kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

দরকার নেই ব্যাঙের ছাতার মতো এত অনলাইন

ড. হাছান মাহ্‌মুদ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:৪৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দরকার নেই ব্যাঙের ছাতার মতো এত অনলাইন

উচ্চ আদালত সম্প্রতি অনিবন্ধিত সব অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করার যে আদেশ দিয়েছেন সে আলোকে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তির চরিত্র হনন, ওটিটি মাধ্যমের কনটেন্ট বিষয়ে নীতিমালা—এসব নিয়ে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথা বলেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ। গত বুধবার সচিবালয়ে তাঁর এই সাক্ষাত্কার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ওমর ফারুক

কালের কণ্ঠ : অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ক্ষেত্রে আপনারা কী ভূমিকা রাখছেন?

তথ্যমন্ত্রী :  প্রথমত আদালতের আদেশটি শুনেছি, গণমাধ্যমে দেখেছি। অফিশিয়ালি আমরা কপি পাইনি। অনলাইন রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং হাইকোর্টের নির্দেশনা এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাবিধানে সহায়ক। রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত ছাড়া আর কোনো অনলাইন ভবিষ্যতে বের হবে না বা আজকে যেসব পত্রপত্রিকা আছে সেগুলো ছাড়া ভবিষ্যতে আর কোনো পত্রপত্রিকা বের হবে না, তেমন নিয়ম কোথাও নেই। তবে আদালতের আদেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক। যেসব অনলাইন সত্যিকার অর্থে গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করে না বরং নিজস্ব বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যাঙের ছাতার মতো এত অনলাইন দরকারও নেই। যার যেমন ইচ্ছা অনলাইন করে বসবে, যেমন ইচ্ছা তেমন অসত্য সংবাদ পরিবেশন করবে, গুজব রটনায় ব্যস্ত হবে, অন্যের চরিত্র হনন করবে, ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে কোনো ব্যবসায়ীর স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সেখানে লেখালেখি হবে—এটি কখনোই সমীচীন নয়, সে ক্ষেত্রে আদেশটি অবশ্যই সহায়ক।

কালের কণ্ঠ : আদালতের নির্দেশের কপি পাওয়ার পর কী করবেন?

তথ্যমন্ত্রী : আদেশের লিখিত কপি পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অবশ্যই কিছু অনলাইন আমরা বন্ধ করব। তবে ভবিষ্যতেও অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করব। একই সঙ্গে বলতে হয় যে এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন চলছে। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া সব কটিকে একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া কতটুকু সমীচীন, সে ভাবনার বিষয়গুলো আদালতের কাছে উপস্থাপন করব।

কালের কণ্ঠ : বহু ইউটিউব চ্যানেলে মানুষের চরিত্র হনন করে কনন্টেট তৈরি করা হচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণে কী উদ্যোগ নেবেন?

তথ্যমন্ত্রী :  অনলাইন যেভাবে রেজিস্ট্রেশন দিচ্ছি তেমনিভাবে ইউটিউব বা আইপি টিভিও রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করব। ব্যাঙের ছাতার মতো আইপি টিভি করার হিড়িক পড়েছে, এটি কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

কালের কণ্ঠ : কতগুলো অনলাইন পোর্টালের আবেদন রয়েছে?

তথ্যমন্ত্রী : চার হাজারের মতো আবেদন জমা আছে। সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তারা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করে রিপোর্ট পাঠানোর পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালের কণ্ঠ : ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আপনারা কী করছেন?

তথ্যমন্ত্রী : আপনারা জানেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ ‘রেগুলেটরি জব’; নীতি, নীতিমালা তৈরি করে গণমাধ্যমের ক্রমবিকাশকে এগিয়ে নেওয়া। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম একটি ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা, কিন্তু ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিনেমা, নাটক, ওয়েব সিরিজ বা কোনো কনটেন্ট রিলিজ করতে হলে এখনো অনুমোদনের ব্যবস্থা নেই। আমার সাম্প্রতিক ভারত সফরে সেখানকার তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁরা কিভাবে বিষয়টিকে দেখভাল করছেন সে বিষয়ে আলাপ করেছি। তাঁরা গত ফেব্রুয়ারি মাসে এ নিয়ে প্রজ্ঞাপন আকারে একটি নীতিমালা জারি করেছেন, সেখান থেকে পরিচালিত সব ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে এই নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। সেই নীতিমালার ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালের কণ্ঠ :  দেশে নীতিমালা কোন পর্যায়ে রয়েছে?

