kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

পাওয়ার অব শী ও চকবোর্ড এর যৌথ আয়োজনে সচেতনতামূলক ওয়েবিনার

সাইবার বুলিং ও সহিংসতা কমাতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২০:২৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সাইবার বুলিং ও সহিংসতা কমাতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে

সাইবার বুলিং ও সাইবার সহিংসতা কমাতে হলে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকেও। ঘটনা ঘটার অপেক্ষা না করে আগে থেকেই এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে। জানাতে হবে সংশ্লিষ্ট আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। সেই ক্ষেত্রে অভিযোগের বিষয়টি আরো সহজ করে ভুক্তভোগির পাশে থাকতে হবে। ব্যবস্থা নিতে হবে দ্রুত। তবেই সাইবার বুলিং ও সহিংসতা কমানো সম্ভব। গতকাল শনিবার সন্ধায় সাইবার বুলিং ও সহিংসতা প্রতিরোধে সুস্থ ও নিরাপদ ডিজিটাল স্পেস গড়ে তোলার লক্ষ্যে পাওয়ার অব শী ও চকবোর্ড এর যৌথ আয়োজনে সচেতনতামূলক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ওয়েবিনারে উপস্থিত সাইবার এক্সপার্ট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সহ চলচিত্র শিল্পী, সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রিটি এবং ক্যাম্পেইনের আয়োজকেরা তুলে ধরেন সাইবার বুলিংয়ে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট। ক্যাম্পেইনটির মিডিয়া পার্টনার হিসেবে আছে চ্যানেল ২৪।

পাওয়ার অব শী এর প্রজেক্ট চিফ সাবিনা স্যাবির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) এর চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক রাজা, এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ব্যুরো চিফ জুলহাস আলম, ডিবি সাইবার ইউনিট এর ডিসি শরিফুল ইসলাম, বাংলা ট্রিবিউনের চিফ রিপোর্টার উদীসা ইমন, সাইবার এক্সপার্ট তানভীর জোহা, একাত্তর টেলিভিশনের ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট নাজনীন মুন্নী, বিবিয়ানার স্বত্ত্বাধিকারী লিপি খন্দকার, অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা, সাংবাদিক ও লেখক পারমিতা হিম , সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার বর্ষা চৌধুরী এবং চকবোর্ড এর সিইও শাহরিয়ার বাবলা ।

আঁখি ভদ্রের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে অনলাইনের বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে। যার জন্য তৃণমূল পর্যায়ে সাইবার বুলিং সম্পর্কে জানাতে হবে। এরজন্য মাঠপর্যায়ে যেমন কাজ করতে হবে তেমনি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অনলাইনে বিভিন্ন কন্টেন্ট তৈরি করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সবাইকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইক, কমেন্টস থেকে শুরু করে সব কিছু করার আগে চিন্তা করা উচিত। এতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? তৃতীয় কেউ লাভবান হচ্ছে কি না?
 
বক্তারা বলেন, সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন থাকার কারণে যে কোন নারী, পুরুষ ও পরিবারও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে পারে। এরমধ্যে নারীরাই বেশি ভুক্তভুগি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে যত নিয়ম কানুনই থাকুক না শুরুতে বুঝতে হবে ব্যবহারকারী কেমন। এরপর পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথায় ছিলো। মূলত যে মানসিকতা নিয়ে একজন মানুষ বেড়ে উঠছে। তারই বহিপ্রকাশ পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) এর চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক রাজা বলেন,  ‘যে সমাজের কথা আমরা বলছি গণমাধ্যমও কিন্তু সেই সমাজ থেকে গড়ে উঠা। তাই ব্যতিক্রম বলতে তেমন কিছু নেই। বিপদে পড়লে মানুষ পুলিশের কাছে যেমন যায়। তেমনি গণমাধ্যমের কাছেও আসে। আবার দেখা যায়, গণমাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধিতে একটা বিষয় প্রচার করা হলো সেখানেও বাজে মন্তব্য আসছে। মূলত এদের অন্য কোন কাজ নেই। এরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে ঘুরে এসবই করে। এদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে সাইবার বুলিং বন্ধ করা যাবে না।‘

এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ব্যুরো চিফ জুলহাস আলম, ‘আমরা এমন একটা সময় পার করছি যেখানে ভালো এবং খারাপ গণমাধ্যম কোনটি সেটা বুঝতে পারছি না। সেটি না বুঝতে পারার কারণে একটা কনফিউশন তৈরি হচ্ছে। যারফলে আমরা প্রতিটা ক্ষেত্রে মিডিয়া ট্রায়াল দেখতে পাচ্ছি। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো বিশেষ করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সহযোগীতা নিচ্ছে। যার জন্যে তারা যে বিষয়টি চাচ্ছে, কখনো এটেনশন ডাইবার্ট করার জন্য। কখনো নিজেদের ক্রেডিটকে সাধারণ মানুষের কাছে খুব বড় করে উপস্থাপনের জন্য তুলে ধরা। তখন আমরা গণমাধ্যম কি করছি একজন অভিযুক্তের বেডরুমে ঢুকে যাচ্ছি বাথরুমে ঢুকে যাচ্ছি। তার প্রাইভেসি রাখতে পারছি না। এরমাধ্যমে অন্যকে পিড়ন দিয়ে আনন্দ নিচ্ছি।'

