kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কাজ নেই, পুঁজি নেই

রমজানদের কষ্টের দিন ফুরাবে কবে

ফারজানা লাবনী   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:২৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রমজানদের কষ্টের দিন ফুরাবে কবে

করোনা অতিমারির শুরুতে গত বছরের এপ্রিলে রাজধানীর মিরপুর ১৩ নম্বরের সাজ ফ্যাশন টেইলার্সের কর্মী মো. রমজান ছাঁটাই হন। কিছুদিন নানাভাবে আয়-রোজগারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। বাধ্য হয়ে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামে ফিরে যান। খুলনার ফুলতলা উপজেলার গ্রামের বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ মা-বাবার খরচ রমজানই দিতেন। ফলে তাঁর কাজ হারানোয় বলা চলে দুটি পরিবার আতান্তরে পড়ে।

এ পরিস্থিতিতে এলাকায় নিজেই একটা টেইলার্স খোলার উদ্যোগ নেন রমজান, কিন্তু শূন্য হাত। চেষ্টা করেও ব্যাংক থেকে ঋণ জোগাড় করতে পারেননি। ফলে এখনো কষ্টের দিন ঘোচেনি রমজান ও তাঁর পরিবারের।  

করোনাকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ছাঁটাই হয়ে এক কোটি ৬৮ লাখের বেশি মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছে। রমজান তাদের একজন। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সংখ্যা পাওয়া যায় বলে জানান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

ব্যবসায় লোকসানে পড়ে বা চাকরি হারিয়ে রমজানদের মতো দুই কোটির বেশি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমায় এসেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, লোকসানে পড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের (এসএমই) অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সহায় পাচ্ছে না। রমজানদের মতো গ্রামে ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগ এখনো বেকার। তাঁরা নিজেরাও পুঁজির অভাবে কিছু করতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিআইএন ইত্যাদি) না থাকায় এসএমই খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার অর্থ পাচ্ছে না। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও ঋণ পাচ্ছে না তারা। খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই নতুন করে নিয়োগ দিচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা সংকটে পড়া অল্প আয়ের মানুষদের ব্যবসা চালিয়ে নিতে বা নতুন ব্যবসা করতে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সহজ শর্তে বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার কথা বলছেন। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের আগের কর্মীদের ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মী ফিরিয়ে নেবে তাদের জন্য সরকার বিশেষ তহবিল গঠন করুক। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকলেও প্রকৃত এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রণোদনার অর্থ পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ তাঁদের।

পিআরআই নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, কাজ হারানো অল্প আয়ের মানুষদের সঞ্চয় নেই। ব্যবসা করতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁদের পক্ষে ঋণ পাওয়াও সম্ভব হয় না। তাহলে এসব মানুষ কিভাবে সংসার চালাবেন—এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করেছে তাদের সরকারের বিশেষ সুবিধা দিয়ে করোনার আগের লাভজনক অবস্থায় দ্রুত ফিরিয়ে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শর্ত থাকবে যে ছাঁটাই করা কর্মীদের আবার ফিরিয়ে নিলেই এসব সুবিধা পাবে।

দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। মোট শিল্প খাতের ৯০ শতাংশই এসএমই। ঋণ বিতরণ সম্পর্কিত এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের শিল্প থেকে রাজস্ব আদায় ৬৬ শতাংশ কমেছে, ৭৬ শতাংশ পণ্য অবিক্রীত আছে। এই খাতের ৪২ শতাংশ কর্মীকে আংশিক বেতন দেওয়া সম্ভব হলেও ৩৪ শতাংশকে বেতন দেওয়া যায়নি।

তবে করোনায় সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে উঠতে এসএমই খাতের জন্য এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে গত ৩০ জুন পর্যন্ত এই অর্থের মাত্র ২৭৬ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বিরতণ করা সম্ভব হয়েছে।

ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিআইএনসহ ব্যবসা পরিচালনার প্রমাণ হিসেবে অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় অনেক এসএমই প্রতিষ্ঠান ঋণ বা প্রণোদনার অর্থ পাচ্ছে না বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। এ ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ, এসএমই প্রতিষ্ঠানে ঋণ বা প্রণোদনার অর্থ দিতে হলে এত কাগজপত্র জমা দেওয়ার শর্ত রাখা যাবে না।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে প্রকৃত ছোট ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ আছে। তাই ব্যবসায়ী সংগঠনের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকলেও প্রকৃত এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রণোদনার অর্থ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

আর প্রতিটি উপজেলায় টিএনও, নির্বাচিত প্রতিনিধি, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, মসজিদের ইমামসহ কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই কমিটি আর্থিক সংকটে থাকা শহর থেকে ফেরা বেকারদের কাছে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেবে। এতে বেকার ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান হবে। তাঁদের পরিবারের কষ্টের দিনের অবসান হবে। কমিটির মাধ্যমে সহায়তা দিলে দুর্নীতি করার সুযোগও কম থাকবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।



সাতদিনের সেরা