kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

রাসেলের আলাদিনের চেরাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:৩১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাসেলের আলাদিনের চেরাগ

কখনো ‘সাইক্লোন’, কখনো ‘আর্থকোয়াক’, আবার কোনো সময় ‘পুরাই গরম’। পানির দরে পণ্য বেচতে জাদুকরী সব আয়োজন! মানুষকে বোকা বানাতে এসব ‘লোভের হাঁড়ি’ যাঁর মস্তিষ্ক ভেদ করে এসেছে তিনি মোহাম্মদ রাসেল। সময়ের আলোচিত অনলাইনভিত্তিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালির ‘জনক’। পোশাকি পদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাও তিনি। তাঁর এই ‘আলো-আঁধারি’ প্রকল্পের ছায়াসঙ্গী শামীমা নাসরিন। যিনি জীবনসঙ্গীও। পদে আবার স্বামীর চেয়ে ঢের বড়। চেয়ারম্যান! এখন টাকা লোপাটের মামলায় দুজনই চৌদ্দ শিকে বন্দি।

ইভ্যালির পিলে চমকানো রাজকীয় ছাড় আর লোভনীয় ক্যাশব্যাক অফারের ফুলঝুড়িতে হুমড়ি খেয়ে পড়ত লাখ লাখ মানুষ। রাসেল সুনিপুণ প্রতারণার সুঁই-সুতোতে সাধারণ মানুষকে গেঁথেছেন শতভাগ। এখন সেই গ্রাহকরা করছে হা-পিত্যেশ। গ্রাহকদের কেউ বলছে, ‘রাসেলকে ছাড়ো’। আবার অনেক ক্ষুব্ধ গ্রাহকের দাবি, ‘রাসেলকে জেলে ভরে রাখো’।

এদিকে এরই মধ্যে রাসেলের ছলাকলা মানুষের মুখে মুখে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সময়োপযোগী উদ্যোগের কারণে প্রতারণার জালের কথা জানা হয়ে গেছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশবিভুঁইয়ে। অনলাইন ক্রেতাদের মধ্যে অল্প সময়ে আলোড়ন তুললেও প্রতিষ্ঠানটি এখন উঠেছে সমালোচনার চূড়ায়।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে রাসেলের হাত ধরে জন্ম ইভ্যালির। এরপর রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ভাড়ায় একটি অফিস ও কাস্টমার কেয়ার স্থাপন করেন। এ ছাড়া ভাড়া করা জায়গায় আমিন বাজার ও সাভারে চালু করেন দুটি ওয়্যারহাউস। ইভ্যালির বর্তমান গ্রাহক ৪৪ লাখেরও বেশি। কম্পানিটি এ পর্যন্ত তিন হাজার ৭০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। বর্তমানে ভোক্তা এবং ব্যবসায়ীর কাছে এই প্রতিষ্ঠানের দায় ৫৪৩ কোটি টাকা। দুই লাখের বেশি ক্রেতা পাবে ৩১১ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীরা পাবেন ২০৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ইভ্যালির মোট সম্পদ আছে ১২১ কোটি টাকা, যা দিয়ে মাত্র ২২ শতাংশ দায় মেটানো সম্ভব। শুরু থেকেই ইভ্যালিকে একটি ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরির পরিকল্পনা ছিল রাসেলের। পরে সুযোগ বুঝে দেনাসহ কোনো প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কম্পানির কাছে বিক্রি করে লভ্যাংশ নেওয়ার ছক কষছিলেন তিনি। এ জন্য রাসেল বিভিন্ন দেশ ভ্রমণও করেছেন।

ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন এবং তাঁর স্বামী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল পদাধিকারবলে নিজেরা মাসিক পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা বেতন নিতেন। তাঁরা কম্পানির টাকায় ব্যক্তিগত দুটি দামি গাড়ি (রেঞ্চ রোভার ও অডি) কিনে ব্যবহার করতেন। এ ছাড়া কম্পানিটির রয়েছে প্রায় ৩০টি গাড়ি। সাভারে ব্যক্তি পর্যায়ে রাসেলের কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমিসহ অন্যান্য সম্পদও আছে।

কে এই রাসেল? : রাজধানীর রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন মোহাম্মদ রাসেল। এরপর পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতকোত্তর  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখাপড়া শেষে ২০১১ সালে যোগ দেন ঢাকা ব্যাংকে। চাকরির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে  করেন  ইভিনিং এমবিএ। ছয় বছর পর ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে অনলাইনে পণ্য বেচাকেনার ব্যবসায় মজেন।

২০১৬ সালে প্রথমে অনলাইনে ডায়াপার বিক্রি দিয়ে যাত্রা শুরু রাসেলের। ২০১৭ সালে এই ব্যবসা করতে গিয়ে বড় একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার চিন্তা মাথায় আসে তাঁর। সেই চিন্তা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন দেশীয় ই-কমার্স কম্পানি ‘ইভ্যালি’। এই খাতে স্বল্প সময়ে সবাইকে ভড়কে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বিশাল অফার, ছাড়ের ছড়াছড়ি আর ক্যাশব্যাকের টোপ ফেলে ক্রেতা টানার কৌশল নিয়ে সফলতা পায় ইভ্যালি। এখন উল্টো গ্রাহক ভোগান্তির চূড়ায় উঠেছে দেশীয় এই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে মোটরসাইকেল, গাড়ি, মোবাইল, ঘরের সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রের মতো চড়া দামের পণ্যে লোভনীয় ছাড় দেয় ইভ্যালি। প্রতিষ্ঠার শুরুতে সাইক্লোন, আর্থকোয়াক ইত্যাদি নামে তারা ক্রেতাদের ১০০ শতাংশ, এমনকি ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাকের টোপ দেয়। ইভ্যালির ব্যবসার এ কৌশলের ফলে মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি অনেক সমালোচনারও জন্ম হয়।

ফলে কার্যক্রম শুরুর দুই বছর পার না হতেই এ পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে। অথচ কম্পানির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৫০ হাজার টাকা। ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাত্র তিন বছর বয়সী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে জমা হয় নানা অভিযোগ।

ইভ্যালির সাইক্লোন অফার (বাজারদরের অর্ধেক মূল্যে পণ্য বিক্রয়), ক্যাশব্যাক অফার (দরের ৫০-১৫০% ক্যাশব্যাক অফার), আর্থকোয়েক অফারে প্রলুব্ধ হয় সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া বিভিন্ন উৎসবকেন্দ্রিক জমজমাট বৈশাখী, ঈদ অফার, টি-১০, টি-৫ ও টি-৩ অফার তো ছিলই। ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি বাড়াতে বাজারে চাহিদা আছে এমন পণ্যকে বেছে নেওয়া হতো।  লোভনীয় ছাড়ের ফলে যার ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়ে যেত। ফলে ক্রমেই প্রতিষ্ঠানটির দায় বাড়তে থাকে।



সাতদিনের সেরা