তথ্যমন্ত্রী : আমরা এরই মধ্যে নীতিমালার প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেছি। সেই নীতিমালা খুব শিগগির প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করতে পারব বলে আশা করছি। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট এত বিস্তৃত ও ব্যাপক যে সেন্সর বোর্ডের মাধ্যমে সেন্সর করা দুরূহ কাজ। বছরে ৫০টি বা ১০০টি সিনেমা রিলিজ হয়, সেটি সেন্সর করা সহজ। কিন্তু ওটিটির হাজার কনটেন্ট সেন্সর করা সহজ কাজ নয়। সে কারণে ভারতসহ অন্যান্য দেশে যেভাবে এটা করা হচ্ছে, সেভাবে আমরা একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছি, যা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করব। এটা এ জন্য যাতে আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা সমাজ ও মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে, বিজাতীয় সংস্কৃতি উত্সাহিত হয় কিংবা আমাদের তরুণসমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে—এমন কোনো কনটেন্ট সেখানে না যায়।

কালের কণ্ঠ : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে কী ভাবছেন?

তথ্যমন্ত্রী : বর্তমানে গণমাধ্যমের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যুক্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে মত প্রকাশের অবারিত সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে; একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সমাজে নানা ধরনের অস্থিরতা তৈরি, সরকার ও ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর সুযোগ হিসেবেও এটির ব্যবহার লক্ষণীয়। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশ-বিদেশ থেকে করোনাকালেও অনেক গুজব রটানো এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের মন্ত্রণালয় এই ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনার জন্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল, আইপি টিভির রেজিস্ট্রেশন দেওয়া শুরু করাসহ অনেক কাজ এরই মধ্যে করেছে।

কালের কণ্ঠ : কী ধরনের কনটেন্ট তৈরি হতে দেখছেন?

তথ্যমন্ত্রী : আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিদেশে বসে বিভিন্ন ব্যক্তিবিশেষ নির্দিষ্ট কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করে মাঝেমধ্যেই নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা সার্ভিস প্রভাইডার তাদের কাছ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা পাওয়া প্রয়োজন সব সময় সে ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। এ জন্য আমরা সার্ভিস প্রভাইডারদের সঙ্গে যেমন আলোচনা করছি, একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেসব ব্যক্তিবিশেষ বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে যেসব দেশ থেকে অপপ্রচারগুলো চালায়, সেসব দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।

কালের কণ্ঠ : কোনো উদ্যোগ কি নেওয়া হয়েছে?

তথ্যমন্ত্রী : রিপোর্টার্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে প্রচণ্ড আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। আমরা তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সেটির প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম এবং জানিয়েছিলাম যে এটি যদি সংশোধন করা না হয়, তাহলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। রিপোর্টার্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্সের অফিস ফ্রান্সের প্যারিসে। ফরাসি আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ফরাসি আইন অনুযায়ী এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন অনুযায়ী এভাবে ব্যক্তিবিশেষকে কটাক্ষ করে কিংবা টার্গেট করে অহেতুক যে ধরনের রিপোর্ট তারা প্রকাশ করছিল, সেটি করতে পারে না। ফরাসি আইনের সেই ধারা উল্লেখ করে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট আইনের উল্লেখ করে তাদের লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে অন্যান্য দেশ থেকেও যারা এ কাজগুলো করছে তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কালের কণ্ঠ : বিদেশ থেকে যারা এসব করছে, তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার সুযোগ নেই?

তথ্যমন্ত্রী : সার্ভিস প্রভাইডার ইউটিউব কর্তৃপক্ষ ছাড়াও অন্য প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক সময় রেসপন্স করে, অনেক ক্ষেত্রে করে না। সে কারণে আমরা আরো জোরালোভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, সেই বিষয়ে আলোচনায় আছি। আলোচনা অনেকটা এগিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়েছে বাংলাদেশে কম্পানি করার জন্য। বাংলাদেশে কম্পানি করা হলে বাংলাদেশের আইনে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।



সাতদিনের সেরা