kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১।৮ সফর ১৪৪৩

শেষ ২ ঘণ্টায় মিলতে পারে মৃত্যুরহস্য!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:২৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শেষ ২ ঘণ্টায় মিলতে পারে মৃত্যুরহস্য!

রাজধানীর গুলশানে মোসারাত জাহান মুনিয়া (২২) নামের এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে নেমেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। যেকোনো রহস্যজনক ঘটনা উন্মোচনে তদন্তকারী এই সংস্থাটির বেশ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সংস্থাটির তদন্তে এই তরুণীর মৃত্যুরহস্যও দ্রুত উদঘাটিত হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অবশ্য এই মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে পুলিশের তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে গত জুলাইয়ে। ওই তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে আদালত মামলার আসামিকে অব্যাহতিও দিয়েছেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে নিহত তরুণীর বোন নুসরাত জাহান তানিয়া ফের মামলা ঠুকে দেন। আগে আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলা করলেও এবার আটজনকে আসামি করে কথিত ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ তুলে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। নতুন মামলার তদন্তভার পেয়েছে পিবিআই।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বনজ কুমার মজুমদারের নেতৃত্বে পিবিআই এখন একটি মর্যাদাপূর্ণ বিভাগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি ২০১৬ সালে পিবিআইয়ে যোগ দেওয়ার পর মামলাগুলোর রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য নতুন সফটওয়্যার তৈরি করা থেকে শুরু করে পিবিআইয়ের জন্য আলাদা একটি অত্যাধুনিক ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করেন। তাদের তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। বিভিন্ন মামলায় তারা এ কথার প্রমাণ রেখেছে। তাদের অসাধারণ মেধায় বহু জটিল মামলার তদন্তে রহস্যের জট খুলেছে এরই মধ্যে।

গত ২৬ এপ্রিল গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় মুনিয়ার মরদেহ। ওই রাতেই গুলশান থানায় আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন তানিয়া। মামলাটি নিখুঁতভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে গুলশান থানা পুলিশ। দীর্ঘ তদন্তের পর ১৯ জুলাই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। ২২ জুলাই আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। শুনানি শেষে ১৮ আগস্ট আদালত ওই মামলা থেকে একমাত্র আসামিকে অব্যাহতি প্রদান করেন। তানিয়া সেই প্রতিবেদনের ওপর নারাজি আবেদন করলেও আদালত তা খারিজ করে দেন।

এরপর ৬ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে ফের মামলা করেন তানিয়া। আগে আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছিলেন নুসরাত, নতুন মামলায় তিনি অভিযোগ আনেন ধর্ষণ এবং হত্যার। আসামি করেন আটজনকে। অবশ্য ওই মামলাটির উদ্দেশ্য এবং এর নেপথ্যের কুশীলবদের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়ে গেছে।

নতুন মামলার তদন্তভার পেয়ে এরই মধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন পিবিআই কর্মকর্তারা। পিবিআই সূত্র বলছে, যেকোনো একটি হত্যা মামলার প্রধান উপজীব্য হলো ঘটনাস্থলে কে উপস্থিত ছিল। কারণ হত্যা সশরীরে উপস্থিত না হয়ে করা সম্ভব নয়। আর এ কারণেই মুনিয়ার মৃত্যুর আগে গুলশানের ওই ফ্ল্যাটে কারা গিয়েছিল সেটি এই মামলার এখন তদন্তের প্রধান বিষয় বলে জানা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, মুনিয়ার কল রেকর্ড যাচাই করে দেখা গেছে মৃত্যুর দুই ঘণ্টা আগ পর্যন্ত মুনিয়া তাঁর বোন নুসরাতের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ সময় তিনি নুসরাতকে কলা আনতে বলেছিলেন। অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি বোনের সঙ্গে কথা বলেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত মারা যাননি। কথা বলার পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে মুনিয়া মৃত্যুবরণ করেছেন বলে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এ কারণে প্রশ্ন ওঠে, এই সময়ে মুনিয়ার ফ্ল্যাটে কারা গিয়েছিল এবং যাদের হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের কেউ সেই ফ্ল্যাটে আদৌ গিয়েছিল কি না।

পিবিআই সূত্র বলছে, মুনিয়ার মামলাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। মুনিয়া নিজ ফ্ল্যাটে মারা যান, বাইরে কোথাও নয়। মৃত্যুর আগের ২৪ ঘণ্টা অথবা ফোনে বোনের সঙ্গে কথা বলার পরবর্তী সময় থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময় কেউ মুনিয়ার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল কি না সেটি হলো মামলার প্রধান উপজীব্য বিষয়। জানা যায়, যে আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে তাদের কেউই ওই সময়ের মধ্যে মুনিয়ার ফ্ল্যাটে যাননি। তাহলে মুনিয়ার বাড়িতে গিয়েছিল কে? সিসিটিভি ফুটেজটি প্রকাশ করা এবং নুসরাত তানিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমেই এর সমাধান হতে পারে বলে দাবি করছে একাধিক সূত্র।

