kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৯ ডিসেম্বর ২০২১। ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

মাদক কারবার চালাতে তাঁরা পরিবহন পেশায়!

সাজ্জাদ হোসেন   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:৪১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মাদক কারবার চালাতে তাঁরা পরিবহন পেশায়!

প্রকাশ্যে তাঁরা পরিবহন শ্রমিক, কিন্তু আড়ালে জড়িয়ে পড়েছেন ভয়াবহ কারবারে। নিজেদের পরিবহন, নিজেরাই স্টাফ! তাই পুলিশও একটু কম সন্দেহ করে। এই সুযোগই নিচ্ছেন তাঁরা। মাদক বা অন্য চোরাই দ্রব্য লুকিয়ে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিয়ে যান তাঁরা। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের অনেকে পরিবহন পেশায় এসেছেন মাদক কারবারের লক্ষ্য নিয়ে।

গত ২ সেপ্টেম্বর, রাত আনুমানিক ৯টা। টহলে ব্যস্ত রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই নিয়াজ মোহাম্মদ শরীফ। হঠাৎ তাঁর কাছে গোপন সূত্রে খবর আসে যে এক মাদক কারবারি বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডের সোহাগ পরিবহনের কাউন্টারে অবস্থান করছেন। দ্রুত তথ্যটি ওসিকে জানান নিয়াজ। পরে ওসির নির্দেশে এসআই মো. শাহীন মোল্লাসহ ফোর্স নিয়ে সেখানে অভিযান চালান তিনি। কিন্তু কাউন্টারে উপস্থিত সাধারণ যাত্রীদের বারবার তল্লাশি করেও কোনো কিছু না পেয়ে যখন পুলিশ হতাশ তখন হঠাৎ বাসের এক কর্মচারীর আচরণে সন্দেহ হয় পুলিশের। পরে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতেই ভেঙে পড়েন ওই পরিবহন শ্রমিক। এক পর্যায়ে তাঁর কোমরে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা দুই হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। 

এসআই নিয়াজ শরীফ জানান, অভিযানে গ্রেপ্তার ওই মাদক কারবারির নাম জসিম উদ্দিন। জসিম ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে সুপারভাইজর হিসেবে কাজ করেন। এই কাজের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার থেকে ইয়াবা এনে ঢাকায় পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করেন। জসিমের বিরুদ্ধে মামলা করার পর তাঁকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রিমান্ডে তিনি আরো কয়েকজন পরিবহন শ্রমিকের ইয়াবা পাচারের তথ্য দিয়েছেন। সেসব ব্যক্তিকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

শুধু ইয়াবা নয়, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ সব ধরনের মাদকদ্রব্যের পাশাপাশি স্বর্ণপাচারেও জড়িত অনেক পরিবহন শ্রমিক। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতে পাচারের সময় সোহাগ পরিবহনের বাস থেকে সাড়ে চার কোটি টাকার স্বর্ণসহ তিনজনকে আটক করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। আটক করা হয় গাড়িচালক শাহাদাৎ হোসেন, চালকের সহকারী ইব্রাহিম ও বাসের সুপারভাইজর তাইকুল ইসলামকে।

এ বিষয়ে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মো. আব্দুর রউফ জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া সোহাগ পরিবহনের ওই বাসে অভিযান চালিয়েছিলেন গোয়েন্দারা। এ সময় বাসের চালকের আসনের নিচে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় সাড়ে ছয় কেজিরও বেশি ওজনের ৫৮টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এসব স্বর্ণ বিদেশ থেকে এনে বাংলাদেশে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে পাশের দেশ ভারতে পাচার করা হচ্ছিল। এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল যাত্রীবাহী বাস। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে অন্যান্য স্থানে ইয়াবা পৌঁছে দিলে একেকটি বড়ির জন্য সাত থেকে ১০ টাকা করে পান পরিবহনকারী। পরিবহন শ্রমিকরা নিজেরাই চোরাচালানে জড়িত হয়ে পড়ায় তা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য। কারণ যানবাহন সম্পর্কে শ্রমিকদেরই সবচেয়ে বেশি জানাশোনা থাকে। তাই তাঁরা খুব সহজেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিতে পারেন।

