kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সর্পদংশনে ঝাড়ফুঁক ও কুসংস্কার

ড. নজরুল ইসলাম   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৪:১৫ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সর্পদংশনে ঝাড়ফুঁক ও কুসংস্কার

আজ একবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেও পিছু ছাড়ছে না কুসংস্কার। সর্পদংশনের পর ওঝার ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করে হারাচ্ছে হাজারো প্রাণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়, যার মধ্যে প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং লক্ষাধিক মানুষ অন্ধত্ব বা চিরস্থায়ী পুঙ্গত্ববরণ করে। আফ্রিকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে। প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ছয় হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে এই বিষাক্ত সাপের কামড়ে।

আধুনিককালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সর্পদংশনের চিকিৎসা করা হয়। অথচ আমাদের দেশের জনসাধারণের ঐতিহ্যগত লোকচিকিৎসা, কবিরাজি, ওঝার ঝাড়ফুঁকের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস এবং পাশাপাশি কুসংস্কার সর্পদংশনে মানুষের মৃত্যুহার বাড়িয়ে তুলেছে। জেলা পর্যায়ের সব হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশনের সংরক্ষণ থাকলেও গ্রামের সাধারণ মানুষ আজও সাপে কামড়ালে শিকড়বাকড়, কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক বা ওঝা-বদ্যির চিকিৎসার ওপর একটু বেশিই নির্ভরশীল। হাসপাতালের অ্যান্টিভেনমের তুলনায় ওঝার ঝাড়ফুঁকে বেশি বিশ্বাসী মানুষ, এমনকি ৯৫ শতাংশ মানুষই তাদের পক্ষে কথা বলবে। ওই সময় তাদের বিপক্ষে গেলেই আপনার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে, এটাই রূঢ় বাস্তব। ভাবতে অবাক লাগে, আজ একবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেও আমরা এসব কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। অথচ একটু সচেতনতা অবলম্বন করলেই সর্পদংশন থেকে বেঁচে যেত হাজারো প্রিয় মানুষের প্রাণ, কমানো সম্ভব হতো মৃত্যুহার।

সর্পদংশনের মৌসুম : সাধারণত আষাঢ়-শ্রাবণ ও ভাদ্র-আশ্বিন মাসে আমাদের দেশে সাপের উপদ্রব বেশি দেখা যায়। বর্ষাকালে বৃষ্টি বা বন্যাজনিত কারণে সাপ সাধারণত উঁচু জমি, জমির আইল, রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়, ইঁদুরের গর্ত বা বসতবাড়ির আঙিনায় এসে আশ্রয় নেয়। সাপ নিজে গর্ত খুঁড়তে পারে না, তাই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ইঁদুরের গর্তে বা কোনো ফাটলে বসতি গড়ে তোলে। আর প্রিয় খাবার হিসেবে আশ্রয়দাতাকেই (ইঁদুরকেই) বেছে নেয়। এ ছাড়া ব্যাঙ ও অন্যান্য পোকামাকড় সাপ ভক্ষণ করে থাকে। বর্ষা-পরবর্তী ভাদ্র মাসে উষ্ণ আরাম-আয়েশের মধ্য দিয়ে সাপের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি শুরু হয়। এই আরাম-আয়েশের একটু বিঘ্ন ঘটালেই আর রক্ষা নেই। এই মৌসুমে অসংখ্য কৃষক, দিনমজুর ও মাঠে-ঘাটে কর্মরত খেটে খাওয়া মানুষ সর্পদংশনের শিকার হয়। তা ছাড়া রাতের বেলায় খাদ্যের সন্ধানে বিচরণকারী সাপ কখনো বসতবাড়িতে ঢুকে কোথাও আশ্রয় নেয়। বিশেষ করে রান্নাঘর বা রান্নার খড়ির মধ্য থেকে অনেকেই দংশনের শিকার হয়। এ ছাড়া দেখা গেছে, ঘরে ঘুমন্ত মানুষকেও দৈবক্রমে দংশন করে।

সাপ একটি অতি নিরীহ সরল সরীসৃপ প্রাণী। সাপ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিকার ধরার জন্য অথবা ভয় পেলে নিজেকে বাঁচানোর জন্য অর্থাৎ আত্মরক্ষার জন্য ছোবল মারে বা কামড় দেয়। মানুষ চলতে গিয়ে অজান্তে সাপের গায়ে পাড়া দেয়, তখনই সাপের ছোবল খায়। প্রায় ৯০ শতাংশ সর্পদংশনের ঘটনা এভাবেই ঘটে। প্রকৃতপক্ষে সাপ মানুষকেই ভয় পায়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপ উপকারী প্রাণী। তাই অহেতুক ভয়ের কারণে সাপকে মেরে ফেলা ঠিক হবে না। এ ছাড়া সাপের বিষ থেকেই সর্পদংশনের ওষুধ অ্যান্টিভেনম তৈরি হয়। তা ছাড়া বিজ্ঞানীরা সাপের বিষ থেকে এমন কিছু ওষুধ উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন, যাতে মানুষের হৃদরোগের চিকিৎসা ও কিডনির সমস্যায় ব্যবহৃত হতে পারে।