সূত্র আরো জানায়, মুনিয়ার মৃত্যুর আগে নুসরাতের নির্দেশে তিনজন ব্যক্তি মুনিয়ার বাসায় গিয়েছিলেন। তাঁরা এর আগেও বিভিন্ন সময়ে মুনিয়ার বাসায় যেতেন। তাঁরা নুসরাতের পরিচিত ও সহচর বলে জানা যায়। এই তিনজন নুসরাতের ঘনিষ্ঠ এবং যাঁরা মুনিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন খোঁজখবর নিতেন তাঁদের লোক বলে জানা গেছে।

নানা বিষয়কে সামনে রেখে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখন মৃত্যুর আগে মুনিয়ার বাসায় শেষ দুই ঘণ্টায় কারা গিয়েছিল তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। অবশ্য পিবিআই পুরোপুরি বিষয়টি নিরপেক্ষ এবং নির্মোহভাবে তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ হলেই বোঝা যাবে মুনিয়াকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি এটা আত্মহত্যা।

এদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, এই মামলার বেশ আগে ২ মে ঢাকার সিএমএম আদালতে একটি হত্যা মামলা করেছিলেন মুনিয়ার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ। ওই মামলায় তিনি হুইপপুত্র নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনকে আসামি করেন। তখন নুসরাতের ‘আত্মহত্যা প্ররোচনার’ মামলা তদন্তাধীন থাকায় সবুজের মামলাটি স্থগিত রাখেন আদালত। নিয়মানুযায়ী নুসরাতের প্রথম মামলার কার্যকারিতা শেষ হওয়ার পর সবুজের মামলাটি সক্রিয় হওয়ার কথা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেটি সক্রিয় না করে নুসরাতের করা উদ্দেশ্যমূলক আরেকটি মামলা তদন্তে গেছে।

উচ্চ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলেছেন, একই ঘটনায় একাধিক মামলা হতেই পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম রয়েছে। সাধারণত প্রথম মামলার কার্যকারিতা সম্পন্ন হলে দ্বিতীয় মামলা চালু হওয়ার কথা। আবার প্রথম মামলাটির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দ্বিতীয় মামলা সক্রিয় করার সুযোগ নেই। এ ঘটনায় যেহেতু প্রথম মামলায় বাদীর অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি, সেহেতু দ্বিতীয় মামলায় অবশ্যই যেতে হবে। দ্বিতীয় মামলা তদন্ত না করে তৃতীয় মামলায় যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া একই ইস্যুতে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করারও কোনো সুযোগ নেই।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আবু এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুনিয়ার ভাইয়ের করা দ্বিতীয় মামলা স্টে ছিল নুসরাতের করা প্রথম মামলা পরিচালনার স্বার্থে। এখন যেহেতু প্রথম মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, তাই দ্বিতীয় মামলা চলবে। দ্বিতীয় মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগে আর কোনো মামলা হতে পারে না। পূর্ববর্তী মামলায় বাদী যদি কোনো গাফিলতি হয়েছে বলে মনে করে তাহলে সে নারাজি দিতে পারে। কিন্তু একই বিষয়ের ওপর আবারও মামলা করতে পারে না। এভাবে মামলা হয় না, আইনে নেই।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র আইনজীবী আরফান উদ্দিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, “‘আত্মহত্যা প্ররোচনার’ পরে একই বাদীর ‘হত্যা মামলা’ দায়ের নজিরবিহীন। আমার জীবনে এমন মামলা দেখিনি।” তিনি আরো বলেন, ‘বড় ভাই (আশিকুর রহমান সবুজ) যে হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন, সেই মামলাটি স্থগিত থাকতে পারে না। কোর্টের উচিত ছিল এটি একই তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করা। যেহেতু আত্মহত্যা রেজাল্ট এসেছে, কোর্ট পিবিআইকে এই হত্যা মামলা দিতেই পারে না বলে আমি মনে করি।’

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলায়ই যখন আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ মেলেনি, সেখানে হত্যা মামলা আসবে কোথা থেকে। নতুন করে মামলা তদন্ত করে তো কোনো লাভ হবে না। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট একই, আলামত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা একই। সেখানে নতুন করে তদন্ত করে কী পাবে।’



সাতদিনের সেরা