kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ভয়াবহ নেশার ফাঁদে তারা

রাজধানীতে বেপরোয়া মাদকসেবীরা

জহিরুল ইসলাম   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:৪১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভয়াবহ নেশার ফাঁদে তারা

রিকশায় করে ঢাকার গুলিস্তানের পথে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সুমাইয়া বাশার। চানখাঁরপুল সিগন্যাল পার হয়ে জাতীয় শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পেছনে যেতেই হঠাৎ সুমাইয়ার সামনে এসে দাঁড়ান এক যুবক। তাঁর চাই শুধু পাঁচ টাকা। তা না দিলে কিছুতেই রিকশা ছাড়বেন না। পরে সুমাইয়া ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে অনেকটা ভয়েই টাকা দিলে রিকশা ছাড়েন যুবক। গত মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকের ঘটনা এটি।

পরে এই প্রতিবেদককে ওই যুবক জানান, তাঁর নাম সিরাজ। জোর করে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকাসক্ত সিরাজ বলেন, ‘ভাই, পাঁচ টাহার জইন্যে একটা ওষুধ (মাদক) কিনতে পারতাছি না। আমার কাছে ১০ টাহা আছে। ১৫ টাহার মিল করতে পারতাছিলাম না। কত মাইনসেরে কইলাম, কেউ দেয় নাইক্কা। পরে মহিলার কাছ থেইক্কা জোর কইরা আনছি।’

পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পেছনের যাত্রীছাউনির পাশে (চানখাঁরপুল হয়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের প্রবেশপথে) মাদকসেবীদের এই প্রকাশ্য অবস্থান দীর্ঘদিনের। নতুন করে তাদের অবস্থান হাসপাতালের সামনের রাস্তার বিপরীত পাশের ফুটপাতে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা তো রয়েছেই। টাকা না থাকলে মানুষের পথ আটকে টাকা দাবি করে তারা; যদিও পরিমাণটা বেশি নয়, চাহিদা অনুযায়ী। সুই-সিরিঞ্জ, সিগারেট, সিগারেটের প্যাকেটের খালি কাগজ, পলিথিনে ডান্ডিসহ বিভিন্নভাবে ভয়ংকর নেশার ফাঁদে ছিন্নমূল কিশোর থেকে বয়স্করা। তাদের কেউ কেউ বলেছে, মাদকের কারণে মৃত্যুর দিকে চলে যাচ্ছে—এটা জেনেও এ নিয়ে তাদের চিন্তা নেই। কেউ বলেছে, মানসিক কষ্ট ভুলে থাকতে, কেউ বলেছে ক্ষুধা নিবারণের জন্য তারা মাদক নেয়। কোথাও কোথাও দেখা গেছে, একই সিরিঞ্জে মাদক ঢুকিয়ে তা শরীরে নিচ্ছে একাধিক ব্যক্তি।

রাজধানীজুড়ে প্রতিদিনই চলে মাদকবিরোধী অভিযান। চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ১৩ হাজার ৪২৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ৯ হাজার ৪৮৮টি মামলা করা হয়েছে। থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট মাদকের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। প্রতিদিন গড়ে গ্রেপ্তার করা হয় অর্ধশতাধিক। তবু কমছে না মাদক সেবন। বরং প্রকাশ্যেই রাজধানীর চানখাঁরপুল, গুলিস্তান মহানগর নাট্যমঞ্চের সামনে, লালবাগ শহীদনগর, বেড়িবাঁধ, লালবাগ বালুর মাঠ, আমলীগোলা খেলার মাঠ, হাজারীবাগ পানির ট্যাঙ্কিসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে মাদক গ্রহণ।

ডিএমপির জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার ইফতেখারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ জানে কিন্তু কাজ করছে না, তা বলা যাবে না। মাদক কেনাবেচার বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। যেসব জায়গায় আমাদের জানা মতে মাদক সেবন করা হয়, সেসব জায়গায় প্রতিদিন পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। এর পরও সব জায়গার খবর পুলিশের কাছে না-ও থাকতে পারে। মাদকসেবীরাও সব সময় এক জায়গায় মাদক নেয় না। তবে অনেক সময় কিছু ভবঘুরে থাকে, যাদের হ্যান্ডল করা একটু কঠিন। তাদের ধরার পরে যথাযথ পুনর্বাসন করা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়।’

সম্প্রতি রাজধানীর কিছু এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করা মাদক নিচ্ছেন। এর বেশির ভাগই ভবঘুরে আর পরিবারের বখে যাওয়া সদস্য। লালবাগ এলাকার বালুর মাঠে মাদকসেবীদের আনাগোনা কমলেও বন্ধ হয়ে যায়নি। গত সোমবার সন্ধ্যার পর গিয়ে দেখা যায়, সাইফুল, রোহান, অনিক, রনিসহ কয়েক কিশোর একসঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। হঠাৎ এক ব্যক্তি এসে ওদের তাড়া দিতেই সবাই দিগ্বিদিক ছোটাছুুটি শুরু করে। পরে সালামত উল্লাহ নামের ওই ব্যক্তি জানান, এখানে একজন তাঁর ছেলে ছিল। বিভিন্ন সময় বন্ধুদের সঙ্গে এমন আড্ডার নামে মোবাইল ফোনে টাকা দিয়ে গেমস খেলে আর নেশা করে। বাসায় তার খাবার বন্ধ করেও কাজ হয়নি। সূত্র জানায়, মিরপুরের শাহ আলী, দারুসসালাম, রূপনগর, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল ও ভাসানটেক এলাকার অনেক স্পটে অবাধে চলে মাদক কারবার।

পুলিশ বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় প্রতিদিন অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ অর্ধশত সেবী ও কারবারিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। তাদের মামলা দায়েরের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। তবু মাদক সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় এবং এর সহজলভ্যতার কারণে বিক্রি ও সেবনকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। থেমে নেই সরবরাহ ও পাচার। তবে রাজধানীজুড়ে মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সব ইউনিট একযোগে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।



সাতদিনের সেরা