বাংলাদেশে অনেক প্রকারের সাপ থাকলেও বিষাক্ত সাপের সংখ্যা কিন্তু খুবই কম। সাধারণত পদ্মগোখরা (গোক্ষুর), খইয়া গোখরা (জাত সাপ), রাজগোখরা (শঙ্খচূড়) নামের এই বিষাক্ত সাপের কামড়েই আমাদের অঞ্চলের মানুষ বেশি মারা যায়। এ ছাড়া রয়েছে পাতি কাল কেউটে (কালাচ), ডোরা কাল কেউটে (শঙ্খিনী), ছোট কাল কেউটে, প্রবাল সাপ, চন্দ্রবোড়া (রাসেল ভাইপার) ও পাহাড়ি বোড়া। এসব বিষাক্ত সাপে কামড়ালে খুব দ্রুত বিষক্রিয়ার লক্ষণগুলো শুরু হয়ে যায়। যেমন—ক্ষতস্থানে দুটি দাঁতের চিহ্ন থাকে, ক্ষতস্থান ফুলে যেতে থাকে, রোগীর চোখের ওপরের পাতা নেমে আসে, মাথা ও কপাল ব্যথা শুরু করে, কথা আওড়ে যেতে থাকে, কথা বলতে কষ্ট হয়, কথা নাকে উঠে যায়, ঘুম ঘুম ভাব আসে, খিঁচুনি ও বমি হতে পারে এবং জ্ঞান হারাতে পারে।

বিষাক্ত সাপের দুটি দাঁত (ফাঙ) থাকে, যার গোড়ার দিকেই থাকে বিষের থলি। সাপের প্রজাতিভেদে এই বিষের থলিতে থাকে তিন ধরনের বিষ। যেহেতু সাপের বিষ প্রয়োগের মাত্রা বেশি হলে এক ঘণ্টার মধ্যেই রোগী মারা যেতে পারে। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে, ওঝার ঝাড়ফুঁকের জন্য সময়ক্ষেপণ না করে, দ্রুত রোগীকে আশ্বস্ত করে হাসপাতালে নিতে হবে। দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছতে পারলে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে সাপের বিষ নিরাময় করে রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব। মনে রাখবেন, যেসব সাপের বিষ নেই বা কামড়ালে বিষ নিঃসরণ হয় না বা হলেও খুবই কম পরিমাণে, সেসব ক্ষেত্রে ওঝার ঝাড়ফুঁক ও শিকড়বাকড়ে রোগী সুস্থ হয়ে যায়। ওঝারা এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সফল; কিন্তু প্রকৃত বিষাক্ত সাপে কামড়ালে ওঝার ঝাড়ফুঁকে শেষ রক্ষা হয় না। রোগীর এক থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু ঘটে। শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও রোগীকে আর বাঁচানো যায় না। তাই আমাদের গ্রামের সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে সচেতন করতে হবে, যাতে তারা শিকড়বাকড়, কবিরাজি, ওঝার ঝাড়ফুঁক ও কুসংস্কার পরিহার করে সাপে কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই রোগীকে খুব দ্রুত উপজেলা বা জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়, তাহলে বেঁচে যেতে পারে প্রিয় মানুষটির প্রাণ। শুধু সচেতনতাই পারে এসব অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করতে।

বিষাক্ত সাপের কামড় থেকে বাঁচতে করণীয় : সাপ কামড়ালে অবশ্যই রোগীর দ্রুত মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন; কিন্তু চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি হয়তো অতটা খারাপ হবে না। যদি সুযোগ থাকে, তাহলে দংশনকারী সাপটিকে খুব ভালো করে দেখে নিন, যাতে চিকিৎসককে এই সাপটি সম্পর্কে আপনি বলতে পারেন।

করণীয় : ১. কোনো রকম বিচলিত না হয়ে শান্ত থাকুন এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে অতি দ্রুত চিকিৎসার ব্যাপারে আশ্বস্ত করুন। কারণ সর্পদংশনে আক্রান্ত ব্যক্তি মৃত্যুভয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন থাকে। ২. আক্রান্ত স্থান পা বা হাত হলে কোনো রকম হাঁটাচলা বা নড়াচড়া করা যাবে না। কারণ আক্রান্ত স্থানের অযাচিত নড়াচড়ায় পুরো শরীরে বিষ দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই প্রয়োজনে হাত বা পায়ের কাটা স্থানের পেছনের দিকে কাঠ বা বাঁশের চটা রেখে হালকাভাবে কাপড় দিয়ে বেঁধে রোগীকে শুইয়ে দিন। ৩. ক্ষতস্থানটি পরিষ্কার পানি বা জীবাণুনাশক দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন এবং কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখুন। ৪. সময়ক্ষেপণ না করে অতি দ্রুত নিকটস্থ উপজেলা বা জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।

