kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ইভানার মৃত্যু : নেপথ্যে আইনজীবীর সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক?

অনলাইন ডেস্ক   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২০:০৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইভানার মৃত্যু : নেপথ্যে আইনজীবীর সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক?

রাজধানীর শাহবাগের পরীবাগে বহুতল বিশিষ্ট দুই ভবনের মাঝ থেকে ইভানা লায়লা চৌধুরী (৩২) নামে এক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। বুধবার বিকেলে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি মিরপুরের স্কলাস্টিকা স্কুলে ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সিলর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

ইভানার মৃত্যুর পর তার বাবা আমান উল্লাহ চৌধুরী জানান, গত বুধবার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হয়। খবর পেয়ে দুপুরে তিনি ওই বাসায় যান। তবে বাসায় যাবার পর ইভানাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তাকে দুই ভবনের মাঝে পড়ে থাকতে দেখা যায়। 

ইভানাকে উদ্ধারকারী শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্বাস আলী গণমাধ্যমকে বলেন, 'জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে আমি ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে দুটি ভবনের মাঝে ওই নারীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। এরপর তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক ইভানাকে মৃত ঘোষণা করে।' তিনি আরো বলেন, 'আমি অবাক হলাম, ওই নারীর পরিবারের কেউ মরদেহের সঙ্গে এলো না। মনে হলো তাদের কোনো অনুভূতিও নেই। আমরাই তার মরদেহ নিয়ে এলাম। বিষয়টি একটু অন্যরকম ঘটনা মনে হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি।'

স্বামীর সঙ্গে ইভানা।

এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা এই বিষয়ে কেউ কোনো ধারণা দিতে পারছে না। এই কর্মকর্তা বলেন, 'তদন্ত হবে নিরপেক্ষভাবে। পেছনে কোনো ঘটনা থাকলে সেটিও তদন্তে বের হয়ে আসবে।' তবে শাহবাগ থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার জানান, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারী ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক কলহের কারণে তিনি এ ঘটনা ঘটাতে পারেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। পুরো বিষয় তদন্ত করে ও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

ঘটনার পর ওই নারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি স্ক্রিনশট কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। একটি স্ক্রিনশট ওই নারীর ফেসবুক কমেন্টের। সেখানে তিনি তার স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা রয়েছে বলে জানান। সেই কমেন্টে ইভানা লেখেন, তুমি খুব ভাগ্যবান যে, তোমার স্বামীকে তুমি পাশে পেয়েছ। আমার দ্বিতীয় সন্তান অটিজমের শিকার, তার বিকাশ ঘটেছে দেরিতে। আমার নাবালক সন্তানের চ্যালেঞ্জগুলো আমাকে ধৈর্য্যশীল করেছে কিন্তু তার বাবার হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় আমার স্বামী একজন নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন।

তিনি আরো লেখেন, ওই নারীর একটি ছেলে সন্তানও আছে।.. জীবনটা একটি কঠিন জার্নি, বিয়ের ১০ বছর পর আমার উপলব্ধি হলো, সত্যিই নিঃশ্বাস নিতে পারা কষ্টকর। আমি সিঙ্গেল জীবন কাটাব তার জন্য প্রস্তুত নই। আমার দুই সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় আমি নেই। কেননা আমাদের সমাজ সব সময় ছেলেদের পক্ষে। আমি আজ এখানে লিখছি, এক মাস হাসিমুখে থাকার পরও আমি মৃত্যুকে মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আমার ছোট সন্তান আমাকে মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরিয়ে আনছে। এই অবুঝ শিশুদের মধ্যে অদ্ভুত শক্তি রয়েছে!

আরো একটি স্ক্রিনশটেও দেখা যায়, তিনি একজনকে বলছেন, তার স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা। সেখানে তিনি জানান, তার স্বামী এবং তার সন্তানের বাবা এক নারী আইনজীবীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জাড়িয়েছেন। তারা অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। এই নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত। এ কারণে তিনি আত্মহত্যার কথাও ভাবছেন বলে লেখেন। তহালে কি স্বামীর পরকীয় সম্পর্কের জন্যই প্রাণ গেল স্কলাস্টিকা স্কুলের ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সিলর ইভানা লায়লা চৌধুরীর?

স্বামীর সঙ্গে ইভানা

স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়াও হতো। ইভানাকে মারধরও করতেন তার স্বামী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী গণমাধ্যমকে বলেন, ইভানাকে চিনতাম। আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বছরখানেক হলো ইভানাকে মানসিকভাবে দুর্বল মনে হতো। কথাবার্তা কম বলত। একদিন তার কাছে ঘটনা জানার চেষ্টা করেছি। তখন সে জানায়, তার স্বামী ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ মাহমুদ হাসান ওরফে রুম্মান অন্য এক নারীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এ নিয়ে সংসারে ঝামেলা যাচ্ছে। রুম্মান এই কারণে ইভানাকে সহ্য করতে পারত না। মাঝেমধ্যে ইভানার গায়ে হাত তুলত। তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও করত।

ইভানা তার স্বামী-সন্তানদের নিয়ে পরীবাগের ২/ক/১৪ ভবনের ফ্লাট-৫ এ থাকতেন। ওই ভবনের এক বাসিন্দা বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ইভানা চিৎকার করত। চিৎকার করে তার স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে শুনেছি। কান্নাকাটিও করতে শুনেছি। এ জীবন তিনি আর রাখবেন না বলেও শুনেছেন। ইভানা বলত, আমাকে ঘরে রেখে আরেক মেয়ের সঙ্গে প্রেম কর, এর পরিণাম ভালো হবে না। রুম্মানও তখন বলতেন, তুই এই বাড়ি থেকে চলে যা। খুব ভালো থাকতে পারব। এমনকি ঘটনার দিন সকালেও তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়েছে।

ওই নারী মৃত্যুর পর একটি অপমৃত্যুর মামলা হয় শাহবাগ থানা। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মওদুদ হাওলাদার বলেন, ইভানার মৃত্যুর বিষয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। সেটিকে ধরে আমরা তদন্ত করছি। অনেকেই এই মৃত্যুর পেছনে রহস্য আছে বলে দাবি তুলেছেন। আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এলে আমরা আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করব।

এ বিষয়ে জানতে কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে আব্দুল্লাহ মাহমুদ হাসানের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ওপ্রান্ত থেকে সংযোগটি কেটে দেওয়া হয়।



সাতদিনের সেরা