kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

আট লাখ কেজি কাঁচামালে ১০ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি

ফরিদ আহমেদ    

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৪:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আট লাখ কেজি কাঁচামালে ১০ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি

বন্ড দিয়ে আনা পণ্যের শর্ত ভেঙে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান ফরচুন সুজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে বন্ড দিয়ে আনা কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদন করা জুতা বিদেশে রপ্তানির কথা বললেও গত চার বছরে অন্তত সাড়ে আট লাখ কেজি কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে ফরচুন সুজ সরকারের অন্তত ১০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

ফরচুন সুজ লিমিটেড বিদেশে রপ্তানির শর্তে বন্ডের আওতায় বিনা শুল্কে কাঁচামাল এনে বিভিন্ন ধরনের জুতা উৎপাদন করে। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুতা তৈরির জন্য আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল ২০২০ সালের ১ জুলাই অনুযায়ী, বন্ড রেজিস্টারে যে পরিমাণ মজুদ থাকার কথা, তা নেই। খুলনা কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটের সরেজমিন অডিট এবং শুল্ক গোয়েন্দার বিশেষ অডিটে প্রতিষ্ঠানটির এ জালিয়াতি ধরা পড়ে।

জালিয়াতি নিয়ে খুলনা কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেট ও শুল্ক গোয়েন্দার করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরচুন সুজ নির্দিষ্ট পরিমাণ কাঁচামাল গুদামে প্রদর্শনে ব্যর্থ  হয়েছে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি মোট আমদানি করা কাঁচামাল উৎপাদনে ব্যবহার না করে আট লাখ ২৩ হাজার ৩৫৫ কেজি কাঁচামাল বিধিবহির্ভূতভাবে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে বাণিজ্যিকভাবে আমদানিকারকরা বন্ডের বাইরে এই কাঁচামাল আমদানি

করলে সরকারের যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হতো, তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার। এ অবস্থায় খোলাবাজারে বিক্রি করা কাঁচামালের ওপর স্বাভাবিক হারে শুল্ককর বাবদ আট কোটি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা আদায়যোগ্য।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ফরচুন সুজ ২০১৭-১৮ মেয়াদে  ৬০টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ৪০ হাজার ১৮০ কেজি, ২০১৮-১৯ মেয়াদে ১৩টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে আট হাজার ৯২৬ কেজিসহ মোট ৪৯ হাজার ১০৬ কেজি কাঁচামাল আমদানি করে। কিন্তু বন্ড রেজিস্ট্রার ঘেঁটে এই কাঁচামালের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ থেকে প্রমাণিত, প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে, যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য এক কোটি ৪১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এই কাঁচামালের ওপর সরকারের আরোপিত শুল্ককরের পরিমাণ প্রায় এক কোটি ৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এ শুল্ককর সরকারকে পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে ফরচুন সুজ।

এ ছাড়া ফরচুন সুজের ২০১৭-২০১৯ মেয়াদে সাতটি বিল অব এক্সপোর্ট বাতিল করা  হয়। এ কারণে সাত হাজার ৩৩০ জোড়া জুতা বন্ডের শর্ত মেনে নির্দিষ্ট সময়ে রপ্তানি করতে পারেনি। এ পণ্য পরে রপ্তানির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যও দিতে পারেনি সরকারকে। ফলে এই সংখ্যক জুতা উৎপাদনে বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামালের অপব্যবহার করা হয়েছে। আর এই কাঁচামালের ওপর আরোপিত শুল্ককর বাবদ ৩৬ লাখ ছয় হাজার টাকা ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ফরচুন সুজ ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ মেয়াদে ৩৫ বা তার নিচের মাপের তিন লাখ ৮৯ হাজার ২৭২ জোড়া জুতা রপ্তানি করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সরকার থেকে ৩৬ বা তার বেশি মাপের জুতা উৎপাদন করে রপ্তানি করবে বলে অনুমোদন নেয়। এ ক্ষেত্রে ছোট মাপের জুতা উৎপাদন করে কাঁচামাল কম ব্যবহার করা হয়েছে। উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামাল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অব্যবহৃত কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করে শুল্ককর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে এক কোটি আট লাখ ২০ হাজার টাকা।

জানা গেছে, ফরচুন সুজ লিমিটেড ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে রপ্তানি এবং রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসনের পক্ষে রপ্তানি প্রত্যাবাসন সনদ, সংশ্লিষ্ট দলিল, পরিদর্শনকালে বন্ডেড ওয়্যার হাউসের কাঁচামালের পরিমাণ পুনর্যাচাই এবং কিছু কিছু আমদানি করা কাঁচামাল বন্ড রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ না করায় প্রতিষ্ঠানটির সিইও  মাহবুবুল আলমকে নিয়ে এনবিআরে ২০২০ সালের ২০ আগস্ট গণশুনানি হয়। ওই সময় বন্ডের কাঁচামালের হিসাব অর্থাৎ বন্ড রেজিস্টারে কাঁচামালের হিসাব নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি সঠিক জবাব দিতে পারেননি।

এরপর ওই বছরের ২৮ আগস্ট কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে হাজির হয়ে বক্তব্য দেন সিইও মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন মেয়াদে মোট ১৫টি পণ্য চালান বাতিল হয়। এর মধ্যে আটটির বিল অব এন্ট্রি পরে অন্য বিল অব এক্সপোর্টের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। বাতিল অন্য সাতটি বিল অব এক্সপোর্টের জুতা বন্ড গুদামে রাখা আছে। পরে এসাইকুডা ওয়াল্ড সিসটেমে এসব বাতিল করা বিল অব এক্সপোর্টের এলসির মেয়াদ যাচাই করা হলে দেখা যায় সব এলসির মেয়াদোত্তীর্ণ। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের মন্তব্য, প্রতিষ্ঠানটি যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য রপ্তানি করতে পারেনি এবং এলসির মেয়াদোত্তীর্ণ, তাই প্রতিষ্ঠানটি সাত হাজার ৩৩০ জোড়া জুতা উৎপাদনে ব্যবহৃত বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামালের অপব্যবহার করেছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ফরচুন সুজ লিমিটেড  বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করায় কাস্টমস আইন ১৯৬৯ এর ধারা ১৩(২), ৮৬, ৯৭,১১ এবং বন্ডেড ওয়্যার হাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা ২০০৮-এর প্রদত্ত শর্তগুলো লঙ্ঘিত হয়েছে। এ অবস্থায় একই আইনের ধারা ১৩(৩) অনুযায়ী, ১০ কোটি ৬৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা আদায় এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্ড লাইসেন্স হলো সরকারের আমানত। এই আমানত নিয়ে কেউ যদি তা ভঙ্গ করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে লাইসেন্স বাতিল করে জরিমানা করার বিধান আছে।

তিনি বলেন, ফরচুন সুজ যদি বন্ড লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে, তাহলে তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরচুন সুজের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।



সাতদিনের সেরা