kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

বীমায়ও সুরক্ষা অনিশ্চিত

গ্রাহকের ৪৬৭ কোটি টাকা দিচ্ছে না ছয় প্রতিষ্ঠান

এ এস এম সাদ   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:১৯ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বীমায়ও সুরক্ষা অনিশ্চিত

গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্সের ১৫ বছর মেয়াদি একটি জীবন বীমা পলিসি কিনেছিলেন সিলেটের জাহানারা বেগম আলী। ২০০৭ সালে কেনা এই পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর জাহানারা বেগম মারা যান। মারা যাওয়ার সময় তিনি ইংল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন। এর আগ পর্যন্ত বছরে এক লাখ দুই হাজার ৩৫০ টাকা করে প্রায় ১৩ বছরে জাহানারা বেগম ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা জমা দেন। তাঁর দুই ছেলে সেই পলিসির নমিনি। কিন্তু তাঁরা এখনো বীমা দাবির অর্থ পাননি।

এমন বহু মানুষ বীমা পলিসি কিনে মেয়াদ শেষ করেও বছরের পর বছর ধরে টাকার জন্য সংশ্লিষ্ট বীমা কম্পানির দপ্তরে ঘুরছেন। উপায় না পেয়ে এসব গ্রাহক বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে অভিযোগ করছেন। আইডিআর সূত্রে সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রাপ্ত বীমা দাবির অর্থের জন্য গত এক বছরে কমপক্ষে ৩২ হাজার ৭৯৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের বিপরীতে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায় প্রায় ৪৬৭ কোটি টাকা। একটি প্রতিষ্ঠানের দায় জানা যায়নি। যেসব কম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ সেগুলো হচ্ছে ফারইস্ট ইসলামী ইনস্যুরেন্স, বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স, পদ্মা লাইফ ইনস্যুরেন্স, সানলাইফ ইনস্যুরেন্স, সানফ্লাওয়ার ইনস্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্স ও হোমল্যান্ড ইনস্যুরেন্স। এর মধ্যে হোমল্যান্ডের দায় কত সেটা জানা যায়নি।

ইংল্যান্ডে মারা যাওয়া গোল্ডেন লাইফের বীমা গ্রাহক জাহানারা বেগম আলীর ছেলে আব্দুল মুহিত ও তাঁর এক আত্মীয় দেলোয়ার হোসেন বীমা দাবির অর্থ পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। তাঁরা প্রথমে সিলেটে প্রতিষ্ঠানটির শাখা কার্যালয়ে যান। কিন্তু যতবারই গেছেন ততবারই বন্ধ পেয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, ৯০ দিনের মধ্যে বীমা কম্পানিকে এই গ্রাহকের মৃত্যু দাবি পরিশোধ করার কথা। চলতি বছরের ১ জুন দেলোয়ার হোসেন ঢাকার মহাখালীতে গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। তখন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন খান চৌধুরী তাঁকে জানান, শিগগিরই জাহানারা বেগমের মৃত্যু দাবি পরিশোধ করা হবে। মৃত্যু দাবির নিয়ম অনুসারে, ১৫ বছরের পলিসির পুরো অর্থ পাবেন। অথচ গোল্ডেন লাইফ তাঁদের জানায় যে জাহানারা বেগমের মৃত্যু দাবি হিসেবে ১১ লাখ ৭৫ হাজার ৩০০ টাকা দেওয়া হবে। কিন্তু এক বছরেও কোনো টাকা পাননি।

আব্দুল মুহিত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গোল্ডেন লাইফের সিলেটের অফিসে দীর্ঘদিন ধরে টাকা দিলাম। সেই অফিস বন্ধ। ঢাকার অফিস থেকে জানানো হয়েছে, কম্পানির লোকজন সঠিকভাবে রসিদ সংগ্রহ করেনি।’