ওয়েবিনারে ডিবি সাইবার ইউনিট এর ডিসি শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন কাজ করতে গেলে সাইবার বুলিংয়ের বিষয়ে অভিযোগ পাই। বুলিংয়ের শিকার শুধু স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই হচ্ছে না প্রাপ্ত বয়স্করাও হচ্ছে। এই হয়রানিকে আমরা দুইভাবে দেখি সাইবার বুলিং এবং সাইবার স্টকার। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে সাইবার বুলিং আর প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে আমরা সাইবার স্টকার বলে থাকি। আমরা যারা ফেসবুক ব্যবহার করি। তারা স্বাভাবিকভাবে ভালোভাবে পাসওয়ার্ড দেই না। যার কারণে হ্যাকাররা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাজে বন্তব্য করতে পারে। এছাড়া করোনার মধ্যে শিক্ষার্থীরা মোবাইল তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। যার কারণে বুলিংও বেড়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানির শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভুগিরও দায় আছে। নিজের ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করে ফেলছি। নিজের ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে শক্ত পাসওয়ার্ড দিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যাতে হ্যাকিংয়ের শিকার না হয়। এছাড়া সাইবার বুলিং থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। একটা পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার দুই তৃতীয়াংশই নারী। যাদের মধ্যে আবার স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী ৪৯ শতাংশ। তাদেরই কোন বন্ধু বান্ধব ট্রল করে বা হয়রানিমূলক কিছু লিখে! এতে সে সামাজিভাবে হেয় হয়। জড়িতদের সচেতন করতে না পারলে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এর মাধ্যমে বুলিংয়ের তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা সম্ভব।‘

বাংলা ট্রিবিউনের চিফ রিপোর্টার উদীসা ইমন বলেন, ’গণমাধ্যম মোটেই এই ক্ষেত্রে কোন অবদান রাখতে পারছে না। অনেক সময় অবচেতনভাবে বুলিংয়ের পক্ষেই করে ফেলি। সেই জায়গায় অনেক কাজ করার আছে। ঘটনা ঘটার পর পরই ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি দেখতে হবে। তবে ব্যবস্থা নেওয়ার জায়গাটা যাতে সহজ করা হয়। সবাই যেনো সহজে যেতে পারে। অভিযোগ করতে পারে। আবার অভিযোগ ছাড়াও তথ্য জানানোর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলে ভালো হয়। জিডি করতেই হবে এমন একটি বাধা বাধ্যকতার বিষয়টি সহজ করা উচিত। জিডি করার পরও কিন্তু সেটিকে মামলা বা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া নারীদের জন্য সহজ হয় না। আমাদের সাইবার ক্রাইমে যারা কাজ করছে তারা অনেক কাজ করছে। কিন্তু গেলেই জিডির বিষয়টি পিছিয়ে দেয়। তাই এই বিষয়ে ভাবতে হবে।‘

পাওয়ার অব শী এর প্রজেক্ট চিফ সাবিনা স্যাবি বলেন, ‘সাইবার সচেতনামূলক ক্যাম্পেইন 'সিপ ফর চেইঞ্জ'। তৃণমূল পর্যায়ে চায়ের কাপের আড্ডা থেকেই সচেতনতা গড়ে তোলা এই ক্যাম্পেইনের মূল উদ্দেশ্য। সাইবার বুলিং ও সহিংসতার বর্তমান পরিস্থিতি এবং এর নিরাময়ের কি কি করণীয় সে বিষয়ে আলোকপাত করতেই আজকের এই ওয়েবিনার। আমরা সব সময় বলি প্রযুক্তি আমাদের জন্য আর্শিবাদ। সত্যি তাই। এরমাধ্যমে আমরা দিন রাতকে এক করে এই ধরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পেরেছি। কিন্তু প্রযুক্তিকে মিসইউজ করে জীবনটাকে একেবারে দুর্বিসহ করে তুলছি। আর করোনার মধ্যে এই মিসইউজ আরো বেড়ে গেছে। পাওয়ার অব শী বেশ কিছু কাজ করছে। যেমন নারী সাস্থ্য। এছাড়া হ্যাশ ট্যাগ পাশে আছি। মানুষের বিপদে আপদে পাশে থাকার চেষ্টা করি। সাইবার বুলিং নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি।‘

তিনি বলেন, ‘আসলে ঘটনা ঘটার পরে ব্যবস্থা নেওয়ার চাইতে ঘটনা ঘটার পূর্বে ব্যবস্থা নিলে ভালো হয়। কাজ করতে গিয়ে চক বোর্ডের কাজগুলো দেখে মনে হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে তাদের সঙ্গে কাজ করলে তৃণমূলের পর্যায়ে গিয়ে গ্রামে গঞ্জের নারীদের সচেতন করতে পারবো। মনে রাখতে হবে শুধু নারীরা না পুরুষরাও এই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। এসব থেকে উত্তরণের জন্য আমরা কতটুকু কাজ করবো। কি করবো এসব বিষয়ে জানতে হবে। সবাই মিলে কাজ করতে হবে। চকবোর্ড শিক্ষার্থীদের সংগঠন হওয়াতে তারা এগোতে পারছে না। আমরা পাশে থাকতে চেষ্টা করেছি।‘



সাতদিনের সেরা