শুধু মাদকদ্রব্য কিংবা স্বর্ণই নয়, অনেক সময় জাটকা, কচ্ছপসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্য চোরাচালানেও অনেক পরিবহন শ্রমিক জড়িয়ে পড়ছেন বলে জানান পরিবহনকর্মী বিভাস চন্দ্র। ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটের একতা পরিবহনের এই সুপারভাইজর বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের শ্রমের তুলনায় আয় অনেক কম। প্রতি টিপে একজন সুপারভাইজর ৬০০ টাকা পান, আর হেল্পারের ভাগ্যে জোটে আরো কম। বর্তমানে যানজটের কারণে একটি ট্রিপে স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক বেশি সময় লাগে। এ ছাড়া মাসে একজন শ্রমিক ১৫টার বেশি ট্রিপও পান না। তাই কিছু শ্রমিক বেশি আয়ের আশায় চোরাকারবারিদের প্রলোভনে পা দেন। তবে  বাবুল মিঞা নামের এক চালক জানালেন ভয়ংকর তথ্য। বর্তমানে পিকআপ চালালেও কিছুদিন আগে কক্সবাজার-ঢাকা রুটে বাস চালাতেন তিনি।

বাবুল মিঞা বলেন, ‘বেশির ভাগ সময় চোরাকারবারিরাই পরিবহন শ্রমিকদের এই কাজে জড়াতে বাধ্য করেন। কেউ টাকার বিনিময়ে এই কাজ করতে না চাইলে তাঁকে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করা হয়। এসব ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কিছুই করার থাকে না। আমি নিজেও বিভিন্ন সময় এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছি। অবশেষে বাধ্য হয়েই কক্সবাজার রুটে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, “বেশির ভাগ পরিবহন শ্রমিকেরই ‘দিন আনে দিন খায়’ অবস্থা। দুই দিন কাজ না করলে অনেক শ্রমিকের ঘরে চুলা জ্বলে না, কিন্তু কিছু শ্রমিককে দেখি দুটি ট্রিপ মেরে সারা মাস রাজার হালে চলেন। অবৈধ আয় না থাকলে এটা সম্ভব নয়।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী অনেক বাসেই স্বর্ণ ও ইয়াবা পাচার করা হয়। কখনো কখনো এসব কাজের সঙ্গে গাড়ির স্টাফও জড়িত থাকে। আমরা যখনই এমন ঘটনার খবর পাই, তত্ক্ষণাৎ জড়িত শ্রমিকদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিই। একই সঙ্গে ওই জড়িতদের চাকরিচ্যুত করি।’ এখানে বাস মালিকদের কোনো অপরাধ নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘চোরাচালান রোধে মাঝেমধ্যেই আমরা বাসের ম্যানেজারসহ স্টাফদের সাবধান করে দিই।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, ‘যেসব পরিবহন শ্রমিক চোরাকারবারে যুক্ত হন আমরা তাঁদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করি। সম্ভব হলে পুলিশে ধরিয়ে দিই।’ তিনি আরো বলেন, কোনো ব্যক্তির এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কাজের দায় বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন নেবে না। যেসব পরিবহন শ্রমিক এসব কাজ করেন তাঁদের রিমান্ডে নিতে হবে। জানতে হবে কে তাঁকে দিয়ে এই কাজ করায়? শুধু চুনোপুঁটি না ধরে পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা যাতে কোনো অপরাধমূলক কাজে না জড়ান, সে জন্য আমরা মাঝেমধ্যেই সব টার্মিনালে মাইকিং করি, তাঁদের বারবার সাবধান করি। এ ছাড়া আমরা শ্রমিকদের নিয়ে সাধারণ সভা করি, বৈঠক করি। এসব কাজের মাধ্যমে আমরা শ্রমিকদের সচেতন করি।’ এ সময় পরিবহন শ্রমিকদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, যারা চোরাকারবার বা অসৎ কাজের সঙ্গে জড়াবে, বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন তাদের কোনো দায়িত্ব নেবে না।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং বিভাগের ডিআইজি মো. হায়দার আলী খান বলেন, কোনো পরিবহন শ্রমিককে যদি চোরাকারবারিরা নিজেদের কাজ করতে হুমকি দেন, তাহলে শ্রমিকরা যেন পাশের পুলিশ স্টেশনে বিষয়টি জানান। এ ছাড়া জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯-এ অভিযোগ জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। তিনি জানান, পরিবহন শ্রমিকরা যাতে চোরাকারাবারিদের মতো অপরাধে জড়িয়ে না পড়েন সে জন্য নিয়মিত সভা ও সেমিনারের আয়োজন করে পুলিশ। এ ছাড়া পুলিশের বিভিন্ন বিভাগ চোরাকারবার প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চালায়।



সাতদিনের সেরা