kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

জাতিসংঘে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি

জয়ন্ত ঘোষাল   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৪:২৩ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



জাতিসংঘে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠক আসন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের হাডসন নদীর তীরে জাতিসংঘের বিশাল সদর দপ্তর। সেই দপ্তরে সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটা সাইডলাইন বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এই বৈঠকটা যাতে হয় সে জন্য দুই দেশের কূটনীতিকরা এখন সক্রিয়। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সময় এই দ্বিপক্ষীয় সাইডলাইন বৈঠক অবশ্য কয়েক দশক ধরেই দস্তুর হয়ে উঠেছে। কিন্তু অন্যবারের তুলনায় এবারের বৈঠকের তাৎপর্য আলাদা। যখন আফগানিস্তানে নতুন তালেবান সরকার গঠিত হলো এবং বহু বছর পর আবার তালেবান আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করল, যখন চীন-পাকিস্তান অক্ষ আরো মজবুত হয়ে উঠেছে, যখন মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর অদূর ভবিষ্যতে সেই সেনাবাহিনীর ফের এই অঞ্চলে মোতায়েন হওয়ার সম্ভাবনা কম, যখন ইরান-তুরস্কের মতো দেশগুলো আফগানিস্তানে নতুন সরকারকে বৈধতা দিচ্ছে, সেই রকম একটা সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দুটি দেশের কাছেই। বিশেষত বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রশ্ন—সার্বভৌম বাংলাদেশ ভারতের পাশাপাশি চীন ও পাকিস্তানের নয়া সমীকরণ নিঃশর্তে তাল মিলিয়ে চলবে কী চলবে না? সার্বভৌম বাংলাদেশ ভারতের পাশাপাশি কেন চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক তৈরি করবে না? এই প্রশ্ন যখন বাংলাদেশের জনসমাজের একটা বড় অংশের মধ্যে রয়েছে, সেইভাবে ভারতের একটা বিপুল জনসমাজ মনে করছে যে এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে কোনোভাবেই অসন্তুষ্ট করা ভারতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তখন চীন পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল, বাংলাদেশ নামের নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনকে সমর্থন করেনি। কিন্তু চীন ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে একটা ‘বাস্তববাদী’  (Pragmatic) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে শুরু করে এবং বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে একটা দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে, যখন খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি চীন সফরে যান। সেই আমব্রেলা ডিফেন্স কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়ে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। চীন হলো সেই প্রথম দেশ, যারা বাংলাদেশের সঙ্গে একটা ব্রডবেইস প্রতিরক্ষা সহায়তায় যায়। খালেদা জিয়া এখন ক্ষমতায় নেই; কিন্তু শেখ হাসিনা চীনের সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পর্ক রক্ষা করেছেন। জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময় শক্তিশালী যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল সেটার সঙ্গে অবশ্য এই সম্পর্কের অনেক তফাত রয়েছে কূটনৈতিক দিক থেকে। