাবের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির জন্য বলছি না—এসব তো ক্লাবের নিজস্ব কমিটমেন্ট ভক্ত, সমর্থক, ফুটবলপিপাসু দেশবাসী এবং বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতি। ফুটবলে সাফল্যের ক্ষেত্রে ‘এ থেকে জেড’ পর্যন্ত আগাম প্রস্তুতি সবচেয়ে বেশি জরুরি। জরুরি ‘প্রয়োজনকে’ চিহ্নিত করা।

গত ১১ আগস্ট কালের কণ্ঠে বসুন্ধরা কিংস চার ম্যাচ হাতে রেখে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস শিরোনামে উপসম্পাদকীয়তে ক্লাবের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে খেলোয়াড়, কোচ, ক্লাব কর্মকর্তা ও টিম ম্যানেজমেন্ট এবং এই নতুন দলটির দেশের ফুটবলে অবস্থান ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছি। উল্লেখ করেছি ক্লাবটির অবস্থান আগামী দিনে সমর্থ ও ভক্তদের দৃষ্টিতে কী হওয়া উচিত? কেন মানুষ অন্য ঘর থেকে বের হয়ে বসুন্ধরা কিংসের ঘরে আসবে? আবারও চ্যাম্পিয়ন দলের সব খেলোয়াড়, কোচ, ক্লাব কর্মকর্তা এবং টিম ম্যানেজমেন্টকে অভিনন্দন। এবারের চ্যাম্পিয়নশিপ একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা মাঠে এবং মাঠের বাইরে বাস্তবায়নের ফসল। সবাই চেয়েছে, চেষ্টা করেছে বলেই বসুন্ধরা কিংস চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পর পর দুইবার। আগামী দিনে আরো বড় চ্যালেঞ্জ ক্লাব প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর সহকর্মীদের। আগামী মৌসুমের জন্য আগাম শুভেচ্ছা। অনেক দূর যাওয়ার আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে ক্লাব কর্তৃপক্ষকে কাজে নামতে হবে। দেশের ফুটবলের জয় হোক।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



সাতদিনের সেরা