বর্জনীয় : ১. ক্ষতস্থানের পাশে দড়ি বা কাপড় দিয়ে শক্ত বাঁধন দেবেন না। ২. ক্ষতস্থানে বরফ লাগাবেন না। ৩. ক্ষতস্থানে মুখ লাগিয়ে বা মুরগির বাচ্চার পায়ুপথ (ক্লোয়াকা) দ্বারা রক্ত চোষানোর চেষ্টা করবেন না। ৪. ক্ষতস্থানে ছুরি বা ব্লেড দিয়ে কাটাকাটি করে রক্ত বের করার চেষ্টা করবেন না। ৫. কবিরাজ, ওঝা, গুনিন বা ঝাড়ফুঁকের জন্য অযথা সময় নষ্ট করবেন না। ৬. ক্ষতস্থানে কোনো রকম ওষুধ, মলম, জরিবুটি, কাঁচা ডিম, চুন, গোবর, কাদামাটি, লতাপাতার রস ব্যবহার বা কোনো কিছু খাওয়ায়ে বমি করানোর চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন।

কুসংস্কার : সাপ নিয়ে কৌতূহলের অন্ত নেই; রয়েছে নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার। সাপে কাটা রোগীকে ঝাড়ফুঁক ছাড়া বাঁচানো সম্ভব নয়; মা-বাবা স্পর্শ করলে রোগী বাঁচে না; রোগীকে ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া; বেলি, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ ফুলগাছের নিচে সাপ থাকে; দাঁড়াশ সাপ গাভির বাট চুষে দুধ খায়; সাপের মাথায় মহামূল্যবান মণি থাকে; এরা গুপ্তধন পাহারা দেয়; কালনাগিনী সাপের বিষ থেকে কেউ বাঁচতে পারে না; বীণ বাজালে সাপ আসে বা বীণের তালে তালে সাপ নাচে; সঙ্গীহারা সাপ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আবারও আসবে ইত্যাদি। এগুলো সম্পূর্ণ ভুল ধারণা, মিথ্যা বা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়।

সতর্কতা : বর্ষাকালে বা বন্যায় পানি মাটির গর্তে ঢুকে পড়লে বা সাপের আবাস ধ্বংস হলে তারা বেঁচে থাকার জন্য বা আশ্রয়ের জন্য উঁচু জায়গায় চলে আসে এবং মানুষকে দংশন করতে পারে। বেশির ভাগ সর্পদংশন হয়ে থাকে পায়ে। কাজেই সাপ থাকতে পারে—এমন জায়গায় হাঁটার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। জুতা, লাইট ইত্যাদি সঙ্গে রাখতে হবে। সাপ সামনে পড়ে গেলে ধীরস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত। সাপ প্ররোচনা ছাড়া দংশন করে না। বসতবাড়ির আশপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ইঁদুরের গর্ত থাকলে আগেই ভালোভাবে বুজিয়ে ফেলতে হবে। ইঁদুর, ব্যাঙ, পোকামাকড় ইত্যাদি সাপের প্রিয় খাবার। তাই খাবারের সন্ধানে বাড়ির আশপাশে সাপ আসতে পারে। প্রয়োজনে কার্বলিক এসিড ছিটিয়ে রাখতে পারেন। দুর্ভাগ্যবশত যদি সাপ কামড় দিয়ে থাকে, শান্ত থেকে কারো সাহায্য নিতে হবে। কারণ অনেক সময় ভয় থেকেই মৃত্যু হয়। সর্পদংশনের পর কখনো দৌড়ানো উচিত নয়। এতে বিষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সর্পদংশনে ওঝার ঝাড়ফুঁক ও কুসংস্কার রোধে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

বাংলাদেশ টক্সিকোলজি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে যে অ্যান্টিভেনম আনা হয়, সেটি মূলত চারটি সাপের বিষের একটি ‘ককটেল’ বা মিশ্রণ, যা কিছু সাপের দংশন নিরাময়ে কাজ করে। কারণ অনেক সময়ই সাপে কাটা ব্যক্তি জানতেও পারে না কোন সাপ তাকে কেটেছে। তবে সাপে কামড়ানোর ওষুধ বা অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণার কাজ শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা অ্যান্টিবডিভিত্তিক চিকিৎসার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন, যাতে অসংখ্য প্রজাতির সাপের বিষ নিরাময়ে কাজ করে। এ ছাড়া তৈরি হচ্ছে মুখে খাওয়ার ক্যাপসুল, সাপে কাটার পর এই ক্যাপসুল খেলে বিষ নিষ্ক্রিয় করতে সাহায্য করবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির পাশাপাশি ওঝা-কবিরাজদের ঝাড়ফুঁক, অপচিকিৎসা ও কুসংস্কার বন্ধ হলে সর্পদংশনে মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক : কৃষি উদ্যোক্তা, গবেষক ও প্রাণিবিজ্ঞানী



সাতদিনের সেরা