kalerkantho

শুক্রবার । ৬ কার্তিক ১৪২৮। ২২ অক্টোবর ২০২১। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

পাচারের টাকায়ও নগদ সহায়তা!

জিয়াদুল ইসলাম    

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:৩৪ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



পাচারের টাকায়ও নগদ সহায়তা!

পণ্যের গন্তব্য চীন, থাইল্যান্ড ও লাওস; কিন্তু রপ্তানি মূল্য এসেছে হংকং ও তাইওয়ান থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় বলা আছে, যে দেশে পণ্য রপ্তানি করা হবে সে দেশ থেকে রপ্তানি মূল্য আসতে হবে। কিন্তু চামড়া খাতের শতভাগ রপ্তানিমুখী সুপারেক্স লেদার নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভিন্ন দেশ থেকে রপ্তানি মূল্য দেশে এনে এর বিপরীতে অর্ধকোটি টাকারও বেশি নগদ সহায়তা তুলে নিয়েছে। নগদ সহায়তার ওপর সিভিল অডিট অধিদপ্তরে ২০২১ সালের অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্ট পর্যালোচনায় এই অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে।

নিরীক্ষা দলের আশঙ্কা, ভিন্ন দেশ থেকে রপ্তানি মূল্য আসায় এখানে অর্থ পাচার হয়ে থাকতে পারে। একই আশঙ্কার কথা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) বাংলাদেশ থেকে পুঁজি পাচারের কথা বলে আসছে। সুপারেক্স লেদার নিয়ে মহাহিসাব নিরীক্ষকের অডিট আপত্তির সঙ্গে সে কথার একটি সামঞ্জস্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় রয়েছে, চামড়া ও চামড়াজাতীয় পণ্য রপ্তানিতে অগ্রিম টিটি (টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার) ব্যবস্থায় যে দেশে পণ্য রপ্তানি করা হবে শুধু সে দেশ থেকেই রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসন করতে হবে; কিন্তু সুপারেক্স লেদার এই নীতিমালা ভেঙে নগদ সহায়তা তুলে নিয়েছে।

সিভিল অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি বেসরকারি ব্যাংকের খুলনা শাখায় ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরের নগদ সহায়তার ওপর ইস্যুভিত্তিক নিরীক্ষায় দেখা যায়, সুপারেক্স লেদারের রপ্তানি পণ্যের গন্তব্যস্থল ছিল চীন, থাইল্যান্ড ও লাওস; কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি হংকং ও তাইওয়ান থেকে রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসন করেছে এবং এর বিপরীতে নগদ সহায়তা নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আবেদন, ইএক্সপি, কন্ট্রাক্ট, ইনভয়েস, টিটি ও অন্যান্য রেকর্ড যাচাই করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যে দেশে পণ্য রপ্তানি হবে সে দেশ থেকেই রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসিত হওয়ার কথা; কিন্তু অনেক সময় এ নিয়মের ব্যত্যয় হচ্ছে। এসব কেসের ক্ষেত্রে অনেক বিষয় দেখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, যে দেশ থেকে রপ্তানি মূল্য এসেছে সে দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনো ব্যাবসায়িক সম্পর্ক আছে কি না, যে টাকা পাঠাল তার সঙ্গে কোনো দেনা-পাওনা ছিল কি না, ওই দেশে তার কোনো ব্যবসা আছে কি না, সংশ্লিষ্ট দেশে ব্যবসা করার অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না ইত্যাদি।

তিনি আরো বলেন, দেশ থেকে যে অর্থ পাচার হয় তার ৯০ শতাংশ বাণিজ্যভিত্তিক। অর্থাৎ আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং এবং রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচার বেশি হচ্ছে। আবার অনেক কেসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমদানি-রপ্তানি কিছুই হয়নি, কিন্তু পেমেন্ট হয়েছে। আবার রপ্তানি হলেও মূল্য প্রত্যাবাসিত হয়নি ইত্যাদি। এ রকম বিভিন্ন পন্থায় দেশ থেকে অর্থ পাচার করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিটির মাধ্যমে অগ্রিম মূল্য পরিশোধের শর্ত চুক্তিপত্রে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। মূল্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রপ্তানি পণ্যের সঠিক মূল্য ও পরিমাণ এবং বিদেশি ক্রেতার যথার্থতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। এ ছাড়া কোন ব্যাংকের মাধ্যমে কোন দেশ থেকে পেমেন্ট করা হবে সেটিও চুক্তিতে উল্লেখ করতে হবে। সুপারেক্স লেদারের আলোচ্য রপ্তানি মূল্য হংকং ও তাইওয়ান থেকে পেমেন্ট করার বিষয়টি চুক্তিতে কোথাও বলা ছিল না।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা চীন, জাপান, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, বেলজিয়াম ও ভারতে পণ্য রপ্তানি করে থাকে। তালিকায় হংকং ও তাইওয়ানের নাম নেই। জানা গেছে, তাদের অগ্রিম টিটির বেশির ভাগ পণ্য চীনে রপ্তানি করা হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে সুপারেক্স লেদারের এমডি মো. ফিরোজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অগ্রিম টিটির আওতায় কোন দেশে পণ্য রপ্তানি করেছিলাম, তা আমার মনে নেই। তবে চীনের ক্রেতারা অনেক সময় অগ্রিম পরিশোধ সাপেক্ষে পণ্য নিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করে থাকে। বাকি অর্থ অনেক সময় ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধ করে।’ তিনি দাবি করেন, কর ফাঁকি দিতেই ক্রেতারা রপ্তানি মূল্যের একটি বড় অংশ নিজ দেশের পরিবর্তে অন্য দেশ থেকে পেমেন্ট করে থাকে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের নামও জানতে পারে না। পণ্য বিক্রির স্বার্থে এটি মেনে নিতে হয়।