জানতে চাইলে গোল্ডেন লাইফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন খান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, সিলেট শাখার কর্মকর্তারাই রসিদ জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম করেছেন। এটার জন্য দাবি পরিশোধে দেরি হচ্ছে। পুরো দাবি পরিশোধের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলতে অস্বীকৃতি জানান।

নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলায় ৫০০ গ্রাহক গত বছর অক্টোবরে লিখিত চিঠির মাধ্যমে পদ্মা লাইফ ইনস্যুরেন্সের নামে আইডিআরএর কাছে অভিযোগ করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন যে পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হলেও বীমা দাবি পরিশোধ করছে না প্রতিষ্ঠানটি। তাঁদের মধ্যে একজন সাপাহার উপজেলার মাদরাসা শিক্ষক রিনা পারভিন (৫৫) ২০০৮ সালে ১০ বছর মেয়াদি একটি জীবন বীমা পলিসি কিনেছিলেন। তাঁর বীমার মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় তিন বছর আগে। কিন্তু তিনি এখনো টাকা পাননি।

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা নরপাটি সাহেবপাড়ার মিজানুর রহমান প্রবাসে থাকতে ভবিষ্যৎ জীবনের ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য ২০০৮ সালে বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানি থেকে একটি পলিসি কিনেছিলেন। ১৩ বছর পর এসে মিজানের মনে হচ্ছে তাঁর পলিসি কেনার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। ১২ বছরে এক লাখ ২০ হাজার টাকার প্রিমিয়াম জমা দিয়েছেন তিনি। পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে চার বছর আগে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তাঁর বীমা দাবি পরিশোধ করছে না। গত সাত মাস ধরে লাকসামে বায়রা ইনস্যুরেন্সের শাখা কার্যালয়টিও বন্ধ।

বীমা খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইডিআরএর কাছে যে পরিমাণ অভিযোগ আসে সেটা দিয়ে বাস্তবে বীমা খাতের বাজে চিত্র ধারণা করা ভুল হবে। কারণ বীমা দাবির অপরিশোধিত টাকার অঙ্কের হিসাব ও দাবির সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে আরো অনেক বেশি। বীমার টাকা ফেরত পাননি এমন অনেক গ্রাহক আইডিআরএর কাছে অভিযোগ করেননি। এসব গ্রাহকের মধ্যে অনেকে জানেই না কোথায় অভিযোগ করতে হয়। তাই আইডিআরএর কাছে তাদের হিসাব নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কম্পানিগুলো তাদের প্রকৃত অপরিশোধিত বীমা দাবির পরিমাণ ও সংখ্যা আইডিআরএকে দেয় না। এমনকি প্রকৃত আর্থিক প্রতিবেদনও দেওয়া হয় না।

দেশে বেসরকারি জীবন বীমা কম্পানির সংখ্যা ৩৫টি। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইডিআরএর একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক সময়ে গ্রাহকের অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না। অথচ বীমা আইন ৭২(১)-এ বলা হয়েছে, বীমার মেয়াদ শেষ হলে গ্রাহককে ৯০ দিনের মধ্যে তাঁর অর্থ ফেরত দিতে হবে। কিন্তু বীমা কম্পানিগুলোর অনিয়ম, দুর্নীতি, এজেন্টের মাধ্যমে নানা রকমের হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা।

যে ছয়-সাতটি বীমা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইডিআরএর কাছে অভিযোগ এসেছে, সেগুলো প্রায় রুগ্ণ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সূত্র বলছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ জীবন বীমা কম্পানি মৃত। দুর্নীতির কারণে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতটি ভেঙে পড়েছে।

এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগ বিনিয়োগ শেয়ারবাজার ও জমি কেনা খাতে। কিছু আছে ব্যাংকে স্থায়ী আমানত।

আইডিআরএ বলছে, যেসব কম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তারা অলাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে। অন্যদিকে তাদের পরিচালন ব্যয় অনেক। সে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো লাভ করতে পারে না এবং এ কারণে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না।

