kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৫ কার্তিক ১৪২৮। ২১ অক্টোবর ২০২১। ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সেক্টর কমন্ডারস ফোরামের বিশেষ সেমিনার

‘তালেবানি পুনরুত্থান ব্যাপক নেতিবাচক আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে’

অনলাইন ডেস্ক   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২১:৫৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘তালেবানি পুনরুত্থান ব্যাপক নেতিবাচক আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে’

তালেবানি পুনরুত্থানে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশংকা প্রকাশ করে আজ এক বিশেষ ওয়েবিনারে বলা হয়, আফগনিস্তানে ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠির নতুন ক্ষমতায় আরোহন আঞ্চলিক দেশগুলিতে ব্যাপক সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের কারণ হবে। সে কারণে এই প্রভাব ঠেকাতে বাংলাদেশের সরকার, মুক্তিযুদ্ধপন্থি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজশক্তিকে সর্বাত্বক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ’৭১ আয়োজিত এই সেমিনারে বক্তারা বলেন, আমেরিকান নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বহিনীর পরাজয়ের পর তালেবানরা যে সরকার গঠন করেছে, সে সরকারে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিগণ পরীক্ষিত ভাবে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার এবং তারা যে নারী নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, সে প্রমাণ এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। অতএব বাংলাদেশের মতো দেশকে সতর্কভাবে পরিস্থিতি অবলোকন করতে হবে। সেমিনারে আরও বলা হয় নতুন তালেবানরা পরিস্থিতির চাঁপে বদলাবার কথা বললেও তারা তাদের পূর্বেকার সরকারের মানবতাবিরোধী অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র বদল করেনি নিজেদের।

বক্তাগণ আরও বলেন, দৃশ্যত দেশটিতে আমেরিকানদের পরাজয় ঘটলেও আফগান নাগরিকগন এতে জয়ী হননি, হয়েছে তালেবানি বিজয় প্রক্রিয়ায় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত পাকিস্তান। কারণ পাকিস্তান একদিকে আমেরিকানরদের সাথে হাত মিলিয়ে আফগানিস্তানে ২০ বছর আগ্রাসন চালিয়েছে আবার তালেবানদের বিজয়ে উল্লসিত হয়েছে। পাকিস্তানের এই দ্বিচারি নীতির ফলে অদূর ভবিস্যতে গোটা দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলেই ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ফোরামের কার্যনির্বাহী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল আলমের সভাপতিত্বে বিশেষ ওয়েবিনারে অংশ নেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ওয়ালিউর রহমান, জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহম্মদ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ‘পীস এ্যন্ড সিকিউরিটি ষ্টাডিসের’ প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল মনিরুজ্জামান (অব.), নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার(অব.), নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ‘ইন্সটিটিউট অফ কনফ্লিক্ট, ল’ এ্যন্ড ডেভলপমেন্ট স্টডিসের’ নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল আব্দুর রশিদ (অব.), সংসদ সদস্য ও নারী অধিকার নেত্রী আরমা দত্ত, সমাজ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ‘ মাইগ্রেশন এ্যন্ড ডেভলপমেন্ট ককাসের’ সাধারণ সম্পাদক মাহজাবিন খালেদ, মানবাধিকার কর্মি ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গাইন এবং বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন। ফোরামের সহসভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম হামিদ, কোষাধ্যক্ষ ডা. মনসুর আহমদ ও নির্বাহী সদস্য ড. খন্দকার শওকত হোসেন সেমিনারে উপস্থিত থাকেন।

ওয়েবিনারে আফগানিস্তানের সদ্য বিদায়ী এমপি জনাব জিয়াউদ্দিন আরাইনজাদ ও নারী প্রসিদ্ধ অধিকাকর্মি মারিয়ম বাহার সাদাত সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে তারা তালেবানি পূনরুত্থানে আফগান জনজীবনের নানামূখি দূর্গতির কথা তুলে ধরেন।