ক্রেতাদের কর ফাঁকি নিয়ে সুপারেক্স এমডির এমন বক্তব্য সঠিক নয় বলে জানান কয়েকটি ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্য শাখার কর্মকর্তারা। বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁরা বলেন, প্রতিটি কেস সংশ্লিষ্ট দেশের কাস্টমস মূল্যায়ন করে। উদাহরণস্বরূপ—ইনভয়েস অনুযায়ী ১০০ টাকার পণ্য গেলে ১০০ টাকার ওপরই কর আরোপ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, বন্দর থেকে পণ্য রপ্তানির পরপরই তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশ বোর্ডে রিপোর্ট করতে হয় এবং রিপোর্টিংয়ের ১২০ দিনের মধ্যে রপ্তানি মূল্য দেশে আনতে হয়। কিন্তু নগদ সহায়তার কিছু কিছু কেসের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রপ্তানির পর ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে এসংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশ বোর্ডে রিপোর্ট করা হয়নি। উল্টো রপ্তানি তথ্য দীর্ঘদিন গোপন করে মোটা অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আবার সেই অর্থ দেশে প্রত্যাবাসন না হলেও তার বিপরীতে নগদ সহায়তা তুলে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, রপ্তানি না করে বা ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে নগদ সহায়তার টাকা তুলে নেওয়া জালিয়াতির ওপর জালিয়াতি। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের জালিয়াতি করা সম্ভব নয়। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউর খতিয়ে দেখা উচিত।

রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসন না করে সাম্প্রতিক সময়ে নগদ সহায়তা নিয়েছে—এমন একটি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কুলিয়ারচর সি ফুডস। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার নগদ সহায়তা দিয়েছে একটি বেসরকারি ব্যাংক। করোনার মধ্যেই ওই গ্রাহককে নতুন করে ২৬ কোটি টাকার বেশি নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে উঠে আসে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

এ বিষয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুলিয়ারচর সি ফুডস ২০১৬ সালের ১২ জুলাই চিংড়ি রপ্তানি করে কানাডায়। পাঁচ লাখ ৫৮ হাজার ৭২০ ডলার মূল্যের ওই চিংড়ি আমদানি করে কানাডার কুইবেকের ইকোপ্যাক ইনকরপোরেশন। ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে একই মাসের ২১ এবং ২৭ তারিখে পণ্য শিপমেন্ট হয়। কিন্তু এই রপ্তানি মূল্য এখনো দেশে আসেনি। এরপর একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর কুলিয়ারচর সি ফুডস দুই লাখ ৩৪ হাজার ডলার মূল্যে এক হাজার ৬০০ কার্টন চিংড়ি রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। এর মধ্যে এক হাজার কার্টন চিংড়ি প্রত্যাখ্যান করে বিদেশি ক্রেতা প্যাসিফিক আমেরিকান ফিশ কম্পানি ইনকরপোরেশন। বাকি ৬০০ কার্টন চিংড়ির মূল্য ছিল এক লাখ সাত হাজার ২০০ ডলার। ওই রপ্তানির বিপরীতে বিদেশি ব্যাংক কুলিয়ারচর সি ফুডসকে ৬২ হাজার ৯৯৩ ডলার পরিশোধ করে। ফলে এখনো বাকি ৪৪ হাজার ২০৬ ডলার দেশে আসেনি। নীতিমালা অনুযায়ী, গ্রাহকের কোনো রপ্তানি বিলের মূল্য অনাদায়ি থাকলে পরবর্তী দুই বছর তাকে নগদ সহায়তা দেওয়া যাবে না। কিন্তু কুলিয়ারচর সি ফুডসের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনাও মানা হয়নি।

এর আগেও ব্যাংকের সহায়তায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পাচারের টাকায় নগদ সহায়তা হাতিয়ে নিয়েছে। এ তালিকায় বিসমিল্লাহ ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের নাম বেশ আলোচিত। জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েকটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করে। সেই পাচারের টাকা রপ্তানি দেখিয়ে ২০ কোটি টাকার বেশি নগদ সহায়তা নেয় বিসমিল্লাহ গ্রুপ। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে তা ধরা পড়ে। তখন গ্রুপটিকে বিতরণ করা নগদ সহায়তার ২০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যাংকগুলোকে ফেরত আনার জন্য নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া চামড়া খাতের ক্রিসেন্ট গ্রুপ এক টাকারও রপ্তানি না করে ভুয়া রপ্তানি বিল তৈরি করে ব্যাংক ও অডিট ফার্মের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ নগদ সহায়তা হাতিয়ে নেয়। শুধু ২০১৭-১৮ অর্থবছরেই দুই হাজার ৭২২ কোটি টাকার ভুয়া রপ্তানি দেখিয়েছিল ক্রিসেন্ট গ্রুপ।

যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ ২০২০ সালের মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচার হয়। বর্তমান বাজারদরে (৮৫ টাকায় প্রতি ডলার) এর পরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) চলতি বছরের জুনের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সাল শেষে দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার ২০৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও রপ্তানি আয় দেশে প্রত্যাবাসন না করার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এমন অবস্থায় গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন একটি নির্দেশনায় বলেছে, গ্রাহকের পরিচয় গোপন করে বা বেনামে শেল ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো পণ্য রপ্তানি করা যাবে না। বিদেশে শেল ব্যাংকের সঙ্গে দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক সম্পর্কও রাখতে পারবে না। দেশি ব্যাংকগুলোর বিদেশি ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রায় হিসাব (নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট) খোলা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে আরোপিত বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে। এর অন্যথা হলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।



সাতদিনের সেরা