কম্পানিগুলোর মধ্যে আইডিআরএর অভিযোগ সেলে ফারইস্ট ইসলামী ইনস্যুরেন্স কম্পানির নামে অভিযোগ পড়েছে ৫৫০টি। কম্পানি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে তাদের অপরিশোধিত বীমা দাবির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মতো। চলতি মাসে কম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করে ঢাকা সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয় ড. মুহাম্মদ রহমত উল্লাহকে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সব সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নতুন পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের কোনো রকমের কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট নেই। অপরিশোধিত বীমা দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র ও অডিট রিপোর্ট ছাড়া বলতে চাচ্ছি না, তবে বীমা দাবির পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা থেকেও অনেক বেশি।’ কম্পানিটির একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, প্রায় ৫০০ কোটির মতো বীমা দাবি অপরিশোধিত রয়েছে তাদের।

পদ্মা লাইফ ইনস্যুরেন্সের বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা চার হাজার ৩৬৭টি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোরশেদ আলম সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁদের বীমা দাবি অপরিশোধিত ৩৫ কোটি টাকা। তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি গ্রাহকের অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়ার।’

সানলাইফ ইনস্যুরেন্সের অভিযোগ সংখ্যা এক হাজার ৬৫৭। বীমা দাবি অপরিশোধিত প্রায় ২১ কোটি। কম্পানিটি শেয়ারবাজারে জেড ক্যাটাগরিতে চলে যাওয়ার মতো। বিভিন্ন কায়দায় তারা টিকে আছে।

সানফ্লাওয়ার ইনস্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইউসুফ আলী মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা নিয়মিত বীমা দাবি পরিশোধ করছেন। বীমা দাবি পরিশোধ একটি চলমান প্রক্রিয়া। বর্তমানে প্রায় ১৩ কোটি টাকার মতো বীমা দাবি অপরিশোধিত রয়েছে।

তবে আইডিআরএর অভিযোগ সেলে প্রায় পাঁচ হাজার ৩৪টি অভিযোগ পড়েছে ওই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

গোল্ডেন লাইফের নামে অভিযোগের সংখ্যা দুই হাজার ৭৩ এবং অপরিশোধিত বীমা দাবির পরিমাণ প্রায় ৬৯ কোটি টাকা।

বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের অভিযোগের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৪৬৬ এবং অপরিশোধিত বীমা দাবির পরিমাণ ২৭ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটিতে অনেক আগেই প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। আইডিআরএ সূত্রে জানা যায়, প্রশাসককে জমি বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা দিতে বললেও এখন পর্যন্ত সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

আইডিআরএর একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বীমার দাবি পরিশোধ করতে হবে। দেরি করলে ব্যাংকের ঋণের সুদের চলতি হারের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি সুদ দিয়ে দাবি পরিশোধ করতে হবে।

বীমা গ্রাহকদের অর্থ ফেরতে প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন গড়িমসির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাতে গোনা কয়েকটি বীমা প্রতিষ্ঠান যে গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিচ্ছে না, এই বিষয়ে আইডিআরএকে শক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে। বীমা কম্পানিগুলোর মধ্যে আরও স্বচ্ছতা তৈরি করা জরুরি। নিয়মিত অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার মাধ্যমে স্বচ্ছতা তৈরি করা সম্ভব।’

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ইনস্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কম্পানিগুলো এফডিআর ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করে অনেক লম্বা সময়ের জন্য। অন্যদিকে মাসের দাবিগুলো পরিশোধ করতে পারে না।’ তিনি বলছেন, ‘ভারতে ১৩৫ কোটি জনগণের জন্য মাত্র ২৫টি জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান আছে। আমাদের ১৭ কোটি জনগণের জন্য আছে ৩৫টি। অথচ এখানে দক্ষ জনবল তৈরি করা যাচ্ছে না এবং বীমার বিষয়ে পড়ালেখা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম। তাই দেশে এত বীমা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’



সাতদিনের সেরা