মূল প্রবন্ধে ফোরামের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক হারুন হাবীব তালেবানি পুনরুত্থানকে গোটা উপমহাদেশের জন্যে একটি বড় সতর্কবার্তা বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, নতুন তালেবানদের নীতি পুরনোদের মতোই মধ্যযুগীয় যা মানুষের অর্জিত সভ্যতার পরিপন্থি। এই লেখক-গবেষক আরও বলেন, নতুন তালেবানরা যতোই বদলাবার কথা বলুক তাদের মৌলিক নীতিÑঅবস্থানের বিন্দুমাত্র বদল ঘটার সুযোগ নেই। তালেবানদের এই পুনরুত্থান বাংলাদেশসহ গোটা অঞ্চলে প্রভাব ফেলবে আশংকা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যে ভিত্তি রচিত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, সেই ভিত্তিকে যাতে তালেবানি সমর্থকরা নতুন করে আঘাত করতে না পারে, সে ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ সতর্কতা রাখতে হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অদূরদর্শি নীতির সমালোচনা করে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ওয়ালিউর রহমান বলেন, ২০ বছরের যুদ্ধে আমেরিকা পরাজিত হয়েই কেবল দেশে ফেরেনি, তালেবানি পূনরুত্থানে তারা গোটা অঞ্চলকেই নতুন ভাবে অস্থিরতা উপহার দিয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সঙ্গত কারণেই গভীর ভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নীতি নির্ধারণ করতে হবে কারণ পালাবদলের এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান গভীর ভাবে যুক্ত। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ‘বাংলাদেশ পীস এ্যন্ড সিকিউরিটি ষ্টাডিসের’ সভাপতি মেজর জেনারেল মনিরুজ্জামান (অব.) আফগান পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে বলেন, দেশটি দৃশ্যতই আরেক গৃহযুদ্ধের পথে অগ্রসর হচ্ছে। তিনি বলেন, এতে একদিকে যেমন নতুন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক

নিরাপত্তা সংঘতের জন্ম নেবে অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারতসহ আঞ্চলিক দেশগুলিতে তালেবানি বিপ্লব রফতানির পরিবেশ তৈরি হবে। জেনারেল মনিরুজ্জামান বাংলাদেশকে এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাইরে থাকার পরামর্শ দেন।

মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার আফগানিস্তানে পাকিস্তানের দ্বিমূখি নীতির সমালোচনা করে বলেন, স্বাভাবিক ভাবেই এই তালেবানি পূনরুত্থান বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশের নতুন মাথা ব্যাথার কারণ হবে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সমাজশক্তিকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ‘ইন্সটিটিউট অফ কনফ্লিক্ট, ল’ এ্যন্ড ডেভলপমেন্ট স্টডিসের’ নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল আব্দুর রশিদ (অব.) দেশটিতে লাগাতার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, আমেরিকার নেতৃত্বে বহুজাতিক আগ্রাসন পরিপূর্ণ ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তালেবানি পূনরুত্থানে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশ, কারণ দেশের জঙ্গি-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি নতুন করে তালেবানি বিপ্লব করার চেষ্টা করবে। জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহম্মদ আশংকা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের আগামি নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি দেশীয় তালেবানদের কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গাইন বলেন, তালেবানরা বিন্দুমাত্র বদলায় নি , তারা এরই মধ্যে নারীদের পড়ালেখা, চাকরি এবং স্বাধীন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। অতএব বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার লালনে ব্যাপকভাবে যত্নশীল হতে হবে। সংসদ সদস্য ও নারী অধিকার নেত্রী আরমা দত্ত তালেবানদের পূনরুত্থানে আফগানিস্তানে নারী অধিকার ও মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটার আশংকা প্রকাশ করেন। তবে তিনি আশা করেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ও মুক্তিযুদ্ধপন্থি প্রগতিশীল সমাজশক্তি এই বিরুপ প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান গ্রহন করবে। অন্যথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর বড় আঘাত আসবে। সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ‘ মাইগ্রেশন এ্যন্ড ডেভলপমেন্ট ককাসের’ সাধারণ সম্পাদক মাহজাবিন খালেদ বলেন, তালেবানরা তাদের পূরনো নীতির পূন:স্থাপন করবে সন্দেহ নেই। এর যথেষ্ট প্রমাণ তারা এরই মধ্যে রেখেছে।

সমাজ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান নতুন তালেবানি উত্থানে আফগানিস্তানের জনজীবনে নতুন দূর্গতি নামার কথা উল্লেখ করে বলেন, স্বাভাবিক ভাবেই আফগানিস্তান এখন নতুন করে আল কায়দা ও আইসিসের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হবে এবং সেখান থেকে নতুন করে জিহাদি বিপ্লব ছড়ানোর চেষ্টা চলবে। অতএব বাংলাদেশকে সতর্ক অবস্থান গ্রহন করতে হবে। তিনি আরও বলেন নতুন তালেবানরা যদি স্থিতিশীল হতে পারে তাহলে বাংলাদেশÑভারত সহ আঞ্চলিক দেশগুলিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক অবস্থান গ্রহনের আহবান জানান।

সভাপতির ভাষণে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল আলম বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে সতর্ক ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আহান জানান। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ কামালউদ্দিন।



সাতদিনের সেরা