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে চীনের উৎসাহটা ক্রমেই বেড়েছে। বিশেষ করে এখন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে (Belt and Road Initiative) কার্যকর করার জন্য বাংলাদেশের সাহায্য বিশেষভাবে চীনের প্রয়োজন। নতুন যে মেরিটাইম এরিয়া সেটা বাংলাদেশকে হ্যান্ডওভার করা হয়েছে এবং তা করা হয়েছে  ‘ITLOS’ ভারডিক্টের পর এবং সেটা একটা সম্ভাবনা তৈরি করেছে। চীন থেকে বাংলাদেশেও অনেক জ্বালানি  (energy) রপ্তানি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীন এ ব্যাপারেও বাংলাদেশের সঙ্গে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এখন চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেমন আছে, তেমনি ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের একটা জটিল প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাঁরা যখন সামরিক অস্ত্রশস্ত্র কেনাকাটা করেন, তাঁদের কাছে সব সময় সেটার দাম বড় ফ্যাক্টর নয়, একটা ‘স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট অব ভিউ’ তাঁরা মাথায় রাখেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে চীনের যে অস্ত্র এবং ভারতের যে অস্ত্র, তার মধ্যে ওয়েপন  (weapon) সিস্টেমের যে আধুনিকীকরণ তাতে চীন অনেক বেশি এগিয়ে গেছে বলেও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ভারতেও অনেক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অন্য দেশ থেকে ভারত এখনো অস্ত্রশস্ত্র আমদানি করছে। ভারতের আরো দ্রুত প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত তখনই অনেক বড় রপ্তানিকারক দেশ হয়ে উঠতে পারবে, যখন নিজেদের প্রতিরক্ষা রসদ অনেকটা বাড়িয়ে তুলতে পারবে এবং আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স—এসব দেশের কাছ থেকেও তাদের নির্ভরশীলতাটা কমাতে পারে। ভারতই যদি বিদেশের কাছ থেকে সেসব আমদানি করে, তাহলে বাংলাদেশ কেন সেটা সরাসরি করতে পারবে না। এটা কিন্তু বাংলাদেশেরও অনেক প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের অভিমত। এখন এই চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্কে একদিকে কূটনৈতিক, অন্যদিকে প্রতিরক্ষার যেদিক সেখানে তার একটা ইতিহাসও আছে। ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের বেশ কিছু মেরিটাইম চুক্তি হচ্ছে। মিয়ানমারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের যে চুক্তি ও বোঝাপড়া, সেখানে বাংলাদেশও মিয়ানমার ও ভারতের একটা সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার যে অভাব সেখানে বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এবং সেই কারণে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে একটা বড় রকমের বরাদ্দ সব সময় রাখছে। তার কারণটা হচ্ছে, পাকিস্তানের মধ্যেও নানা রকমের শক্তি কাজ করছে এবং এখন বিশেষ করে আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠনের পর যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে বাংলাদেশকেও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আরো উন্নত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরও বাংলাদেশের জনসমাজের মধ্যে ভারতবিরোধী কোরাস তৈরি হয়েছিল। শেখ হাসিনা ইসলামিস্ট র‌্যাডিক্যাল, লস্কর-ই-তৈয়বা, জইশ-ই-মোহাম্মদ, হুজি, জেএমবি সব মডিউলকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন এবং ভারত তাকে সমর্থন জানায় এবং ভারতবিরোধী কার্যকলাপের কারণে বাংলাদেশের মাটি কাজে লাগানো হবে না—এই আশ্বাসও শেখ হাসিনাই দিয়েছিলেন। একটা কাউন্টার টেরর টাস্কফোর্স করার কথা শেখ হাসিনা বলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচনে তাঁর জয়ের পর ২০১০ সালে ভারতে আসেন। সেই সময়ও বাংলাদেশের ভেতরে জনসমাজের একটা অংশ, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দাবি তুলেছিল যে শেখ হাসিনা যেন প্রথমে চীন সফরে যান। কেন তিনি ভারত সফরে যাবেন? প্রথমে চীন নাকি ভারত—এই প্রশ্ন পেন্ডুলামের মতো বাংলাদেশের রাজনীতিতে বারবার ঘুরেফিরে আসে।

শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশকে তাঁর নিজের মতো করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, সেই সময়ে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার গঠনের পর এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গোটা উপমহাদেশে। সেখানে ভারত মনে করছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটা আরো দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসেন এবং তার পর থেকে কিন্তু বিজেপি দেশে অনুপ্রবেশের বিষয়ে, নাগরিকত্ব বিল নিয়ে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কের ভিত্তিতে জঙ্গিসংগঠনগুলো দমনের জন্য বাংলাদেশবিরোধী প্রচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কালো ছায়া যে ফেলেছে সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ সব সময় ভারতের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে, এমনকি এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় শুধু নরেন্দ্র মোদি চেয়েছিলেন বলেই মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতার যে আদিবাস, সেখানে বাংলাদেশ সরকার তাঁর যাওয়ার সব রকম ব্যবস্থা করে দেয়। বাংলাদেশের মধ্যে এটা নিয়ে প্রবল সমালোচনা হয় যে ভারতের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী রাজনীতির জন্য বাংলাদেশ কেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এই ধরনের সহযোগিতা করবে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এ কাজ করেছে। কিন্তু যখন দেখা যায় করোনা টিকার ক্ষেত্রে পয়সা চুকিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয় কিস্তির টিকা বাংলাদেশে পৌঁছায় না, বাংলাদেশ তখন বাধ্য হয়ে চীন কিংবা রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশ থেকে টিকা সংগ্রহ করে। পেঁয়াজের ট্রাক সীমান্তে আটকে থাকে এবং বাংলাদেশে পাঠানো হয় না, পেঁয়াজ পচে যায়; এই যে ধরনের অভিযোগ, এমনকি বিএসএফের যে ভূমিকা তা নিয়ে বারবার সমালোচনা হয়। এগুলো বাংলাদেশের জনমানসের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করে। তখন সব কিছু অবজ্ঞা করে শেখ হাসিনার পক্ষেও ভারতের সঙ্গে সখ্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে যখন শোনা যায়, চীন প্রতিরক্ষা সাহায্য ও অনুদানের ক্ষেত্রে অনেক বেশি করে এগিয়ে যেতে চাইছে বাংলাদেশের সঙ্গে, তখন হয়তো ভারতের এই বোধোদয়টা হয়েছে যে আমাদের বাংলাদেশের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা খাতে আরো অগ্রসর হতে হবে এবং সেই কারণে একটা লং টার্ম ডিফেন্স প্যাক্টের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে ভারত আগ্রহী। ভোরত ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার লাইন অব ক্রেডিট বাংলাদেশকে অফার করেছে এবং যার মধ্যে সামরিক কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট আছে। এর মধ্য দিয়ে মিলিটারি হার্ডওয়্যার কেনা হবে এবং নানা রকমের কোস্ট গার্ডের প্যাট্রলিং করার জন্য ক্রাফট, রেডার—এগুলো কেনা হবে। এখন সেই চুক্তিটা ঢাকা স্বাক্ষর করবে কি না, কবে করবে, কিভাবে করবে—সেই সব নিয়েই আলাপ-আলোচনা চলছে এবং একটা ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (Memorandum of understanding) সই করার কথা হচ্ছে এবং সেটা একটা আনুষ্ঠানিকভাবে করতে চাইছে ভারত। বাংলাদেশ ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের সঙ্গে যে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল এবং তারপর পদ্মা ও গঙ্গায় অনেক স্রোত বয়ে গেছে, এখন ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে একটা বড় ধরনের ডিফেন্স এক্সপোর্ট ও ক্রেডিট লাইন তৈরি করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এমনকি ভারত-বাংলাদেশ জয়েন্ট মিলিটারি এক্সারসাইজ

(Joint Military Exercise) শুরু হয়েছে অনেক দিন থেকেই এবং প্রথম এই এক্সারসাইজটা হয়েছিল ২০১০ সালে আসামের  ঝোড়হাটে। সেটাকেও আরো বেশি করে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে ভারত।

শেষ পর্যন্ত একটাই কথা বলার যে ভারতের উচিত দেশের ভেতরে ভোটের রাজনীতির জন্য অযথা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটা খারাপ না করা। সেটা শুধু আসাম সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বুঝতে হবে এমন নয়, সেটা বুঝতে হবে ভারত সরকারকে। আমার নিজের ধারণা, নরেন্দ্র মোদি সেটা বুঝতে পারছেন এবং আমি একটা কথা বলেই শেষ করতে চাই সেটা হচ্ছে, ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সময় নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার মধ্যে কী আলোচনা হয়, কোন দিকে যায় সেই সম্পর্কের অগ্রগতির পথ, সেটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র
বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা